মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আর অর্থনৈতিক অবরোধ যখন ইরানের অর্থনীতিকে একপ্রকার হাঁসফাঁস অবস্থায় ফেলে দিয়েছে, ঠিক তখনই বিশ্বরাজনীতির জটিল দাবাখেলায় এক অভিনব চাল চেলেছে তেহরান ও বেইজিং। কোনো প্রচলিত ব্যাংকিং চ্যানেল বা ডলারের লেনদেন ছাড়াই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে দেশ দুটি। কৌশলে তেলের বিনিময়ে চীন থেকে আসছে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, যানবাহন থেকে শুরু করে স্পর্শকাতর সামরিক সরঞ্জাম।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক বিধিনিষেধ এড়িয়ে ইরান ও চীন গোপনে এই পণ্য বিনিময় বা বার্টারভিত্তিক ব্যবস্থা চালু রেখেছে। বিশ্ববাজারে স্বস্তি বজায় রাখতে এবং মার্কিন নজরদারি থেকে নিজেদের স্বনামধন্য ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষায় রাখতে এই পথ বেছে নিয়েছে বেইজিং।
আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অন্যতম শীর্ষ আমদানিকারক দেশ চীন। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও গত বছরে ইরান থেকে রফতানি হওয়া মোট তেলের ৮০ শতাংশের বেশি অর্থাৎ দৈনিক গড়ে ১৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল কিনেছে চীন। এই তেলের বিপরীতে কোনো নগদ ডলার লেনদেন হয় না। পরিবর্তে চীনে তৈরি হয় বিশেষ ‘ক্রেডিট’ বা জমা তহবিল, যা দিয়ে চীনা পণ্য কেনে তেহরান।
বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা যায়, এ প্রক্রিয়ায় ‘চুশিন’ নামের এক রহস্যময় আর্থিক সত্তা ও বিশেষ এক তহবিলের মাধ্যমে অর্থ আদান-প্রদান করা হয়। মজার বিষয় হলো, অফিশিয়াল নথিপত্রে এই ‘চুশিন’-এর অস্তিত্ব কেবল এক্সেল স্প্রেডশিটেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে! এর মাধ্যমে জমাকৃত তহবিলের আনুমানিক ৭০ শতাংশ ইরানের অবকাঠামো খাতে ব্যয় হয়। আর বাকি অংশ দিয়ে কেনা হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। সংশ্লিষ্টদের মতে, গত এক বছরেই কেবল বিশেষ এই মাধ্যমে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ কোটি (২-২.৫ বিলিয়ন) ডলার লেনদেন হয়েছে।
এই কৌশলী ব্যবস্থার সুবিধা পাচ্ছে দুই দেশই। একদিকে ইরান যেমন তাদের জন্য অতি জরুরি ওষুধ, যানবাহন, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং অন্তত একবার হলেও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার যন্ত্রাংশ পেয়েছে, অন্যদিকে চীনও কোনো বৈশ্বিক আর্থিক জরিমানার মুখোমুখি না হয়ে কম দামে তেল পাওয়ার সুবিধা পাচ্ছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন অবরোধ আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে ইরানের তেলবাহী জাহাজ চলাচলে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। তা সত্ত্বেও বেইজিং স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়া একপাক্ষিক যেকোনো মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান কঠোর। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই নির্দিষ্ট মেকানিজম সম্পর্কে অবহিত নয় বলে জানালেও, আন্তর্জাতিক আইন বহির্ভূত নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা পুনর্ব্যক্ত করেছে।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বেইজিং একদিকে ওয়াশিংটনকে বার্তা দিচ্ছে যে তাদেরকে ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখা যাবে না, অন্যদিকে নিজেদের মূল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া থেকেও রক্ষা করছে। এক কথায়—নিষেধাজ্ঞার চোখ রাঙানি এড়িয়ে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার এই সমীকরণ চীন ও ইরানকে এক অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে রেখেছে।



