ভারতে বিমান দুর্ঘটনা

স্বজনদের লাশ বুঝে নিতে হাসপাতালে অপেক্ষার প্রহর

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, নিহতদের ডিএনএ পরীক্ষার পরেই আনুষ্ঠানিকভাবে নিহতের সংখ্যা জানানো হবে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
আহমেদাবাদ সিভিল হাসপাতালে লাশের ময়নাতদন্ত চলছে
আহমেদাবাদ সিভিল হাসপাতালে লাশের ময়নাতদন্ত চলছে |সংগৃহীত

ভারতের বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আহমেদাবাদের বিমান দুর্ঘটনায় উদ্ধারকাজ শেষ করেছে তারা। এখন নিহত স্বজনদের লাশ বুঝে নিতে হাসপাতালে অপেক্ষা করছেন পরিবারের সদস্যরা।

উদ্ধারকাজে সমাপ্তি ঘোষণার পর এয়ার ইন্ডিয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ওই বিমানে থাকা ২৪১ জন মারা গেছেন। একমাত্র জীবিত ব্যক্তিকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

তবে ব্রিটিশ নাগরিক ওই জীবিত ব্যক্তির ভাই, যিনি পাশের আসনেই বসেছিলেন, তিনি মারা গেছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এর বাইরে, মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের যে হোস্টেলের ওপরে বিমানটি ভেঙ্গে পড়েছিল, সেখানে অন্তত চারজনের মৃত্যু হয়েছে বলে গতরাতে জানিয়েছিলেন ওই মেডিক্যাল কলেজের ডিন।

তবে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় মোট কতজনের মৃত্যু হয়েছে, তা এখনো সরকারিভাবে জানানো হয়নি।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, নিহতদের ডিএনএ পরীক্ষার পরেই আনুষ্ঠানিকভাবে নিহতের সংখ্যা জানানো হবে।

ডিএনএ পরীক্ষার জন্য রাতভর অপেক্ষা করছেন স্বজন হারানো বহু মানুষ।

সেই ভিড়ে যেমন বিমানটির যাত্রীদের পরিজনেরা আছেন, তেমনই আছেন দুই কেবিন ক্রু ইরফানের বাবা ও সিঙসনের চাচাতে ভাইও।

ময়নাতদন্তের ঘরের সামনে ভিড়

আহমেদাবাদের সিভিল হাসপাতালটিই বিমানবন্দরের সবথেকে কাছের হাসপাতাল। দুপুরে বিমানটি ভেঙ্গে পড়ার পরে তাই সেখানেই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল উদ্ধার করা লাশ আর আহতদের। রাত প্রায় দেড়টা নাগাদ ওই হাসপাতালের ময়নাতদন্তের ঘরের সামনে দেখা হয় টি থাঙলিঙো হাওকিপের সাথে।

তার চাচাতে বোন সিঙসন ছিলেন এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট ১৭১-এর বিমানবালা।

হাওকিপ জানান, সিঙসনের খবরাখবর নিতে বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে চেষ্টা করছেন তিনি, তবে কোনো খবরই পাননি।

তিনি বলেন, ‘ওর মা খুবই চিন্তায় আছে। ওর বাবা নেই, ভাইয়ের ক্যান্সার হয়েছে। পরিবারে একমাত্র রোজগার করত ও-ই। পুরো পরিবার ওর ওপরেই নির্ভর করত।’

সিঙসনের সাথেই ক্রু হিসেবে ওই বিমানে ছিলেন ইরফান।

তার বাবা সামির শেখ বলছিলেন, ছেলে খুব বেশি ফোন করত না, কিন্তু প্রতিবার বিমান আকাশে ওড়ার আগে আর পৌঁছানার পরে বাবাকে জানাতেন ইরফান।

সেভাবেই বৃহস্পতিবার দুপুরে একটা ফোন আসে সামির শেখের কাছে, এয়ার ইন্ডিয়া থেকে।

প্রথমে একটু অবাক হয়ে গিয়েছিলেন তিনি, কারণ ছেলের বিমান তো তখন লন্ডনের দিকে উড়ে গেছে!

তিনি বলেন, ‘আমাদের জানানো হলো, বিমান ভেঙ্গে পড়েছে, ছেলে আর নেই।’

তিনি মহারাষ্ট্রের পুনে শহর থেকে তখনই বিমানে করে আহমেদাবাদ রওনা হয়ে গিয়েছিলেন ছেলের লাশ নিতে।

সামির শেখ বলছিলেন, এয়ার ইন্ডিয়ার কর্মকর্তারা তার ছেলেকে শনাক্ত করতে সহযোগিতা করেছেন।

তিনি বলেন, ‘কিন্তু পুলিশ তো ছেলেকে ফিরিয়ে নিতে দিচ্ছে না। বলছে, সব দেহগুলোর ডিএনএ পরীক্ষা হলে তবেই তিন দিন পরে দেয়া হবে।’

তার স্ত্রী তখন রাস্তার এক ধারে বসে সমানে কেঁদে চলেছেন, আর তিনি নিজে হাসপাতাল চত্বরে একে তাকে ধরছেন, যদি কেউ সাহায্য করতে পারে।

তার দিকে দেখিয়ে সামির শেখ বললেন, ‘আমরা কী করব এখন! আমরা তো নিশ্চিত ওটা আমার ছেলেরই দেহ, তবুও তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে আমাদের?’

হাসপাতাল চত্বরে রাতভর আত্মীয় পরিজনেরা ডিএনএ পরীক্ষার জন্য রক্ত দিতে অপেক্ষা করেছেন।

তবে কর্মকর্তারা বলছেন, দেহ শনাক্ত করতে কিছুটা সময় লাগবে, কারণ বিমানটি ভেঙ্গে পড়ার অভিঘাতটা এতই বড় ছিল যে অনেক শরীরই আর শনাক্ত করার মতো অবস্থায় নেই।

এক ভাই জীবিত, অন্য ভাই নিহত

বিশোয়াসকুমার রমেশ ভেঙ্গে পড়া বিমানটি থেকে আহত অবস্থায় হেঁটে বেরিয়ে আসছেন, এই ভিডিও এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল।

লন্ডনের বাসিন্দা, ব্রিটিশ নাগরিক রমেশ বিধ্বস্ত বিমানের ১১এ আসনে বসেছিলেন। বিমানের নকশা থেকে জানা গেছে, ওই আসনের পাশেই ছিল ‘ইমারজেন্সি এক্সিট’।

আর তার অন্য পাশে বসেছিলেন বিশোয়াসকুমারের ভাই অজয়কুমার।

রমেশের আরেক ভাই নয়নকুমার রমেশ বলছেন, ‘(বিশোয়াসকুমার) বুঝতেই পারেনি যে কিভাবে ও বেঁচে গেল, কী করেই বা ও বিমান থেকে বেরতে পারলো। যখন আমরা ঘটনাটা জানতে পারলাম, আমরা তো ভেঙ্গে পড়েছিলাম। কথা বলার অবস্থায় ছিলাম না কেউ।’

তার কথায়, ‘বিশোয়াস যখন আমাদের ফোন করল, তখন আমার অন্য ভাইয়ের জন্য ও বেশি চিন্তিত ছিল। শুধুই বলছিল অজয়কে খোঁজো, অজয়কে খুঁজে বের করো।’

রাতে আহমেদাবাদের হাসপাতালে বিমান বিধ্বংসে একমাত্র জীবিত রমেশকে দেখতে গিয়েছিলেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।

পেশায় ব্যবসায়ী বিশোয়াসকুমার রমেশের জন্ম ভারতেই, তবে তিনি ২০০৩ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে থাকেন। তার স্ত্রী এবং চার বছরের ছেলে আছে।

নিহত গুজরাটের সাবেক মুখ্যমন্ত্রীও

ভেঙ্গে পড়া বিমানটির ২৪২ জন যাত্রীর মধ্যেই ছিলেন গুজরাটের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রুপানিও। লন্ডন-প্রবাসী মেয়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছিলেন তিনি।

তার ছেলে শ্রমণ ও মেয়ে রাধিকা দুজনেই বিদেশে থাকেন। আরেক ছেলে পূজিত আগেই মারা গেছেন।

পেশায় স্টক মার্কেট ব্যবসায়ী বিজয় রুপানি ২০১৬ সালের এমন একটা সময়ে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী পদে বসেছিলেন, যখন রাজ্যে বেশ অস্থিরতা চলছিল।

নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হয়ে যাওয়ার পরে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী পদে বসানো হয়েছিল আনন্দীবেন প্যাটেলকে। কিন্তু মাত্র দু’বছরেই মধ্যেই নির্বাচনে জয়লাভের পরে বিজেপি তাকে সরিয়ে বিজয় রুপানিকে মুখ্যমন্ত্রী করে।

ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, বিজয় রুপানির স্ত্রী আগেই তাদের মেয়ের কাছে লন্ডনে চলে গিয়েছিলেন। রুপানি আলাদাভাবে যাচ্ছিলেন পরিবারের কাছে। স্ত্রীর সাথে জুলাই মাসে ভারতে ফেরার টিকিটও কাটা ছিল বলে জানিয়েছে তার ঘনিষ্ঠ মহল।

পুরো পরিবারই শেষ

নিহতদের তালিকায় এমন একাধিক নাম রয়েছে, যারা সপরিবারে চেপেছিলেন ভেঙ্গে পড়া এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানটিতে।

যুক্তরাজ্যের গ্লস্টার বাসিন্দা আকিল নানাবাওয়া, তার স্ত্রী হানা ভোরাজি তাদের চার বছরের মেয়ে সারা নানাবাওয়া যেমন ছিলেন বিমানে, তেমনই আহমেদাবাদ থেকে লন্ডনে যাচ্ছিলেন ৭২ বছরের আদাম তাজু, স্ত্রী হাসিনাও। সাথে ছিলেন তাদের ৫১ বছর বয়সী জামাই আলতাফহুসেন প্যাটেল।

এরা তিনজনেই লন্ডনের বাসিন্দা ছিলেন।

বিমানটিতে চড়ার আগে আহেমদাবাদ বিমানবন্দর থেকেই ইনস্টাগ্রামে একটা ভিডিও পোস্ট করেছিলেন বিবাহিত দম্পতি ফিওঙ্গাল ও জেমি গ্রিনল-মিক।

ওই ভিডিওতে তাদের হাসাহাসি করতে দেখা গিয়েছিল, ভারত ভ্রমণ নিয়ে দুজনে মজাও করছিলেন তারা।

ভেঙ্গে পড়া বিমানে দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে চেপেছিলেন পশ্চিম লন্ডনের বাসিন্দা জাভেদ সৈয়দ ও তার স্ত্রী মারিয়ম। এদের কেউই আর জীবিত নেই।

এয়ার ইন্ডিয়া জানিয়েছে, নিহতদের আত্মীয়স্বজনকে ভারতে নিয়ে আসার জন্য তারা বিশেষ বিমান পাঠিয়েছে লন্ডনে।

সূত্র : বিবিসি