হিমালয় থেকে নেমে আসা ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৫ হাজার ৫০০ জনের বেশি। টানা ১২ দিন ধরে উদ্ধার অভিযান চললেও তাঁদের বেঁচে থাকার আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। এই বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণ হিসেবে জাতিসংঘের কাছে ২ কোটি ডলার চেয়েছে নেপাল। একই সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পরিবেশ দূষণকারী দেশগুলোকে ‘জেগে ওঠার’ আহ্বান জানিয়েছে দেশটি।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান ৮ সেপ্টেম্বর এ খবর জানিয়েছে। পত্রিকাটিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিসির খানাল বলেছেন, বিপর্যয়ের পর নেপালকে পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলোর এগিয়ে আসা জরুরি। তাঁর ভাষায়, জলবায়ু পরিবর্তনে নেপালের অবদান খুবই সামান্য, অথচ এর ভয়াবহ পরিণতি তাদেরই বেশি ভোগ করতে হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, জলবায়ু সংকট এবারের বন্যায় ভূমিকা রেখেছে। আগস্টের শেষ দিকে চীনের নিয়ন্ত্রিত তিব্বত ও নেপালের মধ্য দিয়ে একটি হিমবাহ গলে আংশিক ধসে পড়ে। এরপর ভয়াবহ ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে।
নেপাল বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে ০.১ শতাংশেরও কম অবদান রাখে। বিপরীতে প্রতিবেশী ভারত ও চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় নিঃসরণকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। ভারত, চীন, নেপাল ও ভুটানের ওপর বিস্তৃত হিমালয় পর্বতমালা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। জাতিসংঘের হিসাবে, ২০২৩ সাল পর্যন্ত মাত্র ৩০ বছরের কিছু বেশি সময়ে নেপালের পাহাড়গুলো প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে। খানাল বলেন, এবারের বিপর্যয় বর্ষাকালের নিয়মিত বন্যার তুলনায় অনেক বেশি ভয়াবহ। ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের সঙ্গে তুলনীয়। তিনি পরিস্থিতিকে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, 'মনে হচ্ছিল হিমালয় থেকে সুনামি ধেয়ে আসছে।' কোথাও ৬০ থেকে ৭০ ফুট উঁচু ঢেউয়ের সঙ্গে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ ঘণ্টায় প্রায় ১৮০ কিলোমিটার গতিতে ছুটে এসেছে। মুছে গেছে শহর, গ্রাম ও মহাসড়ক; এখনো কিছু কিছু এলাকা বিচ্ছিন্ন।
নেপালের অর্থ ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে জাতিসংঘের ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিলে ২ কোটি ডলার চেয়ে চিঠি দিয়েছে। ২০২২ সালে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির আওতায় তহবিলটি গঠিত হয়। তবে খানাল স্বীকার করেছেন, এই অর্থ ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় ‘স্পষ্টতই যথেষ্ট নয়’। বন্যায় মোট ক্ষয়ক্ষতি ৫০০ কোটি ডলারের বেশি হতে পারে। পুনর্নির্মাণ করতে হতে পারে ২০ হাজারের বেশি বাড়ি ও প্রধান মহাসড়ক। নদীর ঝুঁকিপূর্ণ তীরের কিছু গ্রাম পুরোপুরি ভেসে গেছে; সেগুলো নিরাপদ উঁচু এলাকায় সরিয়ে নিতে হতে পারে। খানাল প্রথমে ভারত ও চীনের দিকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে পরে তিনি বলেন, 'এটা কোনো একটি দেশকে দায়ী করার বিষয় নয়; আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।'
জাতিসংঘের তহবিলটিও বড় অর্থসংকটে রয়েছে। প্রায় ১১৯টি দেশ মোট ২৮০ কোটি ডলারের আবেদন করলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন পর্যন্ত দিয়েছে মাত্র প্রায় ৪০ কোটি ডলার। যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে ১ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
জলবায়ু পরিবর্তন অস্বীকারকারীদের প্রসঙ্গে খানালের মন্তব্যও বেশ কড়া, 'পৃথিবী গোল—এটাও যারা অস্বীকার করেন, এমন মানুষও আছেন।' তিনি বলেন, নেপালের এই দাবি শুধু ক্ষতিপূরণের জন্য নয়; বিশ্বের ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পাশে দাঁড়াতে আরও শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য এটি একটি ‘জেগে ওঠার ডাক’।



