মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে ভারতীয় পণ্যের উপর শুল্ক কার্যত দ্বিগুণ হয়ে ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে। এই পদক্ষেপকে ‘অন্যায় ও অযৌক্তিক’ আখ্যা দিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর নিন্দা জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল একটি আর্থিক আঘাতই নয়। বরং কৌশলগত অর্থনৈতিক জবরদস্তির একটি নতুন যুগের সূচনা।
ভারত থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি ২০২৫ অর্থবছরে প্রায় ৮৬.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও তা মোট জিডিপির ২ শতাংশের কম। সামগ্রিকভাবে ভারতের সামষ্টিক অর্থনীতি এই ধাক্কা সামাল দিতে পারবে বলে মনে করছেন ভারতীয় বিশ্লেষকরা। তবে তারা সতর্ক করছেন, শুল্কের প্রকৃত প্রভাব খাতভিত্তিক বিভাজনের ভেতর দিয়ে প্রকাশ পাবে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স, মোবাইল উপাদান, বস্ত্র, চামড়া ও গহনার মতো উচ্চ প্রবৃদ্ধিশীল ও শ্রমনির্ভর খাতগুলো এই শুল্কে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গোল্ডম্যান শ্যাক্সের হিসেবে, ভারতের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ৬০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত হ্রাস ঘটতে পারে।
এই শুল্ক আরোপ ডব্লিউটিও কাঠামোর অধীনে একাধিক লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতীয় বিশেষজ্ঞ প্রভাষ রঞ্জনের মতে, এটি জিএটিটি-এর ধারা আই এবং আইআই-এর পরিপন্থী। যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে শুল্ক বৃদ্ধির মাধ্যমে ভারতের উপর বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা ব্যতিক্রম (ধারা এক্সএক্সআই) এর আওতায় নিজেদের পদক্ষেপকে ন্যায্য বলার চেষ্টা করতে পারে। ডব্লিউটিও-এর পূর্ববর্তী রায় বিশেষ করে ‘রাশিয়া-ট্রাফিক ইন ট্রানজিট’ মামলায় প্রমাণ করে, এই ধরনের ব্যতিক্রম প্রয়োগের জন্য কঠোর শর্ত পূরণ করতে হয়, যা ভারতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তবে ডব্লিউটিও আপিল সংস্থা বর্তমানে নিষ্ক্রিয় থাকায় আইনি প্রতিকার পাওয়ার সম্ভাবনা কার্যত ক্ষীণ।
শুল্ক বৃদ্ধির পেছনে অর্থনৈতিক যুক্তির চেয়ে ভূ-রাজনৈতিক হিসাবই বড়। ভারতের রাশিয়া থেকে তেল আমদানি ও ব্রিকস ফোরামে সক্রিয়তা যুক্তরাষ্ট্রের বিরাগের কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। এই অবস্থান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির বিরোধী। এমনকি জাতিসঙ্ঘ সনদের অনুচ্ছেদ ২(৭) অনুযায়ী রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ হিসেবেও চিহ্নিত হতে পারে।
বিশিষ্ট আইনজীবী মার্কো মিলানোভিচ এই ধরনের কার্যকলাপকে ‘জোরপূর্বক চাঁদাবাজি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। যেখানে অর্থনৈতিক চাপ আইনত অযৌক্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ক্ষয়কর।
বিশ্বাসভঙ্গের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থেকেই যায়। এমনকি যদি শুল্ক প্রত্যাহার করা হয় (যেমন চীনের ক্ষেত্রে হয়েছিল), তবুও বলপ্রয়োগের স্মৃতি বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। ভারত এখন এমন এক বিশ্বে প্রবেশ করছে, যেখানে অর্থনীতি লেনদেননির্ভর এবং কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। মার্কিন নজির ভারতের ‘চীন + ১’ বিকল্প হিসেবে অবস্থানকেও দুর্বল করতে পারে।
ভারতের উচিত হবে নিচের চারটি অক্ষে সমন্বিত প্রতিক্রিয়া-
১. সংরক্ষণ : কৃষি, জনস্বাস্থ্য, ও তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে নীতিগত সার্বভৌমত্ব বজায় রাখা।
২. সংস্কার : লজিস্টিক খরচ কমানো, ডিজিটাইজেশন এবং বন্দরগুলোতে দক্ষতা বৃদ্ধি করা।
৩. বৈচিত্র্যকরণ : ইউরোপ, ব্রিটেন ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সাথে দ্রুত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন এবং গ্লোবাল সাউথের সাথে রুপি-ভিত্তিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ।
৪. লিভারেজ সৃষ্টি : জেনেরিক ওষুধ, চিপ প্যাকেজিং এবং ডিজিটাল বাজারের মতো ক্ষেত্রে ভারতের কৌশলগত শক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে বিশ্বব্যাপী বিকল্পহীনতা তৈরি করা।
বর্তমান পরিস্থিতি সাময়িক নয়—এটি বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি কাঠামোগত রূপান্তর। কেবল আইনি বা প্রতিক্রিয়াশীল উপায়ে নয়, কৌশলগতভাবে নিজস্ব অর্থনৈতিক শক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করেই ভারত সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারবে। একবিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক অর্থনীতিতে সার্বভৌমত্বের ভিত্তি হবে কৌশলগত স্বচ্ছতা, প্রতিক্রিয়াশীল প্রতিরক্ষা নয়।
সূত্র : এনডিটিভি



