ভূ-রাজনীতির দাবার চালে এবার এক নতুন সমীকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত বন্দর গোয়াদরকে ঘিরে ইরান ও ওমানের সাথে একটি শক্তিশালী বাণিজ্য ব্লক গঠনের কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে পাকিস্তান সরকার। মূলত গোয়াদর বন্দরকে কেন্দ্র করে একটি রি-এক্সপোর্ট হাব বা পুনঃরফতানি কেন্দ্র গড়ে তোলাই এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।
পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন জানিয়েছে, সরকারি মহলে এই নিয়ে জোর আলোচনা চলছে এবং ভবিষ্যতের ভূ-রাজনীতিতে পাকিস্তান, ইরান ও ওমান- এই তিনটি দেশই এই অঞ্চলের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বিশেষ করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ঘটলে এ ব্লকটি পূর্ণতা পাবে।
পাকিস্তান আশা করছে, মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি ফিরলে ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে, যা এই ত্রিপক্ষীয় বাণিজ্যিক জোটকে বাস্তবে রূপ দেয়ার পথ সহজ করবে।
এই পরিকল্পনার নেপথ্যে পাকিস্তানের একটি কৌশলগত সাফল্য কাজ করছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সাম্প্রতিক উত্তেজনার সময় পাকিস্তান কোনো পক্ষ না নিয়ে নিজেকে একটি শান্তিকামী রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণ করতে পেরেছে। এর ফলে ইরান খুশি হয়ে প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের জন্য তাদের সব বাণিজ্যিক রুট খুলে দিয়েছে। এমনকি পাকিস্তান-ইরান ট্রানজিট করিডোরও সচল হয়েছে, যাকে ইসলামাবাদের জন্য একটি বড় বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আগে পাকিস্তান মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যের জন্য আফগানিস্তানের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু আফগানিস্তানের সাবেক সরকারগুলো ভারতের প্রভাবে থাকায় বারবার পাকিস্তানের পথ আটকে দেয়ার হুমকি দিত। বর্তমানে তালেবান শাসনামলেও তেহরিক-ই-তালেবান বা টিটিপি ইস্যুতে উত্তেজনার কারণে তারা পাকিস্তানের জন্য বাণিজ্যের পথ বন্ধ করে রেখেছে।
এমন পরিস্থিতিতে ইরানের মধ্য দিয়ে বিকল্প পথ খুঁজে পাওয়া পাকিস্তানের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা গোয়াদর বন্দরকে পুরোপুরি সচল করতে বড় ভূমিকা রাখবে। এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যে একটি টেকসই যুদ্ধবিরতির জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা তুঙ্গে। এরই অংশ হিসেবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি পাকিস্তান সফর করছেন এবং এরপর তার ওমান ও রাশিয়া যাওয়ার কথা রয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ওমান বরাবরই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে এবং তাদের নিরপেক্ষ অবস্থান এই নতুন ব্লক গঠনে বিশেষ সহায়ক হবে। অন্যদিকে রাশিয়ার সাথে ইরানের ইউরেনিয়াম ইস্যু এবং যুদ্ধবিরতির গ্যারান্টার হওয়ার বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।
মজার ব্যাপার হলো, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে আরব আমিরাতের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কের কিছুটা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। দেশটি আগে পাকিস্তানের কাছ থেকে পাওনা ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ ফেরত চেয়েছিল, যা পাকিস্তান এরই মধ্যে পরিশোধ করে দিয়েছে। এখন পাকিস্তান চাইছে দুবাই পোর্টের আদলে গোয়াদরকে এমন এক কেন্দ্রে পরিণত করতে, যেখানে পণ্য এনে আবার অন্য দেশে রফতানি করা হবে।
পাকিস্তানের কর্মকর্তারা মনে করছেন, গোয়াদর বন্দরের প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রফতানির সম্ভাবনা রয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে ইরান দুবাইকে তাদের বাণিজ্যের অপ্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে, যার পরিমাণ বছরে প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার। যদি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো শান্তি চুক্তির মাধ্যমে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়, তবে এই বিশাল বাণিজ্যের বড় একটা অংশ গোয়াদরে চলে আসতে পারে। শুধু তাই নয়, গোয়াদর বন্দর পুরোপুরি সচল হলে সৌদি আরবও তাদের ঝুলে থাকা বিনিয়োগ পরিকল্পনাগুলো পুনরায় শুরু করতে পারে।
এর আগে, পিটিআই সরকারের সময় সৌদি আরব ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিলেও তা নানা কারণে বাস্তবায়ন হয়নি। এখন চীনের কাছে তেল পাঠানোর বিকল্প রুট হিসেবে গোয়াদর ব্যবহার করা গেলে সৌদি আরব ও ইরান- উভয় দেশই লাভবান হবে। সব মিলিয়ে এই নতুন বাণিজ্যিক ব্লক শুধু পাকিস্তানের অর্থনীতি নয়, বরং পুরো অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে এক বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে।
সূত্র: দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন



