ইমাম হোসাইন রা:-এর বংশধর মাওলানা সালমান নদভির দাফন সম্পন্ন

মাওলানা সালমান নদভি ১৯৫৪ সালে ভারতের লক্ষ্ণৌর একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন রা:-এর বংশধারার সাথে যুক্ত বলে পরিচিত।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
মাওলানা সালমান নদভির জানাজার দৃশ্য। ইনসেটে মাওলানা সালমান নদভি
মাওলানা সালমান নদভির জানাজার দৃশ্য। ইনসেটে মাওলানা সালমান নদভি |সংগৃহীত

উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম, বিশিষ্ট ইসলামী স্কলার, গবেষক ও বহু গ্রন্থপ্রণেতা ভারতের মাওলানা সাইয়েদ সালমান আল-হুসাইনি নদভির দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

সোমবার (২৯ জুন) আসরের নামাজের পর দেশটির উত্তরপ্রদেশের লক্ষ্ণৌর জামিয়া সাইয়েদ আহমদ শহীদ কাটোলিতে জানাজা শেষে সেখানেই তাকে দাফন করা হয়।

এর আগে, এদিন ভোরে মরহুমের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে তার মত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয় এবং জানানো হয়, লক্ষ্ণৌর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

মৃত্যুকালে মাওলানা সালমান নদভির বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। তার ইন্তেকালের খবরে ভারতসহ উপমহাদেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

শায়খ সালমান আল-হুসাইনির মৃত্যুতে বিশ্বের ইসলামী ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদরা গভীর শোক জানিয়েছেন।

কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক ইসলামী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর মুসলিম স্কলার্স-এর প্রেসিডেন্ট ড. আলি মুহিউদ্দিন আল-কারাদাগি এক বার্তায় লিখেছেন, ‘গভীর দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমি মুসলিম উম্মাহকে আমার ৩০ বছরেরও বেশি সময়ের ভাই, বন্ধু ও সঙ্গী বিশিষ্ট আলেম, হাদিস বিশেষজ্ঞ এবং চিন্তাবিদ, সাইয়্যেদ শায়খ সালমান আল-হুসাইনি নদভির ইন্তেকালের সংবাদ জানাচ্ছি। তিনি ছিলেন আইইউএমএস-এর ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এবং ভারতের লক্ষ্ণৌতে অবস্থিত জামেয়া ইমাম আহমদ ইবনে ইরফান শহীদের প্রেসিডেন্ট।’

শায়খ সালমানের স্মৃতিচারণ করে তিনি লিখেছেন, ‘শায়খ সালমান তার রবের কাছে চলে গেছেন। তিনি রেখে গেছেন এমন এক উত্তরাধিকার যা সাক্ষ্য দেয় এমন একজন আলেমের, যার জ্ঞান কেবল কিতাবে সীমাবদ্ধ ছিল না এবং তার দাওয়াতও মিম্বরে সীমিত ছিল না। বরং, তিনি ছিলেন একজন মিশন-মানব, যিনি ভারতে ইসলামের বোঝা বহন করেছেন, নবীর সুন্নাহর খেদমত করেছেন, প্রজন্মকে লালন-পালন করেছেন, প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন এবং উম্মাহর বিভিন্ন বিষয়ে এমন একজন আলেমের অবস্থানে দাঁড়িয়েছেন, যিনি জ্ঞানকে আমানত, বাণীকে সাক্ষ্য এবং দাওয়াহকে দায়িত্ব হিসেবে দেখেন।’

ড. আল-কারাদাগি আরো লেখেন, ‘আমি তাকে একজন আন্তরিক ভাই, একজন বিশ্বস্ত বন্ধু এবং একজন দূরদর্শী আলেম হিসেবে চিনতাম, যার ছিল এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং নিজ ধর্ম ও জাতির প্রতি গভীর অনুরাগ। তিনি কখনো সত্যের সাথে আপস করেননি। কখনো নীতির সাথে আপোস করেননি এবং জ্ঞানকে কখনো সমাবেশের নিছক সজ্জা হিসেবে ব্যবহার করেননি। বরং, তার কাছে জ্ঞান ছিল কর্ম, ইসলামের দিকে আহ্বান ছিল নির্মাণ এবং জাতির প্রতি আনুগত্য ছিল এক অটুট অঙ্গীকার।’

মালয়েশিয়ার প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও ইসলামিক পার্টির প্রেসিডেন্ট আবদুল হাদি আওয়াং এক শোকবার্তায় লিখেছন, ‌‘মরহুম শায়খ একজন প্রখ্যাত আলেম ছিলেন, যিনি কোরআন অধ্যয়ন, হাদিস, দাওয়াহ এবং ইসলামী চিন্তাধারার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। তিনি একসময় লক্ষ্ণৌর দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। একইসাথে ভারতসহ বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহর উন্নয়নে অবদান রাখা অসংখ্য শিক্ষা, দাতব্য ও দাওয়াহ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার পাণ্ডিত্যপূর্ণ কাজ, বক্তৃতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার অবিচল প্রচেষ্টার মাধ্যমে মরহুম শায়খ এক স্থায়ী বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উপকৃত করতে থাকবে। নিঃসন্দেহে, তার মৃত্যু ইসলামী বিশ্বের জন্য এক বিরাট ক্ষতি।’

ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের উত্তর প্রদেশের সভাপতি অজয় রাই এক্স-এর এক বার্তায় লিখেছেন, ‘নদওয়াতুল উলামার মহান শিক্ষক, মাদরাসা কতাউলিসহ সারা দেশের শত শত মাদরাসার প্রধান পৃষ্ঠপোষক, শত শত গ্রন্থের লেখক এবং আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী পণ্ডিত হজরত মাওলানা সাইয়েদ সালমান হুসাইনি নদভি আজ সকালে তার নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেছেন। আমরা আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন মরহুমকে ক্ষমা করেন এবং তার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ধৈর্য ও শক্তি দান করেন।’

বাংলাদেশের অসংখ্য আলেম ও মাদরাসা শিক্ষার্থীরাও মাওলানা সালমান নদভির ইন্তেকালে ব্যথিত হয়েছেন এবং শোক প্রকাশ করেছেন।

একনজরে মাওলানা সালমান নদভি
মাওলানা সালমান নদভি ১৯৫৪ সালে ভারতের লক্ষ্ণৌর একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন রা:-এর বংশধারার সাথে যুক্ত বলে পরিচিত।

সালমান নদভির শিক্ষা জীবন লক্ষ্ণৌর দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামায় শুরু হয়। সেখানে তিনি কোরআনে হাফেজ হন এবং পরবর্তীকালে ১৯৭৪ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন। ১৯৭৬ সালে একই প্রতিষ্ঠান থেকে হাদিস শাস্ত্রে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

পরে ১৯৮০ সালে তিনি সৌদি আরবের রিয়াদে অবস্থিত ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সাউদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রখ্যাত আলেম শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ:-এর তত্ত্বাবধানে হাদিস গবেষণায় পুনরায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

শিক্ষাজীবন শেষে তিনি দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে তিনি প্রতিষ্ঠানটির দাওয়াহ ও শরিয়াহ অনুষদের ডিন হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি দেশ-বিদেশের অসংখ্য শিক্ষার্থীর শিক্ষক ও দিকনির্দেশক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

সালমান নদভির আরবি ও উর্দু ভাষায় ইসলামী ধর্মতত্ত্ব, ইতিহাস, আকিদা ও হাদিস বিষয়ে তার বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রয়েছে। তিনি ইংরেজি, উর্দু, আরবি ও ফারসি ভাষায় প্রকাশিত বেশ কয়েকটি জার্নাল সম্পাদনা ও সহ-সম্পাদনাও করেছেন।

মাওলানা সালমান নদভি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি ড. আব্দুল আলী ইউনানি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান, জামেয়া দারুল উলুম সাইয়েদ আহমদ শহীদ কাটোলিরর চ্যান্সেলর এবং জমিয়ত শাবাব উল ইসলামের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।