মমতা ব্যানার্জির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন কোন পথে

মমতা ব্যানার্জি একসময় বামফ্রন্টকে হারিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ইতিহাস গড়লেও এখন বিজেপির উত্থান, দুর্নীতির অভিযোগ ও দলীয় সঙ্কটে কঠিন চ্যালেঞ্জে আছেন। তবে তার লড়াকু রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও জনসংযোগ ক্ষমতা এখনো তাকে পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক হতে দেয়নি।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
মমতা ব্যানার্জি
মমতা ব্যানার্জি |সংগৃহীত

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যে দিন কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে শপথ নিলেন, সে দিন বিকেলেই ব্রিগেড থেকে দু’তিন মাইল দূরে হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাসভবনে দাঁড়িয়ে রাজ্যের বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি যা বললেন, সেটাকে মহাকাব্যিক আয়রনি বা শেক্সপিয়ারের ট্র্যাজেডির সাথে তুলনা করলেও বোধহয় ভুল হবে না!

মমতা ব্যানার্জি সে দিন সোজাসুজি দেশের ‘বাম, অতিবাম ও জাতীয় শক্তিগুলোকে’ তার সাথে হাত মেলানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিজেপির বিরুদ্ধে এখন সবাইকে একজোট হতে হবে এবং ‘শত্রুর শত্রুকেই’ এখন বন্ধু বলে ভাবতে প্রস্তুত তিনি।

এমন কী আলোচনার দরজা খুলে রেখে বাড়িতে কখন থেকে কখন তাকে পাওয়া যাবে- সেটাও একই নিঃশ্বাসে সেদিন জানিয়ে দেন তিনি।

আসলে ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের একটানা শাসনের অবসান ঘটিয়ে যখন মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রথম সরকার রাজ্যের ক্ষমতায় আসে, সেটাকে এই রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে আজও একটি অবিস্মরণীয় মাইলফলক হিসেবে ধরা হয়।

সিপিআইএমের নেতৃত্বাধীন সেই সরকারের আমলে শাসক দলের একচ্ছত্র প্রভাব পশ্চিমবঙ্গের সমাজ, রাজনীতি, প্রশাসন ও দৈনন্দিন জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমনভাবে প্রবেশ করেছিল- যে মাত্র ১০-১২ বছরের পুরনো একটি রাজনৈতিক দল প্রায় একজন ব্যক্তির ভরসায় সেই বামপন্থীদের ক্ষমতা থেকে প্রায় নির্মূল করে দিতে পারবেন, এটা অনেকে ভাবতেই পারেননি।

মমতা ব্যানার্জি প্রায় একার হাতে সেই অসাধ্যসাধন করেছিলেন, আর পশ্চিমবঙ্গকে বামপন্থীদের ক্ষমতা থেকে হঠাতে পারাটাকেই তার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে ধরা হয়ে থাকে।

কিন্তু সেই ঘটনার ঠিক ১৫ বছরের মাথায় যেভাবে তিনি এখন সেই ‘লেফট বা ‘আলট্রা লেফট’-দেরও তার সাথে হাত মেলানোর জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন, তা থেকে বোঝা কঠিন নয় তার রাজনৈতিক জীবনের পরিক্রমাও এখন একটি বৃত্ত সম্পূর্ণ করেছে।

বামপন্থী দলগুলো তার সেই প্রস্তাব পত্রপাঠ খারিজ করেছে সেটা অন্য কথা- কিন্তু মমতা ব্যানার্জি যে নির্বাচনী বিপর্যয়ের ধাক্কা কাটিয়ে উঠে নিজের মতো করে আবার ঘর গোছানোর চেষ্টা শুরু করেছেন এবং রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়াতে চাইছেন সেটাও এই পদক্ষেপ থেকে স্পষ্ট।

কলকাতার যোগমায়া দেবী কলেজের ছাত্রী সংগঠন থেকে যার কংগ্রেসি রাজনীতিতে হাতেখড়ি, সেই মমতা ব্যানার্জির রাজনৈতিক জীবন ৫০ বছরেরও বেশি পুরনো। পার্লামন্ট ও বিধানসভা মিলিয়ে সংসদীয় রাজনীতিতেও তিনি আছেন ৪২ বছর ধরে।

কিন্তু এই ৭১ বছর বয়সে রাজ্যে বিজেপির প্রবল দাপটের মধ্যে তিনি কি আদৌ পারবেন আরো একবার ঘুরে দাঁড়াতে? না কি মমতা ব্যানার্জি ও তার নিজের হাতে গড়া তৃণমূল কংগ্রেসের ‘রাজনৈতিক অবিট’ লেখার সময় এসে গেছে?

মমতা ব্যানার্জির রাজনৈতিক জীবনের দিকে ফিরে তাকিয়ে ও সামনের চ্যালেঞ্জগুলো পর্যালোচনা করে এই প্রতিবেদন উত্তর খুঁজেছে সেই প্রশ্নগুলোরই।

যাদবপুরে সোমনাথ চ্যাটার্জিকে হারিয়ে উত্থান

১৯৭৬ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সেই মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মহিলা কংগ্রেস (আই)-এর সাধারণ সম্পাদক হন। কয়েক বছর পর তিনি হন নিখিল ভারত যুব কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক।

কলকাতার রাজনৈতিক বিশ্লেষক শিখা মুখার্জি বলেন, ‘মমতা ব্যানার্জির একটা বিশেষত্ব হলো তার প্রচণ্ড লড়াকু মনোবৃত্তি এবং তার পরিশ্রম করার ক্ষমতা।’

তার ভাষায়, ‘মমতার রাজনৈতিক জীবনে বহু বাধা এসেছে, ২০০১ সালে রাজ্য নির্বাচনে হারার পর তার দল তৃণমূল কংগ্রেস প্রায় ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, কিন্তু তিনি আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন, দলকে পুনর্গঠিত করেছেন। এটা তার লড়াই করার ক্ষমতার প্রমাণ।’

প্রতীচী ট্রাস্ট নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়কারী সাবির আহমেদ বলেন, ‘ছোট ছোট অনেক ঘটনা আছে যার মধ্যে দিয়ে তিনি (মমতা) তখনকার কংগ্রেসের বড় বড় নেতাদের নজরে এসেছিলেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো ১৯৮৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে সোমনাথ চ্যাটার্জির মত প্রবীণ সিপিআই(এম) নেতাকে হারানো।’

প্রকৃতপক্ষেই সেটা ছিল এক সাড়া-জাগানো ঘটনা। কলকাতার যাদবপুর লোকসভা আসনে সেই প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতাকে হারিয়ে মমতা ব্যানার্জি ভারতের কনিষ্ঠতম পার্লামেন্ট সদস্যদের একজন হয়েছিলেন।

১৯৮৪-এর লোকসভা নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর কংগ্রেস অবশ্য বিপুল সহানুভূতি ভোট পেয়েছিল।

কিন্তু যাদবপুরের মতো বামপন্থীদের শক্ত ঘাঁটিতে সোমনাথ চ্যাটার্জির মতো ডাকসাইটে নেতা একজন আনকোরা অপরিচিত তরুণী নেত্রীর কাছে হেরে যাচ্ছেন, এটা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে হইচই ফেলে দিয়েছিল।

মমতা ব্যানার্জির আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার নেই শুরু। দিল্লিতেও তিনি ততদিনে প্রধানমন্ত্রী রাজিব গান্ধীর সুনজরে এসে গেছেন।

এরপর ১৯৮৯ সালে নির্বাচনে ভারতের রাজনীতিতে কংগ্রেসবিরোধী হাওয়ার মধ্যে মমতা ব্যানার্জি অবশ্য সেই যাদবপুর আসনেই হেরে যান।

কিন্তু কিছুদিন পরই ১৯৯১ সালে আবার কলকাতা দক্ষিণ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে লোকসভায় ফিরে আসেন এবং পরে আরো পাঁচবার লোকসভা সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।

লোকসভা সদস্য থাকার সময় বেশ কিছু ঘটনায় মমতা ব্যানার্জির সেই ‘লড়াকু’ ও ‘প্রতিবাদী’ ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে।

নিজ দলের বিরুদ্ধে সিপিআইএমকে সহায়তার অভিযোগ আনা, পার্লামেন্ট ভবনে পেট্রোলিয়াম মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ, একজন এমপির সাথে হাতাহাতি, ‘পশ্চিমবঙ্গের প্রতি বঞ্চনার প্রতিবাদ জানাতে’ রেলমন্ত্রীর প্রতি শাল ছুঁড়ে মারা এবং এমপি পদ থেকে ইস্তফা ইত্যাদি নানা ঘটনায় আলোচিত হয়েছিলেন তিনি।

মমতা ব্যানার্জি প্রথম কেন্দ্রীয় সরকারের রাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছিলেন ১৯৯১ সালে, তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন পি ভি নরসিমহা রাও।

আর প্রথম পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে রেল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান ১৯৯৯ সালে, যখন বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের অংশ হয়েছিল তার নিজের প্রতিষ্ঠিত দল তৃণমূল কংগ্রেস।

সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনের ভূমিকা

মমতা ব্যানার্জি কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে গিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ১৯৯৮ সালে এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মধ্যেই এটি পরিণত হয় বামফ্রন্ট-শাসিত পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলে।

বামফ্রন্ট সরকারের সময় ২০০৫ সাল থেকে পরবর্তী কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে শিল্প স্থাপনের জন্য কৃষিজমি বরাদ্দের কয়েকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে গণঅসন্তোষ তৈরি হয়।

বিশেষ করে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে জমি রক্ষার জন্য গড়ে ওঠা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রধান বিরোধীদলে পরিণত হয় তৃণমূল কংগ্রেস।

নন্দীগ্রামে আন্দোলনরত জনতার ওপর পুলিশের গুলিতে অন্তত ১৪ জন নিহত হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার-বিরোধী মনোভাব জোরদার হয়ে ওঠে।

নন্দীগ্রামে কৃষকদের বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিয়ে মমতা ব্যানার্জি হয়ে ওঠেন রাজ্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা।

সাবির আহমেদ বলছিলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে একটা সময় ছিল যে লোকে ভাবতো বামফ্রন্টকে কেউ হটাতে পারবে না। কিন্তু তাদের মোকাবিলা করার নেতৃত্ব এবং সাহস মমতা ব্যানার্জি দেখাতে পেরেছিলেন। আর ভূমি অধিগ্রহণের ইস্যুটিতে তিনি সাধারণ মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পেরেছিলেন।’

আর রাজনৈতিক বিশ্লেষক শিখা মুখার্জি বলেন, ‘প্রথম দিকে তার স্লোগান ছিল শুধুই বামফ্রন্ট হটাও- কিন্তু পরে নন্দীগ্রাম আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে গ্রামীণ মানুষের মধ্যে তার রাজনৈতিক ভিত্তি সৃষ্টি হয়। তার ফলেই মমতা ব্যানার্জির নির্বাচনে বিজয়ের পথ তৈরি হয়েছিল।

২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বামফ্রন্টের চাইতে বেশি আসন পায় তৃণমূল।

আর তার দু’বছর পর বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের সাথে জোট বেঁধে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল দল ওই রাজ্যে ৩৪ বছর ধরে ক্ষমতাসীন বামফ্রন্টকে হারায়।

মমতা ব্যানার্জি হন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী। এরপর থেকে তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে ক্ষমতায় ছিলেন একটানা ১৫ বছর।

এরপর ২০১৬ এবং ২০২১ সালের নির্বাচনেও বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয় তৃণমূল কংগ্রেস।

বিরোধী মমতা বনাম প্রশাসক মমতা

মমতা ব্যানার্জির রাজনৈতিক জীবনে স্পষ্টতই দু’টি পর্ব। শুরু থেকে ২০১১ পর্যন্ত তিনি ছিলেন মূলত বিরোধীর ভূমিকায়, পশ্চিমবঙ্গ থেকে বামফ্রন্টকে হঠানোই ছিল তার মূল লক্ষ্য। আর তার পরবর্তী ১৫ বছর তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ছিলেন প্রশাসনের শীর্ষতম পদে।

মুখ্যমন্ত্রিত্বের এই ১৫ বছরে এসে দুর্নীতির অভিযোগ তাকে ও তার দলকে খুবই বিপর্যস্ত করেছে। সাদামাটা জীবনযাপন আর নীল-সাদা হাওয়াই বহুদিন যার সততার ট্রেডমার্ক ছিল, তার নিজের গলাতেও শোনা গেছে অভিমান আর উৎকণ্ঠা।

একটা সময় একের পর এক নির্বাচনী জনসভায় তিনি বলেছেন, ‘ভুল করলে আমায় চড় মারবেন, কিছু মনে করব না। বললে বাড়িতে গিয়ে বাসনও মেজে দিয়ে আসব। কিন্তু দয়া করে চোর বলবেন না, মিথ্যে বদনাম দেবেন না!’

তবে শুধু দুর্নীতি নয়, রাজ্যের প্রশাসক হিসেবে তিনি শিল্প টানতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে ব্যর্থ বলে অভিযোগ করেছে বিরোধী বিজেপি বা সিপিআইএম।

তারা প্রায় এক সুরে বলেছে, এই দেড় দশকে রাজ্যে বড় লগ্নি একটাও আসেনি- মুখ্যমন্ত্রী শুধু ধূপকাঠি বা তেলেভাজা শিল্পকে উৎসাহ দিয়ে গেছেন।

আসলে রাজপথে সফল আন্দোলনের যে ট্র্যাডিশন মমতা ব্যানার্জিকে বিরোধী নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল, ক্ষমতায় আসার পর সেটাই তাকে প্রশাসক হিসেবে ডুবিয়েছে বলে মনে করতেন অধুনা প্রয়াত, প্রবীণ বামপন্থী নেতা শ্যামল চক্রবর্তী।

ঠিক ১০ বছর আগে শ্যামল চক্রবর্তী বলছিলেন, ‘'সাহিত্যিক সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এক সময় লিখেছিলেন বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে। সেটাকেই একটু ঘুরিয়ে নিয়ে বলতে চাই বন্যেরা বনে সুন্দর আর মমতা ব্যানার্জি বিরোধী দলে!’

ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় ভাঁটা?

পশ্চিমবঙ্গের একটা বড় অংশের মানুষের ধারণা ছিল, তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা-কর্মীরা যতই দুর্নীতিতে লিপ্ত থাকুক, দলের সর্বোচ্চ নেত্রীকে সেই কলঙ্ক কখনো স্পর্শ করেনি। ব্যক্তিগতভাবে তিনি সব দুর্নীতির ঊর্ধ্বে, এমনটাই মনে করতেন অনেকে।

মমতা ব্যানার্জির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বুদ্ধিজীবী ও কবি সুবোধ সরকার বলতেন, সাধারণ মানুষের সাথে তার যে অসাধারণ ‘কানেক্ট’- সেটাই কিন্তু তাকে এই বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘সমাজের দরিদ্রতম অংশের সাথে তিনি যেভাবে মিশতে পারেন, তাদের উঠোনে বসে তাদের ভাষায় যেভাবে কথা বলতে পারেন সেটাই তাকে মানুষের এত আপন করে তুলেছে। মনে রাখবেন ৩৪ বছরে কমিউনিস্টদের সাথে মানুষের কিন্তু বিরাট দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছিল।’

তিনি আরো যোগ করেছিলেন, ‘গরিবের সাথে এই যে গরিবের স্তরে নেমে এসে মেশা- তা আমাদের শহুরে চোখে অদ্ভুত লাগতে পারে। মনে হতে পারে এমন আবার সম্ভব না কি? এটা নিয়ে হাসাহাসিও কম হয়নি, কিন্তু আমার মতে এটাই মমতা ব্যানার্জির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য!’

ফলে মমতা ব্যানার্জি কোনো সরল, একমাত্রিক কোনো রাজনীতিক নন- যাকে খুব সহজে ব্যাখ্যা করা যায়।

এখন কি সম্ভব ঘুরে দাঁড়ানো?

একদা সঙ্ঘ পরিবারের ঘনিষ্ঠ ও এখন তৃণমূল-ঘেঁষা নাগরিক সংগঠনের সাথে যুক্ত প্রবীণ সাংবাদিক রন্তিদেব সেনগুপ্তর মতে, মমতা ব্যানার্জিকে এখনই রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক মনে করে খরচের খাতায় ফেলে দেয়াটা ভুল হবে।

তিনি সোশ্যাল মিডিয়াতে লিখেছেন, ‘এখন দেখলাম কেউ কেউ বলছেন- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অপ্রাসঙ্গিক। কেউ কেউ আবার সে কথা মেনে নিয়ে হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেছেন। তাদের মনে করিয়ে দেই, মমতা ব্যানার্জির সাথে ৮০ জন বিধায়ক, লোকসভা এবং রাজ্যসভা মিলিয়ে ৪২ জন এমপি এবং এখনো ৪১ শতাংশ ভোট রয়ে গেছে। কাউকে রাতারাতি অপ্রাসঙ্গিক বলে দেয়ার আগে, দয়া করে, প্রণব মুখার্জী এবং অটলবিহারী বাজপেয়ীর দৃষ্টান্ত দুটি মনে রাখবেন। রাজনীতি একটি লম্বা রেস এবং সংখ্যার বিচারে কা‌উকে অপ্রাসঙ্গিক বলে দেয়াটা বোকামি। চরম বোকামি।’

তবে পশ্চিমবঙ্গের অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মনে করেন মমতা ব্যানার্জির পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো শুধু কঠিন নয়, খুব কঠিন।

তাদের মতে, এটা নির্ভর করবে মূলত তিনটি প্রধান ফ্যাক্টরের ওপর।

প্রথমত, মমতা তার দলকে অক্ষত রাখতে পারেন কি না! এই শোচনীয় হারের পর তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যেতে পারে বা বিজয়ী শিবিরে যোগদানের ঢল নামতে পারে- এমন একটা সম্ভাবনা এখনই দেখা যাচ্ছে।

এটা যদি সত্যিই হয়, তাহলে বলতে হবে বিরোধী দলের নেতাদের ভাঙিয়ে এনে একধারসে তৃণমূলের পতাকা হাতে ধরানোর যে সংস্কৃতি রাজ্যে মমতা ব্যানার্জি চালু করেছিলেন সেটার মূল্যই এখন তাকে দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, দলে অভিষেক ব্যানার্জি ফ্যাক্টর তিনি কিভাবে সামলান সেটাও দেখার বিষয় হবে অবশ্যই।

ভাইয়ের ছেলের প্রতি মমতার যতই দুর্বলতা থাক, জনপ্রিয়তা বা গ্রহণযোগ্যতায় তিনি যে নিজের পিশির তুলনায় অনেক অনেক পিছিয়ে, সেই প্রমাণও এখন হাতের কাছেই মজুত।

কারণ তৃণমূল কংগ্রেসে মমতার অঘোষিত উত্তরসূরী তথা তার ভাইয়ের ছেলের অভিষেক ব্যানার্জির দল পরিচালনার পদ্ধতি, করপোরেট স্টাইলে রাজনৈতিক দল চালানো কিংবা পরামর্শদাতা সংস্থার হাতে কর্তৃত্ব তুলে দেয়া এবং সর্বোপরি দুর্নীতি আর ঔদ্ধত্যর অভিযোগ- এগুলোর বিরুদ্ধে নেতাকর্মীদের বিক্ষোভ এখন প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। বিভিন্ন দুর্নীতির মামলায় কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোও অভিষেক ব্যানার্জির বিরুদ্ধে এখন ব্যবস্থা নিতে পারে।

তবে তৃতীয় ফ্যাক্টরটাই বোধহয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সফল বিরোধী নেত্রী হিসেবে মমতার যে অসাধারণ ট্র্যাক রেকর্ড, তিনি কি নিজের সেই পুরনো পরিচয়কে রাজ্য রাজনীতিতে পুনরাবিষ্কার করতে পারবেন?

এর জন্য মমতাকে অবশ্যই নতুন বিজেপি সরকারের ‘ভুল’গুলোর জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কোনো একটা ইস্যুকে কিভাবে রাজপথের শক্তিশালী আন্দোলনে বদলে দেয়া যায়, আবার সেই দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে।

কিন্তু এখানে তার বয়স ও শারীরিক অবস্থা সম্ভবত তার বিরুদ্ধে যাবে। কারণ তিনি ৭০ পেরিয়ে গেছেন বেশ কিছুদিন, অসম্ভব পরিশ্রম করার ক্ষমতাতেও বোধহয় কিছুটা শিথিলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস বলে এই রাজ্যের মানুষ একবার কোনো দলকে ক্ষমতা থেকে ছুঁড়ে ফেললে তাদের আর ক্ষমতায় ফেরার সুযোগ দেয় না। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি সেই রীতির বিরল ব্যতিক্রম ঘটাতে পারবেন কি না, সেটা সবচেয়ে বেশি নির্ভর করবে তার নিজের ওপরেই।

সূত্র : বিবিসি