ভারত মহাসাগর এখন আর কেবল নীল জলরাশি নয়, বরং আগামীর যুদ্ধকৌশল ঠিক করার আসল ময়দান হয়ে উঠেছে। করাচিতে বৃহস্পতিবার ‘ইমার্জিং টেকনোলজিস অ্যান্ড দ্য ফিউচার ওয়ারফেয়ার’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে পাকিস্তান নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল নাভিদ আশরাফ এই মন্তব্য করেন।
তার মতে, বিশ্ব বাণিজ্যে ভারত মহাসাগরের যে বিশাল অবদান, তাতে এখানে সামান্য বিশৃঙ্খলা দেখা দিলেই বৈশ্বিক সরবরাহ শিকল বা সাপ্লাই চেইন এবং জ্বালানির বাজারে বড় ধরনের ধস নামতে পারে। তিনি পরিষ্কার ভাবে ব্যক্ত করেন, আধুনিক প্রযুক্তি এখন যুদ্ধের সংজ্ঞাই বদলে দিচ্ছে, যেখানে বেসামরিক বা সিভিলিয়ান এবং সামরিক বা মিলিটারি প্রযুক্তির পার্থক্য দ্রুত ঘুচে যাচ্ছে। এই নতুন বাস্তবতাকে মাথায় রেখে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর ওপর জোর দেন তিনি।
পাকিস্তান নৌপ্রধানের এই বক্তব্যের পেছনে রয়েছে ভারত মহাসাগরের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব। এই মহাসাগর দিয়ে বিশ্বের একটি বড় অংশের পণ্য পরিবহন হয়।
অ্যাডমিরাল নাভিদ আশরাফ মনে করেন, আধুনিক সমরপ্রযুক্তির সাথে তাল মেলাতে না পারলে আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন হবে। বিশেষ করে একা চলার চেয়ে ইন্ডাস্ট্রি বা শিল্প, ব্যবহারকারী এবং গবেষকদের সাথে মিলেমিশে কাজ করার পরামর্শ দেন তিনি। তার লক্ষ্য হলো পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে স্বাবলম্বী করে তোলা এবং বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব প্রযুক্তিতে বিশ্বমানের অস্ত্র তৈরি করা, যা ভবিষ্যতে বিদেশের বাজারে রপ্তানি করে পাকিস্তানের পক্ষে বৈদেশিক মুদ্রাও আয় করা সম্ভব হবে।
এই আলোচনার রেশ ধরে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা খাতের কিছু সাম্প্রতিক সফলতার কথাও সামনে এসেছে। চলতি বছরের শুরুতেই পাকিস্তান নৌবাহিনী ওমানের সাথে যৌথ মহড়া চালিয়েছে। এছাড়া উত্তর আরব সাগরে নিজস্ব প্রযুক্তির ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ ক্ষেপণাস্ত্র বা সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল এবং ড্রোনের পরীক্ষা চালিয়ে পাকিস্তান বাহিনী নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে।
গত বছরের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনার সময়ও পাকিস্তান নৌবাহিনী বেশ কৌশলী ভূমিকা নিয়েছিল। কর্মকর্তাদের দাবি, সেই সময় ভারতের বিমানবাহী রণতরী আইএনএস বিক্রান্তকে তারা আরব সাগরে কোনো সুবিধা করতে দেয়নি এবং পাকিস্তান নিজেদের বাণিজ্যিক রুট পুরোপুরি নিরাপদ রাখতে সক্ষম হয়েছিল।
সব মিলিয়ে পাকিস্তান নৌবাহিনী এখন কেবল সমুদ্র পাহারাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ড্রোনের মতো আধুনিক প্রযুক্তির যুগে নিজেদের এক ধাপ এগিয়ে রাখতে চাইছে। নৌপ্রধানের বক্তব্যে এটা পরিষ্কার যে, ভারত মহাসাগরের ওপর নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বিস্তারই এখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ। এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে তার মাশুল যে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে দিতে হবে, সেই বার্তাই তিনি কড়া ভাষায় পৌঁছে দিয়েছেন। মূলত প্রযুক্তি এবং রণকৌশলের মেলবন্ধনেই পাকিস্তান তাদের নৌ-সীমানার ভবিষ্যৎ দেখছে।
সূত্র: দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন



