গাজা পূর্ণ দখলে যেসব পরিকল্পনায় এগুচ্ছে নেতানিয়াহু

এই পরিকল্পনায় স্পষ্ট বিজয়ের কোনো নির্দেশিকা নেই। কিন্তু অনাহার, গণহত্যা ও দখলদার সেনাদের জন্য দীর্ঘ ও ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের প্রবল ঝুঁকি রয়েছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
গাজায় ইসরাইলি ট্যাংক বহর মোতায়েন
গাজায় ইসরাইলি ট্যাংক বহর মোতায়েন |আল জাজিরা

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘোষণায় গাজা দখলের নতুন সামরিক পরিকল্পনা অনুমোদন পেয়েছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় ১০ লাখ ফিলিস্তিনিকে দক্ষিণে সরিয়ে নেয়া; হামাসকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা; ইসরাইলি বন্দী উদ্ধার করা; বাফার জোন গঠন করা; কঠোর নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ করা ও হামাস বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ছাড়া নতুন প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে।

প্রায় ৫০ হাজার সেনা, পদাতিক, সাঁজোয়া, প্রকৌশল ইউনিট, ড্রোন, যুদ্ধবিমান ও আর্টিলারি এই অভিযানে অংশ নেবে। অভিযানটি ৪-৫ মাস ধরে চার ধাপে চলবে- প্রথমে গাজা শহরের বাসিন্দা উচ্ছেদ ও ‘নিরাপদ অঞ্চল’ স্থাপন, এরপর গাজা সিটি ও আশপাশের শিবিরে স্থল আক্রমণ ও অবরোধ, তৃতীয় ধাপে মধ্য ও দক্ষিণ গাজা দখল এবং শেষে উপত্যকা ভাগ করে দখলকৃত এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।

ইসরাইল চতুর্থ পর্যায়ের শেষে হামাসকে নিরস্ত্র করা, বন্দীদের মুক্ত করা, গাজাকে সামরিকীকরণমুক্ত করা, নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ আরোপ ও হামাস বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষবিহীন বেসামরিক প্রশাসন গঠনের লক্ষ্য নিয়েছে। তবে এতদিনে তারা মূলত বেসামরিক হত্যা ও অবরোধ কঠোর করা ছাড়া অন্য কিছুই অর্জন করতে পারেনি। সেনারা কিছু সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করলেও অধিকাংশ বন্দী উদ্ধার ব্যর্থ হয়েছে, আর প্রতিরোধ আন্দোলন এখনো হামলা চালাতে সক্ষম।

পরিকল্পিত কৌশলে শহর ও আশ্রয়শিবিরে তীব্র অভিযান চলবে। এতে রাস্তা নিয়ন্ত্রণ, টানেল ধ্বংস, বিমান হামলা ও স্থল আক্রমণ, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি, ফাঁড়ি স্থাপন, টহল, নজরদারি এবং নতুন প্রশাসন গঠনের ধাপ থাকবে। ভারী ট্যাঙ্ক, সাঁজোয়া যান, বুলডোজার, ড্রোন ও স্যাটেলাইট ব্যবহার করা হবে।

প্রতিরোধ গোষ্ঠী ভূখণ্ডের সুবিধা নিয়ে মাইন, ট্যাঙ্ক-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, স্নাইপার, ভিবিআইইডি, মর্টার ও রকেট ব্যবহার করবে। অ্যামবুশ ও সুড়ঙ্গ আক্রমণ চালাবে। গেরিলা যুদ্ধে তারা দক্ষ, যা ইসরাইলি অগ্রযাত্রা ধীর ও জটিল করবে।

এই প্রতিরোধ যোদ্ধারা গেরিলা যুদ্ধে দক্ষ, যা ইসরাইলি অগ্রযাত্রাকে ধীর করে দেয়। সুড়ঙ্গ, অ্যামবুশ ও ইম্প্রোভাইজড বিস্ফোরক ব্যবহার করে বিকেন্দ্রীভূত আক্রমণ চালানো হয়, যা যেকোনো স্থানে সঙ্ঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি করে। পূর্ব অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এতে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধ হয়, কিন্তু নির্ণায়ক বিজয় আসে না। প্রতিরোধ যোদ্ধাদের লক্ষ্য ইসরাইলের মতো বিজয় নয়, বরং আক্রমণকে ব্যয়বহুল ও প্রাণঘাতী করে তোলা।

সম্প্রতি উপগ্রহচিত্রে ইসরাইলি সামরিক যান জমা হওয়ার প্রেক্ষিতে নতুন স্থল আক্রমণের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, জার্মানি ও অন্যান্য দেশ এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে; জার্মানি অস্ত্র রফতানি বন্ধ করেছে। ইসরাইলের ভেতরেও সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও বিরোধী নেতারা অচলাবস্থার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

গাজা ঘনবসতিপূর্ণ, সুড়ঙ্গ ও অবকাঠামোয় ভরা হওয়ায় এটিকে ‘পরিষ্কার’ করা অত্যন্ত জটিল। এতে বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকি ব্যাপক, বিশেষত যারা পালাতে পারবে না। রাজনৈতিক লক্ষ্য যেমন বন্দী মুক্তি—পূর্ণাঙ্গ আক্রমণে তা ব্যর্থ হতে পারে।

সংক্ষেপে, এই পরিকল্পনায় স্পষ্ট বিজয়ের পথ নেই। কিন্তু অনাহার, গণহত্যা এবং দখলদার সেনাদের জন্য দীর্ঘ, ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের ঝুঁকি রয়েছে।

সূত্র : আল জাজিরা