ভারতীয় একটি বেসরকারি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের তৈরি বিশেষ স্যাটেলাইট ‘দৃষ্টি’ রোববার (৩ মে) মহাকাশে পাড়ি জমিয়েছে, যা পাকিস্তান ও চীনের সামরিক কৌশলের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। মেঘের আবরণ কিংবা ঘুটঘুটে অন্ধকার, কোনো কিছুই এখন আর ‘দৃষ্টি’র আড়াল করতে পারবে না মাটির ওপরের গতিবিধি।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া থেকে রোববার ভারতের স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ২৯ মিনিটে স্পেসএক্স-এর ফ্যালকন ৯ রকেটে চড়ে কক্ষপথের দিকে রওনা দেয় বেঙ্গালুরু ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গ্যালাক্সআই-এর এই কৃত্রিম উপগ্রহ। এই মিশনের বিশেষত্ব হলো এটি একইসাথে মাল্টিস্পেকট্রাল ক্যামেরা ও সিনথেটিক অ্যাপারচার রাডার বা এসএআর প্রযুক্তিতে সজ্জিত, যা এর আগে বিশ্বের আর কোনো দেশ একই উপগ্রহে ব্যবহার করেনি।
উপগ্রহে থাকা সাধারণ ক্যামেরা সচরাচর মেঘ থাকলে ছবি তুলতে পারে না, কিন্তু এই রাডার প্রযুক্তি ব্যবহার করে যেকোনো আবহাওয়ায় ভূখণ্ডের নিখুঁত তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে। এই স্যাটেলাইটের ওজন প্রায় ১৯০ কেজি, যা ভারতের বেসরকারি খাতের জন্য একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই প্রযুক্তির ফলে এখন থেকে সীমান্তে শত্রুপক্ষের তৎপরতা নজরদারি করতে ভারতকে আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভর করতে হবে না। বিশেষ করে বর্তমানে ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সঙ্কটের সময় যখন মার্কিন কোম্পানিগুলো তথ্য শেয়ার করতে গড়িমসি করছে, তখন ভারতের নিজস্ব এ ব্যবস্থাটি তাদের জন্য অনেক বেশি সুবিধাজনক হবে।
গ্যালাক্সআই-এর প্রধান নির্বাহী সুযশ সিং জানিয়েছেন যে, ভারতের আবহাওয়া ক্রান্তীয় হওয়ার কারণে বছরের অধিকাংশ সময় আকাশ মেঘে ঢাকা থাকে। নাসার তথ্য অনুযায়ী পৃথিবীর ৭০ শতাংশ ভূমি এবং ৯০ শতাংশ সমুদ্র সবসময় মেঘের নিচে থাকে, যার ফলে সাধারণ স্যাটেলাইট দিয়ে সাতবার ছবি তুললে তার ১০টির মধ্যে সাতটিই ঝাপসা আসার আশঙ্কা থাকে। এই সমস্যা মেটাতেই ‘দৃষ্টি’ তৈরি করা হয়েছে।
তিনি আরো জানান, এই স্যাটেলাইট বর্তমানে ১ দশমিক ৫ মিটার রেজোলিউশনে ছবি পাঠাতে সক্ষম, যার সহজ অর্থ হলো মহাকাশ থেকে মাটির ওপর থাকা মাত্র দেড় মিটার বা প্রায় পাঁচ ফুট দৈর্ঘ্যের যেকোনো বস্তু এটি পরিষ্কারভাবে শনাক্ত করতে পারবে।
ভবিষ্যতে এই সক্ষমতা আরো বাড়িয়ে শূন্য দশমিক ৩ মিটারে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে। এর মানে হলো মহাকাশ থেকে মাটির ওপর থাকা মাত্র এক ফুট বা তার চেয়েও ছোট কোনো বস্তুর নিখুঁত ছবি তোলা সম্ভব হবে, যা শত্রুপক্ষের ছোটখাটো সামরিক সরঞ্জাম বা মানুষের নড়াচড়াও নির্ভুলভাবে ধরে ফেলবে।
এ উদ্ভাবনটি পুরোপুরি ভারতীয় এবং এর বিশ্বজুড়ে পেটেন্ট নেয়া হয়েছে। আইআইটি মাদ্রাজে জন্ম নেয়া এই স্টার্টআপের সাফল্য নিয়ে আশাবাদী ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার সাবেক প্রধান ড. এস সোমনাথ।
তিনি মনে করেন, ভারতের তরুণ প্রজন্ম এখন উদ্ভাবনী ক্ষমতায় বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। এই প্রকল্পের আওতায় ভবিষ্যতে আরো নয়টি স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানো হবে, যা একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে। এর ফলে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা যেকোনো পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা সম্ভব হবে, যা স্বাভাবিকভাবেই পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর জন্য একটি বড় মাথাব্যথার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যর্থতার ইতিহাস ও নেভআইসি নিয়ে শঙ্কা
ভারতের মহাকাশ গবেষণায় এই সাফল্যের খবরের সমান্তরালে তাদের নিজস্ব জিপিএস ব্যবস্থা নেভআইসি বা ন্যাভিগেশন উইথ ইন্ডিয়ান কনস্টেলেশন নিয়ে গত এপ্রিল মাসেই বেশ কিছু নেতিবাচক খবর সামনে এসেছে।
ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মাসে ভারতের এই নেভিগেশন ব্যবস্থার বেশ কিছু উপগ্রহ অকেজো হয়ে পড়ার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। সেখানে বলা হয় যে, সঠিক পজিশনিং তথ্য দেয়ার জন্য কমপক্ষে চারটি উপগ্রহ সক্রিয় থাকা জরুরি হলেও কারিগরি ত্রুটির কারণে সেই সংখ্যা তিনে নেমে এসেছিল।
মূলত এই উপগ্রহগুলোতে ব্যবহৃত পারমাণবিক ঘড়ি বা অ্যাটমিক ক্লক বিকল হয়ে যাওয়ার কারণে পুরো ব্যবস্থাটি বেহাল দশায় পড়েছিল। সময়ের সামান্য হেরফের হলে জিপিএস তথ্যে বড় ধরনের গোলমাল দেখা দেয়, যা সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর ম্যাপিং এবং লজিস্টিক সাপোর্টে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা দেখা দেয়।
কার্গিল যুদ্ধের পর তৈরি করা এ ব্যবস্থাটির অনেক উপগ্রহই এখন তাদের নির্দিষ্ট মেয়াদ পার করে ফেলেছে এবং সেগুলো প্রতিস্থাপনে ধীরগতির কারণে পুরো ব্যবস্থাটি এখন প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
একদিকে নতুন স্যাটেলাইট ‘দৃষ্টি’ দিয়ে নজরদারির স্বপ্ন দেখালেও পুরোনো নেভিগেশন ব্যবস্থার এই নাজুক অবস্থা ভারতের সামগ্রিক মহাকাশ সক্ষমতার একটি বড় দুর্বলতা হিসেবেই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা দেখছেন।
সূত্র: এনডিটিভি



