ভারতে ধীরে ধীরে ‘গার্বেজ ক্যাফে’-র চল দেখা যাচ্ছে। প্লাস্টিক বর্জ্য আর মানুষের ওপর গার্বেজ ক্যাফের প্রভাব আসলে কতটা তা দেখতেই ছত্তিশগড়ের অম্বিকাপুর শহরে হাজির হয়েছিল বিবিসি।
চলতি বছরের শুরুর দিকে একটা মেঘলা, কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকালে বিবিসির প্রতিনিধি উপস্থিত হয়েছিলেন অম্বিকাপুরের গার্বেজ ক্যাফেতে। ভারতে এটাই প্রথম গার্বেজ ক্যাফে। চারদিক গরম সিঙ্গারার গন্ধে ম ম করছিল। ক্যাফের ভেতরে কাঠের বেঞ্চে বসেছিলেন বেশ কয়েকজন মানুষ। তাদের হাতে স্টিলের প্লেট ভর্তি গরম খাবার। কেউ গল্প করছেন, কেউ আবার চুপচাপ খাচ্ছেন।
ছত্তিশগড়ের অম্বিকাপুর শহরের এই ক্যাফেতে প্রতিদিন ক্ষুধার্ত মানুষ এসে হাজির হন গরম খাবারের আশায়। কিন্তু খাবারের খরচের জন্য তারা টাকা দেন না। পরিবর্তে দেন পুরোনো প্লাস্টিকের ব্যাগ, খাবারের মোড়ক, প্লাস্টিকের পানির বোতল ইত্যাদি। অম্বিকাপুর মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের (এএমসি) পক্ষ থেকে এই ক্যাফে পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন বিনোদ কুমার প্যাটেল।
তিনি জানিয়েছেন, এক কেজি প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিবর্তে একজন ভরপেট খাবার পেতে পারেন। সেখানে থাকে দুই রকমের তরকারি, ডাল, রুটি, সালাদ ও আচার। আর আধা কেজি প্লাস্টিক বর্জ্যের বিনিময়ে পাওয়া যায় নাশতা, যেমন- সমুচা বা বড়া পাও।
ছত্তিশগড়ের এই শহর এক অভিনব উপায় বের করেছে যাতে ক্ষুধার নিবারণও হয়, আবার বর্জ্য প্লাস্টিকের কারণে হওয়া দূষণের মোকাবেলাও করা যায়। এখানে ২০১৯ সালে গার্বেজ ক্যাফে চালু করা হয়। যার স্লোগান ছিল, ‘মোর দ্য ওয়েস্ট বেটার দ্য টেস্ট।’ এই উদ্যোগের জন্য অর্থ এসেছিল এএমসি-র স্যানিটেশন বাজেট থেকে। শহরের প্রধান বাস স্ট্যান্ডের কাছেই চালু করা হয় এই ক্যাফে।
বিনোদ প্যাটেল বলেছেন, ‘এর উদ্দেশ্য ছিল অম্বিকাপুরে দু’টি বিদ্যমান সমস্যার মোকাবেলা করা- প্লাস্টিক বর্জ্য এবং ক্ষুধা।’
গার্বেজ ক্যাফের নেপথ্যে চিন্তাটা খুব সহজ। নিম্ন আয়ের মানুষ, বিশেষত ঘরহীন মানুষ এবং যারা আবর্জনা সংগ্রহ করে জীবিকা চালান তাদের রাস্তা বা আস্তাকুঁড়ে থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করতে উৎসাহ দেয়া। ওই বর্জ্যের বিনিময়ে তাদের গরম খাবারের ব্যবস্থা করা।
এই ক্যাফেতে নিয়মিত আসেন স্থানীয় বাসিন্দা রশ্মি মণ্ডল। তিনি প্রতিদিন সকালবেলা রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন ফেলে দেয়া প্লাস্টিকের খোঁজে। পুরনো খাবারের মোড়ক থেকে শুরু করে ফেলে দেয়া প্লাস্টিকের বোতল- কিছুই বাদ যায় না তার সংগ্রহের তালিকা থেকে। এটাই তার কাছে বেঁচে থাকার একটা মাধ্যম। ‘আমি বহু বছর ধরে এই কাজ করছি,’ তার সংগ্রহ করা ছোট্ট প্লাস্টিকের স্তূপের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলছিলেন রশ্মি মণ্ডল।
এর আগে, তার সংগ্রহ করা প্লাস্টিক বর্জ্য স্থানীয় স্ক্র্যাপ ডিলারদের কাছে কিলোগ্রাম প্রতি মাত্র ১০ টাকায় বিক্রি করতেন- যা জীবনধারণের পক্ষে যথেষ্ট ছিল না। তিনি বলেছেন, ‘কিন্তু এখন যে প্লাস্টিক সংগ্রহ করছি তার বদলে বাড়ির লোকের জন্য খাবার কিনতে পারছি। এটা আমাদের জীবনে একটা বড় বদল এনেছে।’
বিনোদ প্যাটেল জানিয়েছেন, এই ক্যাফেতে প্রতিদিন গড়ে ২০ জনেরও বেশি মানুষকে খাওয়ানো হয়।
ক্যাফে চালু হওয়ার পর থেকেই এখানে কাজ করছেন সারদা সিং প্যাটেল। তিনি জানিয়েছেন, ক্যাফেতে আসা ব্যক্তিদের বেশিভাগই অত্যন্ত দরিদ্র। তার কথায়, ‘ক্যাফেতে প্লাস্টিকের পরিবর্তে খাবার পাওয়া যায়। তবে আমরা শুধু মানুষের পেট ভরাতে সাহায্য করছি না, পরিবেশকে স্বচ্ছ রাখার ক্ষেত্রেও এর অবদান রয়েছে।’
ভারত সরকারের ‘স্বচ্ছ ভারত মিশন আরবান’-এর আওতায় অম্বিকাপুরের স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমন্বয়কারীর দায়িত্বে থাকা রীতেশ সাইনি জানিয়েছেন, এই ক্যাফে শহরের প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণের ওপরও প্রভাব ফেলেছে। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, এই ক্যাফে ২০১৯ সাল থেকে প্রায় ২৩ টন প্লাস্টিক সংগ্রহ করেছে। তা না হলে এই আবর্জনা মাটিতে গিয়ে স্তূপ হতে থাকত।
২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, বছরে ওই শহরে ল্যান্ডফিলের পরিমাণ ছিল ৫.৪ টন। যা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে দুই টনে। ক্যাফেতে একত্রিত হওয়া আবর্জনা অম্বিকাপুরের সামগ্রিক প্লাস্টিক বর্জ্যের একটা ছোট্ট অংশ মাত্র। ২০২৪ সালে ওই শহরের সামগ্রিক প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ ছিল ২২৬ টন। ক্যাফেতে আসা প্লাস্টিক বর্জ্যের প্রায় পুরোটাই ইতোমধ্যে রিসাইকেল করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রীতেশ সাইনি।
প্লাস্টিক বর্জ্যের যে অংশটা কোনোক্রমে মূল সংগ্রহের নেটওয়ার্কের থেকে বাদ চলে যায়, তাকে একত্রিত করাই এই ক্যাফের মূল লক্ষ্য। তিনি জানিয়েছেন, এর পাশাপাশি জনসাধারণকে এই অভিযানে অংশগ্রহণ করার জন্য উৎসাহ দেয়াও তাদের উদ্দেশ্য।
অম্বিকাপুরে প্লাস্টিক বর্জ্য হ্রাস ও রিসাইক্লিংইয়ের ওপরেও জোর দেয়া হয়। শহরে প্লাস্টিকের ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম রয়েছে এবং বর্জ্য বাছাই ও তা ম্যানেজ করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। এই পদক্ষেপই অম্বিকাপুরকে ভারতের অন্যতম পরিচ্ছন্ন শহরের শিরোপা পেতে সাহায্য করেছে।
তবে ২০১৬ সালে এএমসি ওই ডাম্পিং গ্রাউন্ডকে পার্কে রূপান্তরিত করে। ‘জিরো-ওয়েস্ট ডিসেন্ট্রালাইজড সিস্টেম’ বা শূন্য-বর্জ্য বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা চালু করা হয় যাতে এই জাতীয় ডাম্পিং গ্রাউন্ডের দরকারই না পড়ে। সংগৃহীত প্লাস্টিক রিসাইকেল করে ছোট ছোট গ্র্যানিউল বা দানা তৈরি করা হয় যা রাস্তা নির্মাণের জন্য ব্যবহার করা হয়। অথবা সেগুলো রিসাইক্লারদের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়, যেখান থেকে স্থানীয় সরকারি খাতায় অর্থ আসে।
২০২০ সালের সরকারি প্রতিবেদন অনুসারে, ‘ওয়েট ওয়েস্ট’ বা ভেজা বর্জ্যকে কম্পোস্ট করা হয় এবং যে অল্প পরিমাণ বর্জ্যকে রিসাইকেল করা যায় না সেগুলোকে জ্বালানির জন্য সিমেন্ট কারখানায় পাঠানো হয়। এই প্রচেষ্টার হাত ধরেই অম্বিকাপুর এখন ‘জিরো ল্যান্ডফিল সিটি’ (যে শহরে বর্জ্য মাটিতে গিয়ে স্তূপ হয় না) হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। গার্বেজ ক্যাফেতে আসা প্লাস্টিক এএমসি পরিচালিত স্থানীয় বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্রে পাঠানো হয়।
অম্বিকাপুরে এখন ২০টা বিকেন্দ্রীভূত কেন্দ্র রয়েছে যেখানে সংগ্রহ করার পর বর্জ্যকে বাছাই করার সময় ৬০টিরও বেশি ভাগে ভাগ করা হয় যাতে সর্বাধিক পরিমাণে রিসাইক্লিং সম্ভব হয়। এই কেন্দ্রগুলোতে ৪৮০ জন নারী নিয়োগ করা হয়েছে, যাদের ‘স্বচ্ছতা দিদি’ বলে সম্বোধন করা হয়। তারা এই সেন্টারগুলোতে বর্জ্য পৃথকীকরণের পাশাপাশি প্রতিদিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে গৃহস্থালির আবর্জনাও সংগ্রহ করেন। এই কাজ করে মাসে আট থেকে দশ হাজার টাকা আয় করেন তারা।
বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্রের কর্মীদের স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে গ্লাভস, মাস্ক এবং অন্যান্য ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রীতেশ সাইনি। যদিও যারা বর্জ্য সংগ্রহ করে আনেন তাদের জন্য এই সুযোগ-সুবিধা নেই।
পশ্চিম ভারতের গুজরাতের আহমেদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মিনাল পাঠক শহুরে পরিবেশে জলবায়ু প্রশমন নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি জানিয়েছেন, মৌলিক সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই আবর্জনা সংগ্রহ করলে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া, ধারালো বস্তু এবং বিষাক্ত বর্জ্যের সংস্পর্শে আসার আশঙ্কা থেকে যায়। আবর্জনা সংগ্রহকারী ব্যক্তির অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
স্বচ্ছ অম্বিকাপুর মিশন সিটি লেভেল ফেডারেশন-এর সভাপতি শশীকলা সিনহা জানিয়েছেন, ২০১৬ সাল থেকে কাজ শুরু করার পর থেকে এই কেন্দ্রগুলো প্লাস্টিক, কাগজ, পিচবোর্ড, ধাতু এবং ই-ওয়েস্ট ইত্যাদি মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার টন শুষ্ক বর্জ্য সংগ্রহ করে তা রিসাইক্লিং করেছে।
বাড়ি বাড়ি গিয়ে বর্জ্য সংগ্রহের এই ধারণা এত ভালো কাজ করেছে যে সেটা অম্বিকাপুর মডেল হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এবং এখন ছত্তিশগড়ের ৪৮টি ওয়ার্ডে এই মডেল ব্যবহার করা হয়। অম্বিকাপুরে জিরো-ওয়েস্ট মডেলের নেতৃত্ব দেয়া ঋতু সাঁই জানিয়েছেন, শুধু ওই শহরই নয়, অন্যান্য মাঝারি আকারের শহরগুলতেও এই একই সমস্যার সমাধান করা তাদের লক্ষ্য।
ভারতের অন্যান্য প্রান্তেও গার্বেজ ক্যাফে গড়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে প্লাস্টিক বর্জ্যের বিনিময়ে বিনামূল্যে খাবার দেয়ার জন্য ২০১৯ সালে একটা প্রকল্প চালু করা হয়েছিল। সেই বছরই তেলেঙ্গানার মুলুগু শহরে একটা নতুন প্রকল্পের আওতায় এক কেজি প্লাস্টিকের বদলে সেই ওজনের চাল দেয়া শুরু করেছিল।
স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্ণাটকের মাইসুরুতে ২০২৪ সালে একটা প্রকল্প চালু করা হয় যার আওতায় স্থানীয়রা যেকোনো রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত ইন্দিরা ক্যান্টিনে ৫০০ গ্রাম প্লাস্টিকের বদলে নাশতা খেতে পারেন। এক কেজি প্লাস্টিকের বদলে পেতে পারেন পেট ভরা খাবার।
উত্তরপ্রদেশে এমনই এক উদ্যোগের আওতায় প্লাস্টিক বর্জ্যের বদলে নারীদের হাতে স্যানিটারি প্যাড তুলে দেয়া হয়েছে। তবে, এই ধরনের প্রকল্পগুলো যে সব সময় সহজেই পরিচালিত হয়, তা নয়।
দিল্লিতে ২০২০ সালে গার্বেজ ক্যাফে চালু করা হয়েছিল প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। এর ২০টারও বেশি আউটলেট ছিল। কিন্তু এই উদ্যোগ তেমন সফলতা পায়নি। এর মধ্যে বেশ কয়েকটা ক্যাফে বিবিসিকে জানিয়েছে, জনসচেতনতার অভাব, রিসাইক্লিংয়ের অবকাঠামোর জন্য পর্যাপ্ত সাহায্য না পাওয়ার মতো একাধিক কারণে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।
রীতেশ সাইনির মতে, দিল্লিতে গার্বেজ ক্যাফের প্রতি কম উৎসাহের একটা কারণ হতে পারে অম্বিকাপুরের তুলনায় সেখানে (দিল্লিতে) নিম্ন আয়ের মানুষের সংখ্যা কম।
ভারতের বাইরে, কম্বোডিয়াতেও ক্ষুধা নিবারণ এবং বর্জ্য মোকাবেলা করার জন্য এমন উদ্যোগ নিতে দেখা গিয়েছে। ‘টনলে স্যাপ’ হ্রদের ভাসমান কমিউনিটির মানুষেরা সংগৃহীত প্লাস্টিকের বিনিময়ে চাল পাচ্ছেন।
মিনাল পাঠক জানিয়েছেন, অম্বিকাপুরের মতো অন্যান্য শহরও প্লাস্টিক বর্জ্যের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে এমন উদ্যোগ নিতে পারে। তবে গার্বেজ ক্যাফের কনসেপ্ট তাদের পক্ষে কতটা কার্যকর হবে সেটা মূল্যায়ন করা দরকার। তার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট তথ্য সরবরাহ করা উচিত।
সূত্র : বিবিসি



