ভারতে ডায়াবেটিস আক্রান্ত ১০ জনের চারজনই রোগ সম্পর্কে অবহিত নন

গবেষণায় জানা গেছে, গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে ডায়াবেটিসের প্রাদুর্ভাব বেশি। এর জন্য সম্ভাব্য কারণ হিসেবে জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাসের মতো বিষয় দায়ী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ভারতীয়দের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা
ভারতীয়দের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা |সংগৃহীত

গলব্লাডারে পাথর ধরা পড়েছিল কলকাতার বাসিন্দা তমাল বসুর। সার্জারির আগে, চিকিৎসক তাকে বেশ কয়েকটা পরীক্ষা করাতে বলেছিলেন। সেই সময় ধরা পড়ে তার রক্তে শর্করার মাত্রা অনেকটাই বেশি।

৪২ বছর বয়সী তমাল বসু বলছিলেন ‘গলব্লাডারে অপারেশন করার আগে রক্ত পরীক্ষার রিপোর্টে দেখা যায়, আমার রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনক মাত্রায় বেশি। আমি একটুও বুঝতে পারিনি। অনেক কিছু খেয়েছি যা একেবারে উচিত ছিল না। হয়ত আগে জানলে সচেতন হতাম। সুগার লেভেলটা এতটা বাড়ত না।’

একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন দিল্লির গীতাঞ্জলি সিংহ। ৪০ ছুঁইছুঁই এই শিক্ষিকার কথায়, ‘কয়েক মাস ধরেই সারাদিন ক্লান্ত বোধ করতাম, একটুতেই হাঁপিয়ে উঠছিলাম। ওজনও বাড়তে শুরু করেছিল। আমি ভেবেছিলাম পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোমের কারণে এমনটা হচ্ছে। কিন্তু ডাক্তারের কাছে গিয়ে জানতে পারি আমি ডায়াবেটিক।’

এই ঘটনা নতুন নয়। এমন অনেক ভারতীয়ই রয়েছেন যাদের ডায়াবেটিস থাকা সত্ত্বেও তারা সে সম্পর্কে অবগত নন। ল্যান্সেট গ্লোবাল হেলথ-এ সম্প্রতি প্রকাশিত এক নতুন গবেষণা অনুযায়ী, ভারতে প্রতি ১০ জন ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের মধ্যে চারজনই জানেন না তাদের এই রোগ রয়েছে।

‘প্রিভ্যালেন্স, অ্যাওয়ারনেস, ট্রিটমেন্ট অ্যান্ড কন্ট্রোল অফ ডায়াবেটিস ইন ইন্ডিয়া: এ ন্যাশনালি রিপ্রেজেন্টেটিভ সার্ভে অফ অ্যাডাল্টস এইজড ৪৫ ইয়ার্স অ্যান্ড ওল্ডার’ শীর্ষক ওই গবেষণামূলক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বয়সের (৪৫ বছর বা তার বেশি) প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনের ডায়াবেটিস বা মধুমেহ রোগ রয়েছে। এদের মধ্যে ৪০ শতাংশ মানুষ জানতেন না তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।

ওই গবেষণায় জানা গেছে, গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে ডায়াবেটিসের প্রাদুর্ভাব বেশি। এর জন্য সম্ভাব্য কারণ হিসেবে জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাসের মতো বিষয় দায়ী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ পপুলেশন সায়েন্সেস, মিশিগান ইউনিভার্সিটি এবং হার্ভার্ড টিএইচ চ্যান স্কুল অফ পাবলিক হেলথ-এর গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় ভারতে মধ্যবয়সী ও বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ এবং নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

কী বলছে ওই গবেষণা

ভারতে বাড়তে থাকা ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ল্যান্সেট গ্লোবাল হেলথ-এ ২০২২ সালে প্রকাশিত গবেষণামূলক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভারতে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ২১ কোটি ২০ লাখ, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। এরপরই ছিল চীন। সে দেশে ১৪ কোটি ৮০ লাখ ডায়াবেটিস রোগী রয়েছে। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চার কোটি ২০ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন।

গত বছর ‘দ্য ল্যানসেট ডায়াবিটিস অ্যান্ড এন্ডোক্রিনোলজি’ জার্নালে প্রকাশিত সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতের মোট জনসংখ্যার ২৩.৭ শতাংশ ডায়াবেটিক।

‘প্রিভ্যালেন্স, অ্যাওয়ারনেস, ট্রিটমেন্ট, অ্যান্ড কন্ট্রোল অফ ডায়াবেটিস ইন ইন্ডিয়া’ শীর্ষক এই গবেষণায় অবশ্য ৪৫ বছর বা তার বেশি বয়সের ব্যক্তির উপর সমীক্ষা চালানো হয়।

২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৩৬টা রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল মিলিয়ে ওই বয়সসীমার ৫৭ হাজার ৮১০ জন পুরুষ ও নারীর ওপর ক্রস-সেকশনাল জরিপ চালানো হয়। ওই সমীক্ষা অনুযায়ী ৪৫ বছর বা তার বেশি বয়সের প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ডায়াবেটিসের প্রাদুর্ভাব ছিল ১৯.৮ শতাংশ। পুরুষদের ক্ষেত্রে ১৯.৬ শতাংশ এবং নারীদের ক্ষেত্রে ২০.১ শতাংশ। শহরাঞ্চলে ডায়াবেটিসের প্রাদুর্ভাব ৩০ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে ১৫ শতাংশ।

সমীক্ষায় জানা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে ৪০ শতাংশ মানুষ জানেনই না তাদের ডায়াবেটিস রয়েছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, বিষয়টা উদ্বেগজনক। মধ্যবয়সী ও বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ, নিয়ন্ত্রণের জন্য নীতিমালা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

কারণ কী?

কলকাতার ডায়াবেটোলজিস্ট ডা. অমিতাভ সুর বলেছেন, ‘দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জেনেটিকালি ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেশি। এছাড়া রয়েছে আমাদের জীবনযাত্রা, স্ট্রেস বেড়ে যাওয়া, কায়িকশ্রমের পরিমাণ কমে যাওয়া ইত্যাদি। এসব মিলিয়ে ভারতীয়দের মধ্যে ডায়াবেটিস হওয়ার প্রবণতা বেশি।’

‘এই ঝুঁকি কতটা বেশি তা জানার জন্য ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ একটা সমীক্ষা করেছিল। সেখানে দেখা গেছে, নয়জনের মধ্যে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ডায়াবেটিস রয়েছে। তবে, প্রি-ডায়াবেটিস রয়েছে এমন ব্যক্তিদের ধরলে এই সংখ্যা আরো বেশি।’

চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতা বলছে, ডায়াবেটিস থাকা সত্ত্বেও সে সম্পর্কে অবগত নন অনেক মানুষই। ইনস্টিটিউট অফ পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিক্যাল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ-এর অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ডা. শুভঙ্কর চৌধুরী বলেছেন, ‘ডায়াবেটিস সম্পর্কে অবগত নন এমন মানুষের সংখ্যা এক সময় প্রায় ৫০ শতাংশ ছিল। এখন সেই সংখ্যাটা কম হলেও সেটা উল্লেখযোগ্য হবে বলেই আমার ধারণা।’

এর পিছনে কারণগুলো ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। তার কথায়, ‘এর কারণ হলো আমাদের মধ্যে সচেতনতার অভাব, চিকিৎসা ব্যবস্থার অপ্রতুলতা, এখানে সেভাবে মানুষ পরীক্ষা নিরীক্ষা কম করান। এছাড়া একটা বড় কারণ হলো অপেক্ষাকৃত প্রাথমিক স্টেজে কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তাই পরীক্ষা করানোর কথা কেউ ভাবেন না।’

‘কারো গ্লুকোজ লেভেল অনেকটা বেশি হওয়া সত্ত্বেও তিনি না-ও বুঝতে পারেন। কারণ এই প্রসেসটা ধীরে ধীরে ডেভেলপ করে এবং আমাদের শরীরের কিছুটা কম্পেন্সেট (পূরণ) করার ক্ষমতা থাকে। তাই কিছু ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসের লক্ষণ প্রকট হয় না। দেখা যায় রোগী অন্য কোনো সমস্যা নিয়ে এসেছেন, তখন পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখা গেছে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অনেকটা বেশি।’

ডা. সুরও একই মত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, "মেডিক্যাল ক্যাম্পে স্ক্রিনিংয়ের সময় দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রেই রোগী জানেন না তার ডায়াবেটিক। একেবারে নির্দিষ্টভাবে সংখ্যা বলা না গেলেও প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার কথা ধরলে ক্যাম্পে স্ক্রিনিংয়ের সময় আমরা দেখেছি আনুমানিক দশজনের মধ্যে একজন ডায়াবেটিস রয়েছে, কিছু না হলে বর্ডারলাইন ডায়াবেটিস দেখাই যায়। কমপক্ষে দু'জন প্রি-ডায়াবেটিক রোগীও দেখা যায়।"

গ্রাম বনাম শহর

'প্রিভ্যালেন্স, অ্যাওয়ারনেস, ট্রিটমেন্ট, অ্যান্ড কন্ট্রোল অফ ডায়াবেটিস ইন ইন্ডিয়া' শীর্ষক সমীক্ষায় গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরে ডায়াবেটিসের প্রাদুর্ভাবের সংখ্যা দ্বিগুণ দেখা গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে এই পার্থক্য কমেছে বলেই জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

ডা. অমিতাভ সুর বলেছেন, ‘গ্রামাঞ্চলের মানুষের সাথে শহরাঞ্চলের মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারণের পার্থক্য রয়েছে। সেই কারণে সেখানে কিছুটা কম হলেও ডায়াবেটিসের সমস্যা প্রকট। সাম্প্রতিক একাধিক সমীক্ষায় দেখা গেছে শহর ও গ্রামের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের সংখ্যার পার্থক্য কমছে।’

একই মত প্রকাশ করেছেন ডা. শুভঙ্কর চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ‘গ্রামাঞ্চল কমছে, শহর ও গ্রামে জীবনধারণগত যে ফারাক ছিল তা-ও ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। তাই গ্রামের তুলনায় শহরে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা অনেকটা বেশি সেটা আর বলা যায় না।’

মোকাবেলার উপায়

যেহেতু ভারতীয়দের মধ্যে ডায়াবেটিসের প্রবণতা বেশি, তাই একটা বয়সের পর পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। ডা. শুভঙ্কর চৌধুরীর কথায়, ‘একটা বয়সের পর আমরা পরীক্ষা করার পরামর্শ দিই। এই বয়সটা পাশ্চাত্য দেশে ৪০-এর পর হলেও আমাদের দেশে যেহেতু তার আগেই এই রোগ দেখা দেয়, তাই ৩০ বছরের পর পরীক্ষা করানোর কথা বলি।’

এই পার্থক্যের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘দেখা যাবে পাশ্চাত্য দেশের মানুষ ও ভারতীয়দের মধ্যে ফ্যাট পারসেন্টেজ বেশি। আসলে ভারতীয়দের মধ্যে মাসল মাস কম। মাসল মাস কম হওয়ার কারণ, আমরা শারীরিক কসরত কম করি এবং আমাদের খাদ্যাভ্যাস কার্বোহাইড্রেট ভিত্তিক।’

ডায়াবেটিসের সমস্যার সাথে মোকাবেলার জন্য শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধের উপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ডায়াবেটিস রয়েছে কি-না, নিশ্চিত হতে ৩০-এর পর থেকেই পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিচ্ছেন।

ডা. শুভঙ্কর চৌধুরীর কথায়, ‘৩০-এর নিচেও ডায়াবেটিস দেখা যায়। তবে ওই বয়সের উপরে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বেশি। তাই স্ক্রিনিং-এর জন্য এই বয়সসীমার কথা বলা হচ্ছে। এর কারণ কিছুটা বংশগত, কিছুটা এনভায়রনমেন্টাল (পরিবেশগত) তাছাড়া জীবনযাত্রা তো রয়েছেই।’

‘ওবেসিটি, হাই প্রেশার, হাই কোলেস্টেরল বা ফ্যামিলি হিস্ট্রি রয়েছে তাদের আমরা পরীক্ষা করতে বলি। নারীদের ক্ষেত্রে যাদের প্রেগনেন্সিতে সমস্যা ছিল, তাদের কোনো লক্ষণ না দেখা দিলেও পরীক্ষা করার কথা বলি।’

এক্ষেত্রে বয়স একটা ফ্যাক্টর। চিকিৎসক শুভঙ্কর চৌধুরী বলেছেন, ‘বয়সের সাথে সাথে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে। আমাদের দেশে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেশি। তাই অন্তত তিন বছরে একবার পরীক্ষা করানো উচিত এবং প্রি-ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে ছয়মাস থেকে এক বছরে পরীক্ষা করা দরকার।’

খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের ওপরেও জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। ডা. অমিতাভ সুর বলেন, ‘মিষ্টি পানীয়, ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত খাবার (যেমন ভাজাভুজি, ফ্রোজেন পিৎজা ইত্যাদি) এবং হাই গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত খাবার (হোয়াইট ব্রেড, আলু ইত্যাদি) কম খেতে হবে। সবারই এই বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত। তবে যাদের ফ্যামিলি হিস্ট্রি রয়েছে, ওবেসিটি রয়েছে তাদের এড়িয়ে চলা দরকার। আর খেলেও তার পরিমাণ খুব কম করতে হবে।’

এই প্রসঙ্গে একটা উল্লেখযোগ্য তথ্য তুলে ধরেছেন ডা. শুভঙ্কর চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আইসিএমআর-এর গবেষণায় একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় উঠে এসেছিল। সেটা হলো আমাদের খাবারে যদি কার্বোহাইড্রেটের মাত্রা কমিয়ে প্রোটিনের মাত্রা বাড়ানো যায়, তাহলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমতে পারে।’

সূত্র : বিবিসি