ইউরেনিয়াম নিয়ে নতুন সমীকরণ: যুক্তরাষ্ট্রের সামনে পারমাণবিক পথ, ইরানের পাল্টা দাবি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অবস্থান নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং প্রয়োজনে তা দখলে নিতে সেনা পাঠানোর সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। অন্যদিকে ইরান দাবি করছে যুদ্ধক্ষেত্রে তারা ড্রোন ও যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে আক্রমণ-প্রতিরক্ষার ভারসাম্য বদলে দিয়েছে।

সৈয়দ মূসা রেজা
সংগৃহীত

রাতের আকাশে তখনও যুদ্ধের ধোঁয়া ভাসছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের রেখা যেন আগুনের দাগ কেটে গেছে। এমন এক সময়ে হঠাৎ নতুন প্রশ্ন উঠে দাঁড়াল। যুক্তরাষ্ট্র এখন কী করবে। ইরানের পারমাণবিক ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ কী। আর যুদ্ধক্ষেত্রে আসলে কী ঘটছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরাইলের হিসাব এবং স্নায়ুক্ষয়ী দাবার লড়াই। অন্যদিকে ইরানের পাল্টা দাবি। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যেন আরো ঘনীভূত হয়ে উঠেছে।

ব্রিটেনের দৈনিক টাইম ওয়াশিংটন থেকে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে বলছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন এক নতুন সম্ভাবনা নিয়ে ভাবছেন। যদি দরকার হয়, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিরাপদে দখলে নিতে মার্কিন সেনা পাঠানো হতে পারে। কারণ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানের একটি বড় স্থাপনা বিধ্বস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ট্রাম্প নিজেই আগেই বলেছিলেন সেই জায়গাটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।

শনিবার ইরানের বার্তাসংস্থা আইএসএনএ জানায়, ইসফাহানে একটি ইরেডিয়েশন স্টেরিলাইজেশন স্থাপনায় মিসাইল হামলায় গুরুতর ক্ষতি হয়েছে।

ইরেডিয়েশন স্টেরিলাইজেশন হলো অনুজীব নিধনের আধুনিক পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে উচ্চ-শক্তির আয়োনাইজিং রেডিয়েশন ব্যবহার করে কোনো বস্তু বা পণ্য থেকে ক্ষতিকর অণুজীব, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক, ধ্বংস করা হয়। সাধারণত চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং খাদ্য সংরক্ষণে ইরেডিয়েশন স্টেরিলাইজেশন প্রয়োগ করা হয়। ইসফাহান সেই জায়গা, যেখানে ধারণা করা হয় ইরানের বেশিভাগ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রাখা ছিল।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইরান সরকার সেখানে কোনো আন্তর্জাতিক পরিদর্শন করতে দেয়নি। শুধু ইসফাহান নয়, ফোর্দো আর নাতাঞ্জেও পরিদর্শনের অনুমতি নেই। এই দুই জায়গাই ইরানের প্রধান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র।

গত জুন মাসে তিনটি স্থাপনাতেই বড় ধরনের হামলা হয়েছিল। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যাচ্ছে কিছু কাজ হয়েছে যা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো মনে হয়। কিন্তু কোথাও পারমাণবিক কর্মসূচি আবার চালু করার বড় কোনো চিহ্ন নেই। ধারণা করা হচ্ছে বেশিভাগ সমৃদ্ধকরণ সেন্ট্রিফিউজ ধ্বংস হয়ে গেছে। আর গ্যাস আকারে ক্যানিস্টারে রাখা ইউরেনিয়াম ধ্বংসস্তূপের নিচে গভীরভাবে চাপা পড়ে আছে।

বিশেষজ্ঞদের হিসাব বলছে, ইরানের কাছে এখন প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম আছে, যা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা হয়েছে। যদি এটাকে ৯০ শতাংশে নেয়া যায়, তাহলে অন্তত ১১টি পারমাণবিক ওয়ারহেড বানানো সম্ভব।

সমস্যা হলো, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা আইএইএ পর্যন্ত জানে না পুরো মজুদ ঠিক কোথায় আছে। আগে তারা এর সত্যতা যাচাই করেছিল। কিন্তু এখন সব ইউরেনিয়াম উদ্ধার করা যাবে কিনা, সেটাও পরিষ্কার নয়। অন্য কোথাও ইউরেনিয়াম থাকতে পারে।

জানা গেছে, ইরান নাতাঞ্জের কাছে পিকঅ্যাক্স পর্বতের গভীরে একটি বিকল্প স্থাপনা বানাচ্ছিল। গত বছরের হামলায় সেটি লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি। ইসরাইল দাবি করছে তাদের কাছে আরো কিছু গোপন স্থাপনার তথ্য আছে এবং সেগুলোকেই এখন লক্ষ্য করা হচ্ছে।

এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, সবকিছু সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। তারা এখনো সেখানে পৌঁছাতে পারেনি। তবে ভবিষ্যতে মার্কিন সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা তিনি উড়িয়ে দেননি।

তার ভাষায়, হয়তো এক সময় আমরা সেটা করব। সেটা ভালোই হবে। তবে আপাতত আমরা শুধু তাদের শক্তি ভেঙে দিচ্ছি। এখনো ভেতরে ঢুকিনি। পরে সেটা করা সম্ভব।

ট্রাম্প বহুবার বলেছেন ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের স্বপ্ন শেষ করা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু বাস্তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের পথ একেবারেই সহজ নয়।

একটি পথ হলো আরো বোমা হামলা। গত জুনে ইসরাইলি বিমান হামলার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করেছিল জিবিইউ ৫৭ এ বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর বোমা। এই বিশাল বাঙ্কার বাস্টার বোমা ফেলেছিল বি টু স্টেলথ বোমারু বিমান। সাথে সাবমেরিন থেকে ছোড়া হয়েছিল টমাহক ক্রুজ মিসাইল। এই বোমা ৬০ মিটার কংক্রিট ভেদ করে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। কিন্তু ইউরেনিয়ামের আসল অবস্থা কী তা এখনো অজানা।

ইসফাহান ফোরদো কিংবা নাতাঞ্জ এই তিন জায়গাতেই ইরানের ইউরেনিয়ামের বিশাল ভাণ্ডার মজুদ ছিল বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু গত জুন মাসের বিধ্বংসী হামলার পর ইরান সেখানে কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না। উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কিছু কাজ চললেও পারমাণবিক কর্মসূচি আবার চালু করার মতো কোনো লক্ষণ নেই। ধারণা করা হচ্ছে গ্যাস সিলিন্ডারে ভরা বেশিভাগ ইউরেনিয়াম এখন ধ্বংসস্তূপের নিচে গভীর সুড়ঙ্গে আটকে আছে।

কতটা ইউরেনিয়াম ধ্বংসস্তূপের নিচে আছে আর কতটা অন্য কোথাও সরিয়ে নেয়া হয়েছে তা অজানাই থেকে যাচ্ছে। নিশ্চিতভাবে জানার একমাত্র উপায় হলো সেই ইউরেনিয়াম সরাসরি দখল করা।

আর সেই কারণেই দ্বিতীয় পথ সামনে আসে। মাটিতে সেনা নামানো। সামরিক কৌশলের বই খুললে এটাই সবচেয়ে সরাসরি সমাধান। পেন্টাগনে নাকি এমন পরিকল্পনা নিয়ে সামিরক মহড়া বা যুদ্ধাভিনয়ও হয়েছে।

কিন্তু বাস্তবতা অনেক কঠিন। ইরান বিশাল দেশ এবং শক্ত প্রতিরক্ষায় ঘেরা। ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় ঢোকা অত্যন্ত জটিল কাজ। বিশেষ করে যদি ঢোকার পথের সুড়ঙ্গগুলো ধ্বংস হয়ে থাকে। বিশেষ বাহিনীকে খননযন্ত্র নিয়ে যেতে হবে। যদি কোথাও গ্যাস আকারে ইউরেনিয়াম লিক হয়ে থাকে তবে তাদের সুরক্ষামূলক পোশাক পরে কাজ করতে হবে। মার্কিন ও ইসরাইলি যৌথ বাহিনী হলেও ঝুঁকি থাকবে প্রবল। তাই অনেকে মনে করেন, এই পথ তখনই নেয়া হবে যখন ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।

তৃতীয় পথ কূটনীতি। বর্তমান সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার আগে ওমানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র আর ইরান আলোচনা করছিল। লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা। যদি ট্রাম্প মনে করেন যুদ্ধ যথেষ্ট হয়েছে, তাহলে আবার আলোচনা শুরু হতে পারে। তখন ইরানের ওপর চাপ থাকবে সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করার।

বিভিন্ন প্রলোভনের কথাও উঠেছিল। যেমন ইরানের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বাইরে থেকেই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরবরাহ করা। কিন্তু ইরান এতদিন ধরে বলে আসছে সমৃদ্ধকরণ তাদের সার্বভৌম অধিকার। তারা দাবি করে, এই কর্মসূচি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ।

আরেকটি বড় সম্ভাবনা হলো শাসন পরিবর্তন। তেহরানে যদি যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্বপূর্ণ সরকার আসে তাহলে ইউরেনিয়াম নিয়ে সব প্রশ্ন সহজে সমাধান হতে পারে। ট্রাম্প আর নেতানিয়াহুর কল্পনায় হয়তো এমন এক পরিস্থিতি আছে যেখানে জনঅভ্যুত্থানে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ভেঙে পড়বে। নতুন পশ্চিমাপন্থী সরকার আইএইএর তত্ত্বাবধানে ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠিয়ে কর্মসূচি বন্ধ করে দেবে।

কিন্তু এখানেও প্রশ্ন আছে। যদি নতুন সরকার ধর্মনিরপেক্ষ ও জাতীয়তাবাদী হয়, তবে তারা পশ্চিমের কিছু দাবি মানলেও দেশপ্রেমের তাগিদে পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যেতে চাইতে পারে। তখন পশ্চিমা বিশ্বের সামনে আবার নতুন দ্বন্দ্ব দাঁড়াবে।

এই জটিল কৌশল আর হিসাবের মাঝেই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ভেসে এসেছে আরেকটি ভিন্ন গল্প।

ইরানের সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ওয়াকিবহাল সামরিক সূত্র দাবি করেছে যুদ্ধক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে চলমান সংঘর্ষের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৮২টির বেশি মার্কিন-ইসরাইলি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। চারটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমানও ধ্বংস করা হয়েছে। একই সাথে অঞ্চলে থাকা উন্নত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি রাডার ব্যবস্থাও ধ্বংস করা হয়েছে।

তার দাবি, এসব ঘটনার ফলে গত কয়েক দিনে আক্রমণ ও প্রতিরক্ষার ভারসাম্য পুরো বদলে গেছে। শত্রুপক্ষের সামরিক অভিযানও এতে ব্যাহত হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ড্রোন ভূপাতিত হওয়া এবং রাডার ধ্বংসের কারণে শত্রুর অপারেশনাল কমান্ড ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। ফলে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদের কৌশল বদলাতে বাধ্য হয়েছে। নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের বদলে তারা এখন এমন কৌশল ব্যবহার করছে যার মূল উদ্দেশ্য আতঙ্ক ছড়ানো। সামরিক দিক থেকে যার মূল্য খুব কম।

ইরানি সামরিক সূত্রটির দাবি, শত্রুপক্ষ আগে যে যুদ্ধবিমান ব্যবহার করত সেগুলো এখন সমস্যায় পড়েছে। একইসাথে গোলাবারুদের ঘাটতিও দেখা দিয়েছে। তাই অনেক ক্ষেত্রে তারা বোমারু বিমান আর বাঙ্কার বাস্টার ব্যবহার করছে এমন সব জায়গায় যেখানে আঘাত করার কোনো সামরিক যুক্তিই নেই।

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, পরিত্যক্ত একটি বাসিজ ঘাঁটি বা পুলিশ স্টেশনে বাঙ্কার বাস্টার ব্যবহার করা হয়েছে।

তার মতে, এই কৌশল পরিবর্তন এবং শত্রুর আক্রমণ ও প্রতিরক্ষার ক্ষমতা কমে যাওয়া ইরানের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির ইঙ্গিত। শত্রুকে এখন অত্যন্ত ব্যয়বহুল অস্ত্র ব্যবহার করতে হচ্ছে এমন লক্ষ্যবস্তুতে যার কোনো সামরিক গুরুত্বেই নেই। এটাও নাকি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিবর্তনের স্পষ্ট লক্ষণ।

শেষে সেই সামরিক সূত্র একটি সতর্ক বার্তা দিয়েছেন। আতঙ্ক সৃষ্টির কৌশল শত্রুর কাজে আসবে না। খুব শিগগিরই তারা দেখবে তাদের অবকাঠামো ধ্বংসের দুঃস্বপ্নও সত্যি হয়ে গেছে। যুদ্ধক্ষেত্র শেষ পর্যন্ত এমন পথে যাবে যা শত্রুর কল্পনাতেও ছিল না।

পরমাণু অস্ত্রের এই গোপন ভাণ্ডার শেষ পর্যন্ত কার দখলে যাবে তা এখনো রহস্যের চাদরে ঢাকা। ট্রাম্প যদি সত্যিই সেনা পাঠানোর ঝুঁকি নেন তবে মধ্যপ্রাচ্যে আগুনের লেলিহান শিখা আরো ভয়াবহ রূপ নেবে। আর যদি আলোচনার টেবিলে সমাধান না আসে তবে এই মাটির নিচে চাপা পড়া ইউরেনিয়ামই হতে পারে আগামী পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন। ওদিকে তেহরানের হুঁশিয়ারি খুব শিগগিরিই শত্রুপক্ষ দেখতে পাবে তাদের নিজেদের অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ার এক ভয়ানক দুঃস্বপ্ন যা তারা কল্পনাও করতে পারেনি।

এভাবেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা ইউরেনিয়াম আর যুদ্ধক্ষেত্রের পাল্টা দাবির ভেতর দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই সঙ্ঘাত আরো ঘনীভূত হচ্ছে। ছাইয়ের নিচে কী আছে কেউ নিশ্চিত নয়। কিন্তু সবাই জানে, সেই ছাইয়ের ভেতরেই লুকিয়ে আছে পরবর্তী বিস্ফোরণের গল্প।