নেপাল-তিব্বত সীমান্তে বন্যা ও ভূমিধসে নিহত বেড়ে ১৬৫

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৬৫ জনে দাঁড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) কয়েক শত নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধানে উদ্ধারকারী দলগুলো দ্রুত কাজ শুরু করেছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
নেপালের বন্যাকবলিত এলাকা
নেপালের বন্যাকবলিত এলাকা |সংগৃহীত

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৬৫ জনে দাঁড়িয়েছে। বন্যার পানিতে পুরো গ্রাম ভেসে গেছে। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) কয়েক শত নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধানে উদ্ধারকারী দলগুলো দ্রুত কাজ শুরু করেছে।

চীনের সীমান্ত এলাকার নজরদারি ক্যামেরার একটি ভিডিওতে বুধবার সকালে দেখা যায়, কয়েকতলা উঁচু একটি ভবনের ওপর কাদা ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত আছড়ে পড়ছে। নিচে কয়েক ডজন মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছেন। পানির স্রোত খেলনার মতো বাস ও গাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

কর্মকর্তারা জানায়, নিখোঁজদের অনেকেই বিদেশী পর্যটক। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, হিমবাহ ধসে এ দুর্যোগের সৃষ্টি হয়। এতে ধ্বংসাবশেষের স্রোত পথে থাকা এলাকাগুলো প্লাবিত করে।

ভয়াবহ গর্জনে পানি ও কাদার স্রোত ভুটে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী গ্রাম ও শহরগুলোতে আঘাত হানে।

নেপালের পুলিশ জানিয়েছে, তারা ১৬২টি লাশ উদ্ধার করেছে।

সীমান্তের ওপারে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বতের গিয়িরং বন্দরে ‘ভূমিধসের ঘটনায়’ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এখনো ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

নেপালের ৫৬ বছর বয়সী রাজু ভাদেল জানান, তিনি বিপদে থাকা তার ভগ্নিপতির কাছ থেকে ফোন পেয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ‘তারা কাঁদছিলেন এবং বলেছিলেন, তাদের পুরো বাড়ি ভেসে গেছে। পরিবারের তিন সদস্যকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে তার ভাই এখনো নিখোঁজ।’

বহুতল ভবনের নিচের তলাগুলো বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পর উদ্ধারকর্মীরা কাদা ও পাঁকের মধ্য দিয়ে হেঁটে জীবিতদের সন্ধান করেন।

নেপালের পর্যটন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুর্যোগ আঘাত হানার কয়েক ঘণ্টা পর শত শত পর্যটকের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। তাদের মধ্যে ৩৪১ জনই বিদেশী।

নিখোঁজ বিদেশীদের মধ্যে ১৪২ জন ভারতীয়। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরাও রয়েছেন বলে পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিস ফেডারেশনের (আইএফআরসি) নেপালপ্রধান ডেভিড ফিশার বলেন, ‘পুরো গ্রাম ও বাজার এলাকা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।’

সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা কম্বল, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম, স্ট্রেচার ও লাশ বহনের ব্যাগসহ জরুরি ত্রাণসামগ্রী পাঠাচ্ছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানায়, তিব্বত সরকারের কর্মকর্তারা উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য প্রায় ৮০০ জরুরি কর্মী ও ১৫০টি যানবাহন মোতায়েন করেছেন। তাদের সাথে রয়েছে অনুসন্ধানী কুকুর ও দ্রুতগতির নৌকা।

পুরো বাড়ি ভেসে গেছে
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, নদীতে এখনো যে বাধা রয়েছে, তা নতুন করে বন্যার সৃষ্টি করতে পারে।

জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে নিয়মিত প্রাণঘাতী বন্যা ও ভূমিধস হয়।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরো ঘন ঘন ঘটছে এবং এর তীব্রতাও বাড়ছে।

বর্ষা মৌসুমে অনেক ট্রেকিং কোম্পানি পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ রাখে। তবে এ সময়ে ওই অঞ্চলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পর্যটক ও তীর্থযাত্রী থাকেন।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে জনপ্রিয় ট্রেকিং এলাকাগুলোর প্রবেশদ্বার সিয়াব্রুবেসি। এছাড়া বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র স্থান কৈলাস পর্বতের পাদদেশে যাওয়া তীর্থযাত্রীরাও সেখানে ছিলেন।

নেপালের পুলিশ প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, নদীর ওপর দিয়ে বন্যার পানি প্রবল স্রোতে বয়ে যাচ্ছে এবং পথে থাকা বাড়িঘর ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এএফপির ছবিতে দেখা গেছে, কাদায় ডুবে থাকা মাটির ওপর একটি বাড়ির ওপরের তলা বেরিয়ে রয়েছে।

নেপালের উত্তরের রাসুয়া জেলা প্রথম বন্যায় আক্রান্ত হয়। তবে বন্যার পানি নিচের দিকে প্রবাহিত হওয়ার সাথে সাথে মোট সাতটি নেপালি জেলায় মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দক্ষিণে ভারতের সীমান্তবর্তী চিতওয়ান পর্যন্ত এ বন্যা ছড়িয়ে পড়ে।

নেপালি সেনাবাহিনী আকাশপথে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। তারা বহু মানুষকে উদ্ধার করেছে। নদীর কাছাকাছি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের অন্যত্র সরে যেতে বলা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে যে ঘটনাটিকে ভূমিকম্প বলা হয়েছিল, সেটি আসলে ছিল ‘হিমবাহ ধস ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত।’ এর ফলে ‘নিচের দিকে ভয়াবহ বিপর্যয়’ ঘটে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি বুধবার জানিয়েছে, নেপাল অংশে একটি ‘ভূমিধসের ঘটনায়’ তিব্বতের গিয়িরং বন্দরে ‘বড় ধরনের হতাহত ও নিখোঁজের’ ঘটনা ঘটেছে।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, ‘সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো নিখোঁজদের খুঁজে বের করা ও উদ্ধারে সর্বাত্মক চেষ্টা করা।’ সিসিটিভি এ কথা জানিয়েছে।

তিব্বতের শিগাতসে এলাকার সড়ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানকার সড়কগুলো ‘ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে এবং তা চলাচলের জন্য নিরাপদ নয়’।

কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (আইসিআইএমওডি) জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাং দ্বিতীয় দফায় বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘নেপাল-চীন সীমান্তের নদীর উজানে এখনো একটি বাধা আটকে রয়েছে। কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে, দ্বিতীয় দফায় বন্যা হতে পারে।’

সূত্র : বাসস