চীনের ‘দখল’ ঘিরে আবারও উত্তপ্ত ভারত-চীন সীমান্ত

ভারতের সঙ্গে চীনের সীমান্ত ৩ হাজার ৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ। জম্মু ও কাশ্মীর, লাদাখ, সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত এই সীমান্তের বড় অংশই বিরোধপূর্ণ।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
সীমান্ত্রে বোফর্স কামান বসাচ্ছে ভারতীয় সেনারা
সীমান্ত্রে বোফর্স কামান বসাচ্ছে ভারতীয় সেনারা |সংগৃহীত

অরুণাচল প্রদেশের সীমান্ত এলাকায় চীনা বাহিনীর বিরুদ্ধে ভূমি দখল ও ভারতের গুরুত্বপূর্ণ টহল পয়েন্টে ঢুকতে বাধা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের মিত্র আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের একটি অনুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়েছে। এ নিয়ে নয়াদিল্লিতে রাজনৈতিক উত্তেজনাও তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনটি নয়াদিল্লিতে রাজনৈতিক ক্ষোভেরও জন্ম দিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় চীনের কথিত ভূমি দখলের অভিযোগ নিয়ে নীরব থাকার জন্য বিরোধীরা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমালোচনা করেছে।

আজ জাজিরা জানিয়েছে, নতুন করে সামনে আসা অভিযোগগুলো উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশের দুর্গম ও দুর্গম পার্বত্য জেলা আপার সুবানসিরিকে ঘিরে। ১৯৬২ সালে যুদ্ধে জড়ানো দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও চীনের সম্পর্ক যখন আবারও কিছুটা উষ্ণ হয়ে উঠছে, ঠিক তখনই এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্য সেই প্রক্রিয়াকে বানচাল করে দিতে পারে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে নয়াদিল্লি ও বেইজিং—দুই পক্ষই। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফরের কয়েক সপ্তাহ আগেই এই প্রতিবেদন প্রকাশ হলো।

ভারতের সঙ্গে চীনের সীমান্ত ৩ হাজার ৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ। জম্মু ও কাশ্মীর, লাদাখ, সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত এই সীমান্তের বড় অংশই বিরোধপূর্ণ। দুই দেশ সীমান্তে নিয়ন্ত্রণের বিভাজনরেখা হিসেবে ব্যবহৃত প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি কোথায়, তা নিয়েও একমত নয়।

কী পেয়েছে অনুসন্ধানী দল

চীনা বাহিনীর কথিত অনুপ্রবেশের খবর প্রকাশের পর পিপলস পার্টি অব অরুণাচল প্রদেশ বা পিপিএ চার সদস্যের একটি অনুসন্ধানী দল সেখানে পাঠায়। পিপিএ নর্থ ইস্ট ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের অংশ, যে আঞ্চলিক জোটের নেতৃত্বে রয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। অরুণাচল প্রদেশের সরকারও বিজেপির নেতৃত্বাধীন।

দলটির ভাইস প্রেসিডেন্ট কালিং জেরাং অনুসন্ধানী দল সম্পর্কিত তথ্য জাজিরাকে জানান। দলটি বলেছে, এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত খারাপ আবহাওয়া, আকস্মিক বন্যা, প্রাক-বর্ষা ও বর্ষার ভারী বৃষ্টি এবং ভূমিধসের কারণে ভারতীয় বাহিনী তাকসিং এলাকায় নিয়মিত টহল দিতে পারে না। বিপরীতে, ওই সময়ে চীনা বাহিনী সীমান্ত এলাকায় ‘পুরো সময় সক্রিয়’ থাকে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির সাথে সংঘর্ষের পর ভারতীয় বাহিনী শেরা-৫ নামের একটি সীমান্ত টহল পয়েন্ট ছেড়ে দিয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা অনুসন্ধানী দলটিকে জানিয়েছেন। চীনা অনুপ্রবেশের কারণে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভও তৈরি হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, পূর্বপুরুষদের শিকারের জমি হারাচ্ছেন তারা।

জেরাং বলেন, ‘এই অনুপ্রবেশের বিষয়ে মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনগুলো অখণ্ডনীয়।’ তাঁর দাবি, ‘এসব দখল নতুন বা আকস্মিক নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে।’ তাঁর অভিযোগ, নয়াদিল্লি ও অরুণাচল প্রদেশের বিজেপি সরকার সীমান্তের মানুষের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। গত মাসে স্থানীয় আদিবাসী সংগঠন নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটিও সরকারি কর্মকর্তাদের চিঠি দিয়ে বলেছে, যতটা সম্ভব ভূমি দখলের উদ্দেশ্যে চীনা অনুপ্রবেশ ‘বহুগুণ বেড়েছে’।

ভারত-চীন কে কী বলছে

চীনা বাহিনীর কথিত অনুপ্রবেশ নিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী দেয়া সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনকে ‘ভুল এবং ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এতটা সরাসরি অভিযোগ নাকচ করেনি। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, সীমান্তসংক্রান্ত বিষয়কে ভারত সবসময় ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ বলে মনে করে এবং সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সর্বোচ্চ গুরুত্বের বিষয়। তিনি বলেন, সীমান্তের পরিস্থিতি দুই দেশের বৃহত্তর সম্পর্কেও প্রভাব ফেলবে।

বেইজিংও নতুন উত্তেজনার অভিযোগ নিশ্চিত বা অস্বীকার না করে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, ‘এই মুহূর্তে চীন-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি সাধারণভাবে স্থিতিশীল।’ তিনি জানান, গত সপ্তাহে দুই দেশ সীমান্তবিষয়ক ৩৬তম বৈঠক করেছে এবং কূটনৈতিক ও সামরিক চ্যানেলে যোগাযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় শান্তি রক্ষায় একমত হয়েছে।

পুরোনো বিরোধ, নতুন উত্তেজনা

ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধের শিকড় ব্রিটিশ আমলে। ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ ভারত ও তিব্বত সিমলা কনভেনশনের মাধ্যমে ম্যাকমোহন লাইন নির্ধারণ করেছিল। ভারত স্বাধীনতার পর এটিকে চীনের সাথে সীমান্ত হিসেবে মেনে নেয়। কিন্তু ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠার পর চীন ওই সীমারেখা প্রত্যাখ্যান করে। বেইজিং পুরো অরুণাচল প্রদেশকে নিজেদের ভূখণ্ড দাবি করে এবং একে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বলে অভিহিত করে।

লাদাখে ২০২০ সালের জুনে দুই দেশের সেনাদের হাতাহাতি সংঘর্ষে অন্তত ২০ ভারতীয় ও চার চীনা সেনা নিহত হন। সিকিমের নাকু লাতেও ২০২০ ও ২০২১ সালে সংঘর্ষ হয়। ২০১৭ সালে ডোকলামেও ৭৩ দিনের সামরিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বি আর দীপকের মতে, ছোট কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

অন্যদিকে সীমান্ত উত্তেজনার মধ্যেও দুই দেশের বাণিজ্য বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দ্বিপক্ষীয় পণ্য বাণিজ্য ১৫১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ৭১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের দ্বিগুণেরও বেশি। তবে এর বড় অংশই ভারতের চীন থেকে আমদানি।

ব্রাসেলসভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক প্রবীণ দোন্থি বলেন, ট্রাম্পের শুল্কের কারণে ভারত ও চীন তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোর সীমান্ত উত্তেজনা কাটিয়ে উঠতে তারা এখনো ‘সতর্কভাবে পুনঃসম্পৃক্ততার’ প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।

দোন্থি জাজিরাকে বলেন, ‘চীন সীমান্ত বিরোধকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এবং অতীতের মতোই পরস্পরবিরোধী সংকেত দেয়। স্থানীয় কমান্ডাররা নিজেদের সিদ্ধান্তে এমন কাজ করছেন, নাকি সামরিক নেতৃত্বের নির্দেশে- সে বিষয়টি বোঝার জন্য ভারতকে বেশ মাথা ঘামাতে হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক কিছুটা উন্নত হলেও সীমান্ত বিরোধের মূল কারণ দূর হয়নি। আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক প্রবীণ দোন্থি বলেন, ভারত ও চীন এখনো ‘সতর্ক পুনঃসম্পৃক্ততার’ মধ্যে রয়েছে। আর সোমাইয়া বিদ্যাবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সাহেলি চট্টরাজের ভাষায়, দুই দেশের সম্পর্ককে ‘প্রকৃত স্বাভাবিকীকরণ’ নয়, বরং ‘নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা’ হিসেবে দেখা ভালো।

জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ভারত-চীন সম্পর্কের ওপর এর ছায়া থেকেই যাবে। ‘ভারত ও চীন প্রতিদ্বন্দ্বী হতে বাধ্য,’ বলেন দোন্থি। ‘অমীমাংসিত সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত দুই দেশের সম্পর্ককে এটি তাড়া করে বেড়াবে।’