মিয়ানমারে জান্তা আয়োজিত নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে ভোট গ্রহণ শুরু

মিয়ানমারের সামরিক জান্তা রোববার নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে ভোট গ্রহণ শুরু করেছে; গণতন্ত্রপন্থীরা বলছেন, এই নির্বাচন শুধু সামরিক শাসন দীর্ঘায়িত করার কৌশল হিসেবে সাজানো হয়েছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
মিয়ানমারে জান্তা আয়োজিত নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে ভোট গ্রহণ শুরু
মিয়ানমারে জান্তা আয়োজিত নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে ভোট গ্রহণ শুরু |সংগৃহীত

মিয়ানমারের সামরিক জান্তা রোববার দেশটির নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে ভোট গ্রহণ শুরু করেছে। গণতন্ত্র পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নির্বাচন বেসামরিক রূপে সামরিক শাসন দীর্ঘায়িত করার একটি কৌশল মাত্র।

স্বাধীনতার পর থেকে মিয়ানমার বেশিভাগ সময়ই সামরিক শাসনের অধীনে ছিল। তবে এক দশকব্যাপী গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের সময় বেসামরিক সরকার ক্ষমতায় আসে। সেই ধারাবাহিকতায় ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়।

কিন্তু ২০২১ সালে সামরিক বাহিনী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আবার ক্ষমতা দখল করে। তারা আগের নির্বাচনের ফল বাতিল করে, গণতান্ত্রিক নেত্রী অং সান সু চিকে আটক করে এবং দেশটিকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়।

রোববার ভোর ৬টায় ইয়াঙ্গুন শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে সু চির সাবেক নির্বাচনী এলাকা কাউহমুতে ভোট কেন্দ্রগুলো খোলা হয়।

স্থানীয় কৃষক থান থান সিন্ট বলেন, দেশটির ‘অনেক সমস্যা’ রয়েছে, তবুও নাগরিক দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি ভোট দিয়েছেন এবং তিনি মিয়ানমারে শান্তি চান।

৫৪ বছর বয়সী এই নারী কাউহমুর একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট দেয়ার পর আরো বলেন, ‘আমরা জানি, শান্তি একদিনে আসবে না। তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমাদের ধাপে ধাপে এগোতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘নির্বাচনের পর পরিস্থিতি ভালো হবে বলে আমি মনে করি।’

পাঁচ বছর ধরে শক্ত হাতে দেশ শাসনের পর জান্তা দাবি করছে, ২৫ জানুয়ারি শেষ হওয়ার কথা থাকা তিন ধাপের এই নির্বাচন জনগণের হাতে আবার ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক বাহিনীর প্রধান রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে পরিচিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) গত মাসে অনুষ্ঠিত প্রথম ধাপে নিম্নকক্ষের প্রায় ৯০ শতাংশ আসনে জয় পেয়েছে।

সু চি রাজনীতি থেকে কার্যত বাদ পড়া এবং তার বিপুল জনপ্রিয় দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) বিলুপ্ত হওয়ায় গণতন্ত্রপন্থীরা বলছেন, এই নির্বাচন সামরিকপন্থী প্রার্থীদের দিয়ে সাজানো ও ভিন্নমত দমনের মাধ্যমে প্রভাবিত।

ইয়াঙ্গুনের ৫০ বছর বয়সী এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ফলাফল আসলে সামরিক বাহিনী দ্বারাই নির্ধারিত।’

তিনি আরো বলেন, ‘এই নির্বাচনে মানুষের আগ্রহ খুব কম। আমাদের ভোগান্তি থেকে মুক্তির সাথে এই নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই।’

প্রথম ধাপের নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ, যা ২০২০ সালের নির্বাচনের প্রায় ৭০ শতাংশ উপস্থিতির তুলনায় অনেক কম। ওই নির্বাচনে বেশিভাগ ভোটার সু চির দলকে সমর্থন করেছিলেন।

বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণাধীন বড় বড় এলাকায় ভোট গ্রহণ হচ্ছে না।

সামরিক বাহিনী অভিযোগ করেছে, প্রথম ধাপের নির্বাচনের সময় বিদ্রোহীরা ড্রোন, রকেট ও বোমা হামলা চালিয়ে পাঁচজনকে হত্যা করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন করা, বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানো ও বিদ্রোহীদের গতি কমাতে জান্তা এই নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের ভাবমূর্তি পরিষ্কার করার চেষ্টা করছে।

জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ টম অ্যান্ড্রুজ বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এই নির্বাচন সামরিক বাহিনীর মিত্রদের জয় নিশ্চিত করতে সাজানো হয়েছে, যাতে সহিংসতা ও দমন-পীড়ন চললেও বৈধতার একটি মুখোশ তৈরি করা যায়।’

সামরিক বাহিনী ২০২১ সালের অভ্যুত্থানকে যুক্তি দিতে দাবি করেছিল, ২০২০ সালের নির্বাচনে ব্যাপক ভোট জালিয়াতির মাধ্যমে এনএলডি বিপুল জয় পেয়েছিল।

তবে নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, এ সব অভিযোগের কোনো ভিত্তি ছিল না।

এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশন্স জানায়, ২০২০ সালে এনএলডিসহ যে দলগুলো ৯০ শতাংশ আসনে জয়ী হয়েছিল, বিলুপ্ত করে দেয়ার পর এবারের নির্বাচনে সেই দলগুলোকে বাইরে রাখা হয়েছে।

সংবিধান অনুযায়ী, নতুন সরকার গঠিত হলেও সংসদের এক-চতুর্থাংশ আসন সামরিক বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত থাকবে।

এদিকে জান্তা প্রণীত আইনে ৩৩০ জনের বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা চলছে।

এ সব আইনে নির্বাচন-বিরোধী বিক্ষোভ বা সমালোচনার জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

অ্যাডভোকেসি গ্রুপ অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্স জানায়, বর্তমানে ২২ হাজারের বেশি রাজনৈতিক বন্দী জান্তার কারাগারে আটক রয়েছেন।

সেনা অভ্যুত্থানের পর নিরাপত্তা বাহিনী গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভ দমন করে। এর জেরে রাজনৈতিক কর্মীরা সশস্ত্র গেরিলা ইউনিট গড়ে তোলে এবং এখন তারা বহু জাতিগত সংখ্যালঘু বাহিনীর সাথে মিলিত হয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

নিম্নকক্ষের বহু আসনে ভোট বাতিল করা হয়েছে, বিশেষ করে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল বা যেখানে বিদ্রোহীরা সমান্তরাল প্রশাসন চালাচ্ছে।

ভোটের আগে সামরিক বাহিনী এ সব এলাকা পুনর্দখলে আক্রমণ চালিয়েছে। সামারিক বাহিনী বেসামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

যদিও গৃহযুদ্ধে নিহতের সরকারি সংখ্যা নেই, সহিংসতা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডি গণমাধ্যম প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অনুমান করেছে, এখন পর্যন্ত সব পক্ষ মিলিয়ে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে।

নতুন সরকার গঠিত হলে সামরিক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং প্রেসিডেন্টের বেসামরিক পদ গ্রহণ করতে পারেন, এ সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি।

সূত্র : বাসস