ভারতের দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক ভয়াবহ বিপদের মুখ থেকে ফিরে এলেন সুইজারল্যান্ডগামী ২৩২ যাত্রী। যান্ত্রিক ত্রুটি ও আগুনের সঙ্কেত পেয়ে মাঝপথে উড্ডয়ন বাতিল করে যাত্রীদের নামানো হয়েছে।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) গভীর রাতে এ ঘটনা ঘটে।
দিল্লি থেকে জুরিখের উদ্দেশে রওনা হওয়া সুইস এয়ারলাইন্সের এলএক্স ১৪৭ ফ্লাইটটি যখন রানওয়ে ধরে উড্ডয়নের ঠিক আগের মুহূর্তে গতি বাড়াচ্ছিল, তখনই এর এক নম্বর ইঞ্জিনে আগুন লেগে যায়। এতে শনিবার দিবাগত রাত ১টা ৮ মিনিটের দিকে বিমানের ভেতরে থাকা চার শিশুসহ ২২৮ যাত্রী ও ক্রু সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এয়ারবাস এ৩৩০ মডেলের এ বিমানটি তখন প্রায় ১০৪ নট বা ১৯২ কিলোমিটার বেগে ছুটছিল। ঠিক সেই সময় ইঞ্জিনের যান্ত্রিক ত্রুটি ও আগুনের সঙ্কেত পেয়ে পাইলট উড্ডয়ন বাতিল করার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন এবং রানওয়ের মাঝখানেই জরুরি স্লাইড ব্যবহার করে সবাইকে দ্রুত নামিয়ে আনা হয়। এই হুড়োহুড়িতে ছয় যাত্রী আহত হয়েছেন। তাদের মেদান্তা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবর অনুযায়ী, দুর্ঘটনাকবলিত বিমানটিকে না সরানো পর্যন্ত বর্তমানে রানওয়ে ২৮ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
এ ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে একটি যান্ত্রিক বিপর্যয় মনে হলেও এর পেছনে বিমান চালনা ও নিরাপত্তার এক গভীর সমীকরণ লুকিয়ে আছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভি১ স্পিড বা টেক-অফ ডিসিশন স্পিডে পৌঁছানোর আগেই ইঞ্জিন বিকল হওয়া এবং সেখানে আগুনের ফুলকি দেখা দেয়াটা ছিল ভয়াবহ বিপদের লক্ষণ।
ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিমানটি তখন রানওয়েতে পূর্ণ শক্তিতে ছুটছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে যদি পাইলট উড্ডয়ন বাতিল না করতেন, তবে মাঝ আকাশে গিয়ে ইঞ্জিনটি বড় কোনো বিস্ফোরণের মুখোমুখি হতে পারত। তখন রানওয়ের ওপর দাঁড়িয়ে যে জরুরি প্রস্থান সম্ভব হয়েছে, তা হাজার ফুট উঁচুতে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াত।
সুইস এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যেই একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে এবং তাদের কারিগরি দল খুব দ্রুত দিল্লি পৌঁছাবে নিশ্চিত করার জন্য যে, ঠিক কী কারণে একদম শেষ মুহূর্তে ইঞ্জিনে এমন আগুন ধরল।
সাধারণত আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে এই ধরনের বড় এয়ারবাসগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী থাকে। কিন্তু মাঝেমধ্যে মেকানিক্যাল ফেইলিওর বা ইঞ্জিনের ভেতরের কোনো যন্ত্রাংশের ত্রুটির কারণে এমনটা হতে পারে। তবে এই ঘটনায় ক্রু মেম্বারদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। আতঙ্কিত যাত্রীদের যেভাবে স্লাইড ব্যবহার করে নিচে নামানো হয়েছে, তাতে বড় কোনো প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
বিমান সংস্থাটি জানিয়েছে, যাত্রীদের দেখাশোনার জন্য স্থানীয় দলগুলো সাথে কাজ করছে এবং তাদের গন্তব্যে পৌঁছানোর বিকল্প ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
দিল্লি বিমানবন্দরের মতো ব্যস্ততম জায়গায় রানওয়ের ওপর বিমান আটকে থাকা এবং ফ্লাইট বাতিল হওয়াতে বড় ধরনের জট সৃষ্টি হলেও নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয় কর্তৃপক্ষ।
পরিশেষে বলা যায়, আকাশপথে ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, যান্ত্রিক ত্রুটির ঝুঁকিও পাশাপাশি থেকে যাচ্ছে। তবে এবারের ঘটনায় যেটা সবচেয়ে ইতিবাচক দিক, তা হলো মানুষের উপস্থিত বুদ্ধি। পাইলট যদি সেই মুহূর্তে সাহসের সাথে ব্রেক না চেপে উড়াল দিতেন, তবে রোববার সকালের খবরের শিরোনাম হতে পারত আরো অনেক বেশি বেদনার। আপাতত আহত ছয়জনের সুস্থতা এবং এই কারিগরি ত্রুটির সঠিক কারণ খুঁজে বের করাই কর্তৃপক্ষের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার সূত্র ধরে জানা যাচ্ছে, পুরো বিমানবন্দর এলাকাজুড়ে এখন কড়া নিরাপত্তা আর তদন্তের কাজ চলছে। ঘটনার বিস্তারিত খতিয়ে দেখতে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে কাজ করছে সুইস এয়ারলাইন্স।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া



