মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের উপর প্রথম ২৫ শতাংশ শুল্কারোপ করেছিলেন। এরপর রাশিয়া থেকে তেল আমদানির দায়ে আরো ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি করেন। এতে ভারত সর্বোচ্চ শুল্কের সম্মুখীন দেশগুলোর তালিকায় স্থান পেয়েছে।
ট্রাম্পের এই একতরফা শুল্কারোপ যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের কৌশলগত সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছে। ট্রাম্প ভারতকে অন্যায্য বাণিজ্যের জন্য অভিযুক্ত করেন। একইসাথে নয়াদিল্লিকে তাদের কৃষি ও দুগ্ধজাত বাজার খোলার জন্য আহ্বান জানান। কিন্তু ভারত ট্রাম্পের এই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে। এভাবে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক দ্বন্দ্বের সূচনা ঘটে।
ট্রাম্প প্রশাসন নতুন বাণিজ্য চুক্তির জন্য মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বী উভয়ের উপরই চাপ সৃষ্টি করে। পরে বিষয়টির নিষ্পত্তির জন্য ভারত শুরুর দিকেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা করে। কিন্তু ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ প্রচারণার কারণে ভারতকে ছাড় দিতে রাজি হয়নি ট্রাম্প। ফলে বিষয়টি অনিষ্পন্নই রয়ে যায়।
ইনস্টিটিউট ফর চায়না-আমেরিকা স্টাডিজের বিশেষজ্ঞ সৌরভ গুপ্ত বলেন, ট্রাম্পের মূল অগ্রাধিকার হলো বাণিজ্য; বিশেষ করে বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস ও শিল্প ফেরানো। তার মতে, বৃহত্তর কৌশলগত সম্পর্কের চেয়ে ট্রাম্পের মনোযোগ বেশি বাণিজ্যিক ইস্যুতে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১৯০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ালেও সেখানে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন পদক্ষেপ যেমন ভারতীয় আমদানির উপর শুল্ক, রাশিয়া থেকে তেল ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার জন্য জরিমানা এবং ইউক্রেন যুদ্ধের পরোক্ষ অর্থায়নের অভিযোগ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
নয়াদিল্লি পাল্টা যুক্তি দিয়ে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ওয়াশিংটন পূর্বে রাশিয়ান তেল আমদানিতে উৎসাহ দিয়েছিল। এর পেছনে রয়েছে ভারতের রাশিয়া ও ইরানের সাথে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক, যা কয়েক দশক ধরে গড়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক প্রবীণ দোন্থি বলেন, ট্রাম্প ভারত-রাশিয়া সম্পর্ককে একটি কৌশলগত টুল হিসেবে ব্যবহার করছেন, যা শুল্ক চাপের মাধ্যমে নয়াদিল্লিকে চুক্তিতে আনতে সাহায্য করতে পারে।
ব্রিকসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ভারতকে ‘আমেরিকা-বিরোধী ব্লকের অংশ’ বলেও সমালোচনা করেন ট্রাম্প। অপরদিকে, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতিতে ট্রাম্পের মধ্যস্থতার দাবি সম্পর্কেও নয়াদিল্লি প্রকাশ্যে দ্বিমত পোষণ করে।
এই উত্তেজনার মধ্যেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মার্কিন-ভারত কৌশলগত সম্পর্কের মূল কাঠামো স্থিতিশীল রয়েছে। সৌরভ গুপ্ত বলেন, এই অস্থিরতা নেতাদের স্তরে ঘটলেও উচ্চপদস্থ আমলাতান্ত্রিক স্তরে সম্পর্ক মজবুত। কিংস কলেজের অধ্যাপক হর্ষ পান্ত বলেন যে ইরান, রাশিয়া, বাণিজ্য এবং পাকিস্তানের ইস্যু একত্র করে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে। যেন চুক্তির পথে এগোনো যায়।
তবে পান্ত মনে করেন, স্বল্পমেয়াদি অস্থিরতা থাকলেও ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চলের কৌশলগত বাস্তবতা ভারত-মার্কিন সম্পর্ককে প্রভাবিত করবে না। একাধিক সফর ও কূটনৈতিক বৈঠক এ সম্পর্কের টেকসই অংশীদারিত্বকেই নির্দেশ করে।
তবে ট্রাম্পের কৌশলগত অবস্থান চীনের সাথে ভারতের সম্পর্ক উষ্ণ করতে অনিচ্ছাকৃতভাবে সহায়ক হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের উপদেষ্টা আলি ওয়াইন বলেন, ট্রাম্প বরং চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক পুনঃস্থাপনেই বেশি মনোযোগী, যা ভারতের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গিকে দুর্বল করে দেয়।
প্রবীণ দোন্থি বলেন, ট্রাম্পের কৌশল শত্রু-মিত্রের সীমারেখা ঝাপসা করে দেয়। তবে তা সম্পর্কের দীর্ঘস্থায়ীতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। গত দুই দশকের জোটপ্রবণতা উভয় পক্ষকে সম্পর্ক জোরদারে প্রণোদিত করেছে।
গুপ্তের মতে, ভারত রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক পুরোপুরি ছাড়বে না। তবে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে সম্পর্কের কিছু অংশে সংযম দেখাতে পারে।
সূত্র : আনাদোলু এজেন্সি



