ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে বিশেষ সফরে পাকিস্তান পৌঁছেছেন। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিশেষ ভূমিকা পালন করা পাকিস্তানে ইরানের প্রেসিডেন্টের এ সফর বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
সাম্প্রতিক মার্কিন-ইরান যুদ্ধ প্রশমনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সহজতর করার ক্ষেত্রে ইসলামাবাদের ভূমিকার ফলে ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)’ স্বাক্ষরিত হয়।
আজ মঙ্গলবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, বিমানবন্দরে ইরানের প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার।
ইরানের প্রতিনিধি দলে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও রয়েছেন। তবে তিনি অগ্রবর্তী হিসেবে মঙ্গলবার সকালে ইসলামাবাদ পৌঁছান বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতি অনুসারে, রাষ্ট্রপতি পেজেশকিয়ানের সফরসঙ্গী প্রতিনিধিদলের অংশ হিসেবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি মঙ্গলবার সকালে ইসলামাবাদে পৌঁছেছেন।
গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে ইরানজুড়ে আমেরিকা ও ইসরাইল অতর্কিতে এই যুদ্ধ শুরু করে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই তারা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের গুপ্তহত্যা করে। এর ফলে পরিস্থিতি দ্রুত একটি বড় আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেয়। এই যুদ্ধে ইরান ও লেবাননের সাত হাজারেরও বেশি নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারায়। যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বাড়ে, মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয় এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্য সরবরাহে বড় সংকটের আশঙ্কা দেখা দেয়।
তবে ইরান বীরত্বের সাথে এই আগ্রাসন মোকাবেলা করার পর অবশেষে গত সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক শহরে আমেরিকা, ইরান, পাকিস্তান ও কাতারের উপস্থিতিতে চার দলীয় এক ঐতিহাসিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সভাপতিত্বে ওই বৈঠকের ধারাবাহিকতায় ১৮ জুন ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ সই হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের স্থায়ী অবসান ঘটানো।
তবে এই শান্তি আলোচনার বাইরে থাকা ইসরাইল চুক্তিটি মেনে নেয়নি এবং তারা লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে আগ্রাসী যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। যা ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ বাস্তবায়নে নতুন করে সংশয় তৈরি করেছে।
পাশাপাশি চুক্তি সইয়ের পর সুইজারল্যান্ডে প্রথম দফার আনুষ্ঠানিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর রোডম্যাপে একমত হয়েছে আমেরিকা ও ইরান।
এই সফল কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার পর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তার সফরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পুরো বিষয় নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করবেন।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দফতর জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, জ্বালানি, সীমান্ত নিরাপত্তা, জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক সংযোগ আরো গভীর করার উপায় নিয়ে আলোচনা হবে। একইসাথে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ে দুই পক্ষ এক হয়ে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করবে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, সংকটের সময়ে পাকিস্তানের দেয়া দৃঢ় কূটনৈতিক সমর্থন এবং আমেরিকা-ইরান সংলাপের পরিবেশ তৈরিতে তাদের অবদানের প্রতি তেহরানের পক্ষ থেকে ব্যক্তিগতভাবে কৃতজ্ঞতা জানাতেই পেজেশকিয়ানের এই আগমন।
ক্ষমতা গ্রহণের পর পাকিস্তানে এটি তার দ্বিতীয় সফর এবং ফেব্রুয়ারি মাসের ওই অন্যায় যুদ্ধ শুরুর পর এটিই তার প্রথম কোনো বিদেশ সফর। এই সফর দুই প্রতিবেশীর মধ্যকার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনকে আরো মজবুত করবে এবং এ অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
সূত্র: দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন



