নেপালে জেন জিদের বিক্ষোভে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগে পদত্যাগ করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে বিক্ষোভকারীদের সংঘাতে এ পর্যন্ত ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে নেপালে।
তবে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলেও এখনো ক্ষোভ প্রশমণের কোন লক্ষ্মণ দেখা যায়নি দেশটিতে, নেপালজুড়ে বিভিন্ন জায়গায় সরকারি ভবনগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে বিক্ষোভকারীরা।
ভক্তপুরের বালাকোটে পদত্যাগ করা প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মার বাড়িতেও আগুন দিয়েছে বিক্ষুব্ধরা।
এর আগে, সোমবার গভীর রাতে মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠকের পর ফেসবুক ও ইউটিউবসহ ২৬টি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের ওপর দেয়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয় সরকার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং পাশাপাশি দুর্নীতি মোকাবিলার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ করছিলেন হাজার হাজার তরুণ-তরুণী।
তারা সোমবার রাজধানী কাঠমান্ডুতে পার্লামেন্ট ভবনে জোর করে প্রবেশ করার চেষ্টা চালায় এবং বিভিন্ন জায়গায় আগুন ধরিয়ে দেয়।
নেপালের ত্রিভুব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল স্থগিত করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ
কেপি শর্মা ওলি চতুর্থবারের মতো নেপালের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং সবশেষ দফায় ২০২৪ সালের জুলাই মাসেই তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন।
রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো পদত্যাগ পত্রে প্রধানমন্ত্রী ওলি লিখেছেন, সাংবিধানিক পথে সঙ্কটের সমাধানের পথ তৈরির জন্য তিনি পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মঙ্গলবার সকাল থেকেও নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু এবং অন্যান্য শহরেও বিক্ষোভ করতে শুরু করেছে বিক্ষুব্ধ প্রতিবাদকারী।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী ওলি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবাসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙ্গচুর হয়েছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের আগে দেশটির জোট সরকারের সহযোগী দলের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী সরকার থেকে পদত্যাগ করেন।
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, সোমবার বিক্ষোভে ১৯ জন নিহত হওয়ার পরে মঙ্গলবার সকালে আরো দু’জনের মৃত্যু হয়েছে।
এর আগে সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের পর মঙ্গলবার সকালে দেশটির কৃষিমন্ত্রী পদত্যাগ করেন।
মঙ্গলবার সকালে দ্বিতীয় দিনের বিক্ষোভ শুরু
মঙ্গলবার সকাল থেকে দেশটির দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভকারীরা দ্বিতীয় দিনের মতো রাস্তায় নামেন।
এর আগে নেপালে সামাজিক মাধ্যমের ওপর সরকারের নিষেধাজ্ঞার পর দেশটিতে জেন জি অর্থাৎ অল্পবয়সী কিশোর-তরুণেরা বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন।
তবে দেশটির সরকার মঙ্গলবার বিক্ষোভকারীদের দাবি মেনে নেয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়।
এদিকে, শহরের কিছু অংশে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি থাকা সত্ত্বেও বিক্ষোভকারীরা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবাসহ দেশটির বেশ কয়েকজন নেতার বাড়িতে হামলা চালান।
এর আগে সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুলে দেয়া এবং প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়। পুলিশের সাথে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে অন্তত ২১ জন নিহত ও কয়েক শ’ মানুষ আহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার সকাল থেকে কাঠমান্ডুর রাস্তায় নামতে থাকেন বিক্ষোভকারীরা। বেলা বাড়ার থাকার সাথে সাথে রাস্তায় তাদের সংখ্যাও বাড়ে।
এদিকে, পার্লামেন্ট ভবনের বাইরে জড়ো হন অনেক বিক্ষাভকারী। তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করতে গিয়ে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে সশস্ত্র পুলিশ।
সরকারের জরিপ বিভাগের ভবনের বাইরের অংশে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে এবং ধোঁয়ার মেঘে আশপাশের এলাকা ভরে গেছে।
এদিকে বিক্ষোভ শুরুর পর এ পর্যন্ত তিন মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন।
সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখক পদত্যাগ করেছিলেন। এরপর কৃষি ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী রাম নাথ অধিকারী এবং পানি সরবরাহ বিভাগের মন্ত্রী প্রদীপ ইয়াদভ পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।
নেপালের প্রধান বিমানবন্দর ত্রিভুবন বিমানবন্দর বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
বিক্ষোভের একপর্যায়ে নেপালের ন্যাশনাল ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টির সভাপতি রবি লামিছানেকে কারাগার থেকে মুক্ত করেছে বিক্ষোভকারীরা।
কেন এত ক্ষোভ জেন জিদের?
নেপালে সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে তরুণদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১২ বছর বয়সের একজন শিশুও রয়েছে। সংঘর্ষে আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ।
ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) বা ইউটিউবের মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে ‘জেনারেশন z’ বা জেন জির ডাকে সোমবার কাঠমান্ডুতে দেশের পার্লামেন্টের সামনে জমায়েতের ডাক দেয়া হয়েছিল।
সেই ডাকে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার মানুষ পার্লামেন্টের সামনে জড়ো হলে পরিস্থিতি একটা পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
ক্ষুব্ধ প্রতিবাদকারীরা কারফিউ বিধিনিষেধ ভেঙে পার্লামেন্ট কমপ্লেক্সের সুরক্ষিত এলাকায় ঢুকে পড়লে রাজধানীতে সেনাবাহিনী নামানো হয়।
নেপালের যোগাযোগমন্ত্রী পৃথ্বী সুব্বা বলেছেন, পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর বল প্রয়োগ করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।
তিনি জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে জলকামান ও রাবার বুলেট ছোঁড়া হয়, সেই সাথে লাঠিচার্জ করা হয় বিক্ষোভকারীদের ওপর।
এর আগে নেপালের সরকার বলেছিল, ভূয়া ও মিথ্যা খবর, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রচার এবং অনলাইন জালিয়াতি মোকাবিলায় নেপালে সামাজিক যোগযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করা জরুরি।
কিন্তু দেশটিতে ইনস্টাগ্রামের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মে লাখ লাখ ব্যবহারকারী আছেন, যারা খবর, বিনোদন বা ব্যবসায়িক কাজে এসব অ্যাপের ওপর নির্ভরশীল।
ফলে সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই তারা এই বিক্ষোভের ডাক দেন।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, দুর্নীতি ও সরকারের ‘আধিপত্যবাদী মানসিকতা’র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে বহু মানুষ বিক্ষোভে যোগ দেন।
কী বলছেন বিশ্লেষকেরা?
বিবিসির দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সম্পাদক আনবারাসন ইথিরাজন বলছেন, নেপালের বিভিন্ন অংশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও কয়েকজন মন্ত্রীর পদত্যাগের পরও দেশটিতে ক্ষোভ প্রশমণের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।
আর এ কারণেই শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলিকে পদত্যাগ করতে হয়।
গত বছরের জুলাই মাসে যখন তিনি দায়িত্ব নেন, ওই সময় দেশটির আরেক বড় রাজনৈতিক দল নেপালি কংগ্রেসের সমর্থন পায় কেপি ওলির দল।
বিক্ষোভকারীরা নেপালি কংগ্রেসের হেডকোয়ার্টার এবং সংসদে দলটির প্রধানের বাসভবনে গতকাল ভাঙচুর চালিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ফলে ২১ জনের মৃ্ত্যুর ঘটনায় দেশটির সাধারণ মানুষ এখনো শোকাহত ও বিক্ষুব্ধ হয়ে আছে।
সামাজিক মাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসলেও সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতার কারণে মানুষ হতাশ এবং ক্ষুব্ধ ছিল।
বিক্ষোভকারীরা সরকারের জবাবদিহিতা এবং সুশাসন ও সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।
সূত্র : বিবিসি



