ভারত সীমান্তে ২৫০ চীনা কামান বসাল পাকিস্তান : ছোড়া যাবে ন্যাটোর গোলাও

'অপারেশন সিঁদুর'র পর সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটাই পাকিস্তানের নেয়া সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
'নরিনকো' এই এসএইচ-১৫ মডেলের ১৫৫ মিলিমিটারের স্বচালিত কামান
'নরিনকো' এই এসএইচ-১৫ মডেলের ১৫৫ মিলিমিটারের স্বচালিত কামান |সংগৃহীত

ভারত সীমান্তে নিজেদের সামরিক শক্তি বাড়াতে ২৫০টি চীনা তৈরি 'এসএইচ-১৫' স্বচালিত কামান মোতায়েন করেছে পাকিস্তান। এসব কামান ট্রাকে বসানো এবং এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সহজে নিয়ে যাওয়া যায়।

ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের বরাত দিয়ে সোমবার (৩ আগস্ট) এ তথ্য জানিয়েছে অপর গণমাধ্যম দ্য হিন্দুস্তান টাইমস।

ভারতের শীর্ষ গোয়েন্দা সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে খবরে বলা হয়, পাকিস্তানের পূর্ব সীমান্তে ভারতের মুখোমুখি উত্তর থেকে দক্ষিণ দিক পর্যন্ত প্রধান ক্ষেত্রগুলোতে এই ১৫৫ মিলিমিটারের কামানগুলো বসানো হয়েছে।

২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের চালানো সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান 'অপারেশন সিঁদুর'র পর সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটাই পাকিস্তানের নেয়া সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ। ওই বছরের ২২ এপ্রিল পাহালগামে একটি সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর ভারতের সশস্ত্র বাহিনী এই অপারেশন শুরু করেছিল।

এসএইচ-১৫ কামানের বিশেষত্ব

চীনের সরকারি অস্ত্র তৈরি প্রতিষ্ঠান 'নরিনকো' এই এসএইচ-১৫ মডেলের ১৫৫ মিলিমিটারের স্বচালিত কামানটি তৈরি করেছে। সামরিক তথ্যভিত্তিক প্রকাশনা 'জেনস'র দেয়া তথ্যানুযায়ী, ছয় চাকার একটি গাড়ির ওপর এই কামানটি বসানো রয়েছে। এর ক্যানভাস বা চার দরজার কেবিনটি পুরোপুরি ঢাকা। এর ছাদে ১২.৭ মিলিমিটারের একটি মেশিনগানও যুক্ত করা আছে। এই কামানে ৪০০ অশ্বশক্তির একটি ডিজেল ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতি টনের জন্য এতে ১৫.৬৮ অশ্বশক্তির পাওয়ার-টু-ওয়েট অনুপাত বা শক্তি এবং ওজনের সামঞ্জস্য রয়েছে।

এই কামান দিয়ে ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত গোলা ছোড়া যায়। এটি ন্যাটোর মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ । অর্থাৎ, কামানটি ন্যাটো জোটের সামরিক মানদণ্ড বা স্পেসিফিকেশন (যেমন: ১৫৫ মিমি স্ট্যান্ডার্ড) মেনে তৈরি। তাই ন্যাটো দেশগুলো যে মাপের গোলা ব্যবহার করে, পাকিস্তান বা চীনের তৈরি এই কামানটি সেই একই মাপে তৈরি হওয়ায় ন্যাটো-স্ট্যান্ডার্ডের যেকোনো গোলা এতে অনায়াসে ব্যবহার করা যাবে।

নরিনকো জানিয়েছে, এর সর্বোচ্চ পাল্লা নির্ভর করে কী ধরনের গোলা ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর। তবে তাদের তৈরি বিশেষ বিস্ফোরক রকেট-সহায়ক গোলা ব্যবহার করলে এটি সর্বোচ্চ ৫০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।

ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, এই কামানে একটি স্বয়ংক্রিয় আগুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং হাইড্রোলিক ব্যবস্থা রয়েছে, যা গাড়িটিকে শক্তভাবে মাটিতে ধরে রাখে। এর ফলে এটি খুব দ্রুত নামানো যায়, প্রতি ৬০ সেকেন্ডে ছয়টি গোলা ছোড়া যায় এবং প্রতিপক্ষ জবাব দেয়ার আগেই দ্রুত নিজের অবস্থান বদলে ফেলা যায়।

১৫৫ মিলিমিটারের সহজ হিসেব

কামানের গায়ে '১৫৫ মিলিমিটার' লেখা দেখার সহজ অর্থ হলো— এর নলের ভেতরের গোল মুখটার চওড়া বা ব্যাস ঠিক ১৫.৫ সেন্টিমিটার (প্রায় ৬ ইঞ্চি)। ঠিক একইভাবে, এই কামানে যে গোলাটি পোরা হয়, সেটার পেটের মাপও ১৫.৫ সেন্টিমিটার।

সামরিক হিসাব অনুযায়ী, কামান বা গোলন্দাজ বাহিনীকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়:

হালকা পাল্লা (১০৫ মিমি পর্যন্ত) : সাধারণত ১০৫ মিলিমিটার বা তার ছোট ব্যাসের গোলাগুলোকে হালকা শ্রেণীর ধরা হয়। এগুলো হালকা ও সহজে বহনযোগ্য হলেও এর ধ্বংসক্ষমতা ও পাল্লা কিছুটা কম।

মাঝারি পাল্লা (১২২ থেকে ১৫৫ মিমি) : ১২২ মিলিমিটার থেকে শুরু করে ১৫৫ মিলিমিটার পর্যন্ত গোলা মাঝারি থেকে ভারী শ্রেণীর মূল শক্তি। বর্তমানে ১৫৫ মিলিমিটারকেই আন্তর্জাতিক ও ন্যাটো জোটের স্ট্যান্ডার্ড মাঝারি-ভারী দূরপাল্লার মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়।

ভারী পাল্লা (২০৩ মিমি বা তার বেশি) : সাধারণত কামানের গোলার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ব্যাস সাধারণত ২০৩ মিলিমিটার (৮ ইঞ্চি) বা ক্ষেত্রবিশেষে ২৪০ মিলিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এগুলো অত্যন্ত ভারী ও প্রকাণ্ড ধ্বংসক্ষমতাসম্পন্ন।

১৫৫ মিলিমিটার কামানের প্রধান সুবিধা হলো, এর নলের ব্যাস বড় হওয়ায় গোলার ভেতরে প্রচুর পরিমাণ শক্তিশালী বিস্ফোরক, রকেট-মোটর বা আধুনিক জিপিএস প্রযুক্তি বসানোর বড় সুযোগ থাকে। ফলে এই আকারের গোলা দিয়ে বহুদূরের লক্ষ্যবস্তু অনায়াসে গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।

চীন-পাকিস্তান সামরিক সম্পর্ক

চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে গভীর হতে থাকা সামরিক সম্পর্কেরই প্রমাণ দেয় এ ঘটনা। গত কয়েক বছরে এই সম্পর্ক আরো জোরদার হয়েছে। সম্প্রতি রাওয়ালপিন্ডির এক অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান অসীম মুনির বলেন, বেইজিং ও ইসলামাবাদের সম্পর্ক 'অনন্য ও সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ'। পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরের বরাত দিয়ে খবরে বলা হয়, ওই অনুষ্ঠানে পাকিস্তানে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত জিয়াং যায়দং, চীনা প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে মেজর জেনারেল ওয়াং ঝোং এবং চীনের দূতাবাসের অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচি বজায় রাখতে চলতি বছরের জুনে পাকিস্তান ৬৭.৪৯ বিলিয়ন ডলারের একটি বাজেট প্রস্তাব করে। এতে উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে প্রতিরক্ষা খাতের বাজেট বাড়ানো হয়।

পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব সংসদে জানান, জুলাই থেকে শুরু হতে যাওয়া নতুন অর্থবছরে প্রতিরক্ষা খাতে ৩ ট্রিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি বরাদ্দ দেবে সরকার। এটি বিদায়ী বছরের চেয়ে ১৮ শতাংশ বেশি।

গত বছর 'অপারেশন সিঁদুর'র পর পাকিস্তান তাদের অস্ত্রাগারে থাকা এই চীনা তৈরি ব্যবস্থার প্রশংসা করেছিল। ভারতের সাথে সংঘর্ষের সময় এটি অসাধারণ কাজ করেছে বলেও দাবি করেছিল তারা।