নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যায় ৩১ জনের মৃত্যু, নিখোঁজ ৩৮৪

‘নিখোঁজ বিদেশীদের মধ্যে ১২ জন ব্রিটিশ, ১০৫ জন ভারতীয়, ৩৭ জন অনাবাসী ভারতীয় (এনআরআই), ১৭ জন মালয়েশীয়, চারজন দক্ষিণ আফ্রিকান, তিনজন মার্কিন নাগরিক, একজন অস্ট্রেলীয় ও একজন ডাচ নাগরিক রয়েছেন। আরো ১১১ জন নিখোঁজ ব্যক্তির জাতীয়তা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।’

নয়া দিগন্ত অনলাইন
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যা
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যা |রয়টার্স

নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় ভূমিকম্পের পর তুষারধস ও আকস্মিক বন্যায় অন্তত ৩৮৪ জন পর্যটক নিখোঁজ হয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশী নাগরিক এবং ৯৩ জন নেপালি। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৩১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ বিদেশীদের মধ্যে ১২ জন ব্রিটিশ, ১০৫ জন ভারতীয়, ৩৭ জন অনাবাসী ভারতীয় (এনআরআই), ১৭ জন মালয়েশীয়, চারজন দক্ষিণ আফ্রিকান, তিনজন মার্কিন নাগরিক, একজন অস্ট্রেলীয় ও একজন ডাচ নাগরিক রয়েছেন। আরো ১১১ জন নিখোঁজ ব্যক্তির জাতীয়তা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।

ভূমিকম্পের পর তুষারধস, তারপর বন্যা

বুধবার ভোরে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর উত্তরে রসুয়া জেলায় এই দুর্যোগ আঘাত হানে। স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে সেখানে ভূমিকম্প হয় বলে জানিয়েছেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল।

পার্লামেন্টে তিনি জানান, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী ভূমিকম্পের পর তুষারধসের সৃষ্টি হয়। এরপর সেই তুষারধস থেকে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। তবে ঘটনাপ্রবাহের বিস্তারিত তথ্য এখনো যাচাই করা হচ্ছে।

রসুয়া ও নুওয়াকোট জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিমুরে, সিয়াব্রুবেসি ও বেত্রাবতী এলাকাতেও ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।

নিখোঁজ পুলিশ ও সেনাসদস্যও

দুর্যোগে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও নিখোঁজ হয়েছেন। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৬ জন পুলিশ সদস্য, নয়জন সশস্ত্র পুলিশ সদস্য এবং ৪৪ জন সেনাসদস্যের এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনের কয়েকজন কর্মকর্তাও নিখোঁজ রয়েছেন।

বন্যায় সড়ক, সেতু, যোগাযোগব্যবস্থা ও পানিবিদ্যুৎ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ত্রিশুলি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিভিন্ন এলাকার সেতু ভেসে গেছে।

৮৮ জনকে উদ্ধার, চলছে ব্যাপক অভিযান

নেপালের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ৮৮ জন বন্যাদুর্গতকে উদ্ধার করা হয়েছে। মাইলুং গ্রামে আটকে পড়া আরো ১১৫ জনকে উদ্ধারে অভিযান চলছে।

অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে ১৫টি হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে। দুর্গম এলাকা ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে।

চীনের তিব্বতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

নেপালের পাশাপাশি চীনের নিয়ন্ত্রিত তিব্বতেও দুর্যোগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। দুই দেশের সীমান্তবর্তী একটি বাণিজ্যকেন্দ্রে ভূমিধসের ঘটনায় ব্যাপক হতাহতের খবর জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিখোঁজদের উদ্ধারে সর্বাত্মক তৎপরতার নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি দ্বিতীয় দফা দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবেলায় পর্যবেক্ষণ জোরদার ও আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা কার্যকর করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

চীনা কর্তৃপক্ষ তিব্বতে উদ্ধার ও ত্রাণকাজে প্রতিনিধিদল পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকরাও নিখোঁজ

আকস্মিক বন্যার পর আটজন দক্ষিণ কোরীয় নাগরিকের সাথে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নিখোঁজ ব্যক্তিরা ওই এলাকায় একটি পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের কাজে যুক্ত ছিলেন।

এ ছাড়া আরো ১০ জন দক্ষিণ কোরীয় নাগরিক ওই এলাকায় আটকা পড়েছেন এবং উদ্ধারের অপেক্ষায় রয়েছেন। তাদের উদ্ধারে নেপাল সরকার একটি হেলিকপ্টার পাঠিয়েছে।

আগে কোনো সতর্কবার্তা ছিল না?

কাঠমান্ডুভিত্তিক একটি লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠানের মালিক ইয়ে লিয়াং জানিয়েছেন, বন্যাকবলিত এলাকায় তার প্রতিষ্ঠানের সাতটি কনটেইনার ট্রাক ছিল। ট্রাকগুলোতে কর্মরত নেপালি শ্রমিকদের কারো সাথে তিনি যোগাযোগ করতে পারছেন না।

তার দাবি, ঘটনাস্থলে কোনো মোবাইল সিগন্যাল নেই এবং দুর্যোগের আগে কোনো সতর্কবার্তাও দেয়া হয়নি।

তিনি বলেন, বর্ষাকালে ওই এলাকায় মাঝেমধ্যে কাদাধস ও ভূমিধস হলেও এবারের পরিস্থিতি অনেক বেশি ভয়াবহ।

এদিকে তিব্বতে সড়ক ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে কর্মরত এক ব্যক্তির স্বজনও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা জানিয়েছেন। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উদ্ধার ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে হেলিকপ্টার ব্যবহারের চেষ্টা করা হলেও প্রবল বাতাসের কারণে তা কঠিন হয়ে পড়েছে।

নেপাল ও চীন—দুই দেশেই এখন নিখোঁজদের সন্ধান এবং দুর্গতদের উদ্ধারে ব্যাপক অভিযান চলছে। তবে দুর্গম ভূখণ্ড, বিচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উদ্ধারকাজ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

সূত্র : বিবিসি