ফিলিস্তিনের গাজায় ত্রাণ বহনকারী নৌবহর আটকের পর সুইডিশ জলবায়ুকর্মী গ্রেটা থুনবার্গসহ শত শত কর্মীকে আটক করেছে ইসরাইলি বাহিনী। নৌবহরটিতে প্রায় ৪০টি জাহাজ ছিল যার প্রায় সবকটিকে আটকে দেয়া হয়েছে।
ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় যারা ছিলেন তাদের ইসরাইলের একটি বন্দরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং সেখান থেকে তাদের নিজ দেশে ফেরানো হবে।
প্রথম নৌকাটিকে গাজার উপকূল থেকে প্রায় ৭০ নটিক্যাল মাইল দূরে আন্তর্জাতিক পানিসীমায় থামানো হয়, অন্যগুলোকে আরো কাছাকাছি জায়গায় আটকানো হয়। ইসরাইল সে এলাকায় নজরদারি চালাচ্ছে, যদিও সেখানে তাদের এখতিয়ার নেই।
সুমুদ ফ্লোটিলার হিসাবে, মোট ৪৪৩ জনকে আটক করা হয়েছে। তারা অভিযোগ করেছে, অনেকের ওপর জলকামান দিয়ে আক্রমণ করা হয়েছিল। তবে ইসরাইলের দাবি, সবাই ‘নিরাপদ ও সুস্থ’ আছেন।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
গাজায় ত্রাণ বহনকারী নৌবহরে হামলার ঘটনায় বিভিন্ন দেশে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে অনেক দেশ উদ্বেগ জানিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক পানিসীমায় বাধা দেয়ার জন্য ইসরাইলের সমালোচনা করেছে।
জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার-বিষয়ক হাই কমিশনার ভলকার তুর্ক ইসরাইলকে ‘দ্রুত গাজার অবরোধ তুলে নিতে এবং সম্ভাব্য সব উপায়ে জীবন রক্ষাকারী উপকরণের প্রবেশাধিকার দেয়ার’ আহ্বান জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইসরাইলকে অবশ্যই নিরপেক্ষ মানবিক সহায়তার যে প্রকল্প রয়েছে সেগুলো ‘কোনো বাধা ছাড়াই’ সহজতর করতে সম্মত হতে হবে।
এদিকে, যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দফতর জানিয়েছে, তারা নৌকায় থাকা ব্রিটিশ নাগরিকদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেছে এবং ইসরাইলি কর্তৃপক্ষকে জানায়, ‘আমরা আশা করি পরিস্থিতি নিরাপদভাবে সমাধান হবে’।

ফিলিস্তিনের সমর্থনে লন্ডনে বিক্ষোভ
আইরিশ ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী সাইমন হ্যারিস এই প্রতিবেদনগুলোকে ‘উদ্বেগজনক’ বলে জানান, তিনি আশা করেন ইসরাইল আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলবে। আটক হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত সাতজন আইরিশ নাগরিক আছেন, তাদের মধ্যে সিন ফেইন সেনেটর ক্রিস অ্যান্ড্রুজও রয়েছেন।
অপরদিকে, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো তার দেশে থাকা সব ইসরাইলি কূটনীতিককে দেশ থেকে বহিষ্কার করেছেন। তিনি এই বাধা দেয়াকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ’ বলে নিন্দা জানান।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেন, গাজার ওপর ইসরাইলের অবরোধ ‘অবৈধ’ এবং ‘বহু দশক ধরে ইসরাইল যেভাবে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের দায়মুক্তি পাচ্ছে তার শেষ হতে হবে’।
সুমুদ ফ্লোটিলা থেকে শত শত মানুষকে আটকের ঘটনার পর প্রতিবাদে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে ফিলিস্তিনিপন্থী বিক্ষোভকারীরা পথে নেমে আসেন। নিন্দা জানাতে ডাবলিন, প্যারিস, বার্লিন ও জেনেভার রাস্তায় হাজার হাজার বিক্ষোভকারী সমবেত হন। বুয়েনস আইরেস, মেক্সিকো সিটি এবং করাচিতেও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
ইতালির ইউনিয়নগুলো শুক্রবার সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে এবং দেশটিতে ১০০টিরও বেশি মিছিল বা গণসমাবেশের সম্ভাবনা রয়েছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি অবশ্য গাজায় পৌঁছানোর প্রচেষ্টাকে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি এখনো বিশ্বাস করি, এসব কিছু ফিলিস্তিনি জনগণের কোনো উপকারে আসে না।’
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান ইসরাইলি আগ্রাসনের সমালোচনা করে বলেন, এর মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে, ইসরাইল সরকারের শান্তির আশা তৈরি হতে দেয়ার কোনো ইচ্ছা নেই।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা ইসরাইলের প্রতি আহ্বান জানান যেন তারা অবিলম্বে নৌবহরে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকানদের মুক্তি দেয়। এর মধ্যে সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলার নাতি নকোসি জুয়েলেভেলিল ম্যান্ডেলাও রয়েছেন।
গাজাগামী ত্রাণবহর আটকের পর স্পেন ইসরাইলি চার্জ ডি’অ্যাফেয়ার্সকে তলব করেছে। স্টেডফাস্টনেস ফ্লোটিলা জাহাজে থাকা সাত বেলজিয়ান নাগরিককে আটকের ঘটনায় বেলজিয়ামও ইসরাইলি রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে।
পাকিস্তান, বলিভিয়া ও মালয়েশিয়া ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রেও বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ দেখা গেছে।
আরো প্রচেষ্টা হবে
গাজার অবরোধের এলাকায় ঢোকার আগেই ফ্লোটিলার একটি নৌযান বাদে বাকিগুলো আটক করেছে ইসরাইলি বাহিনী। ম্যারিনেট নামে ওই নৌযানে ছয়জন যাত্রী রয়েছেন।
সুমুদ ফ্লোটিলার আইনি সহায়তা প্রদান ও পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করা কাইভা বাটারলি (যিনি একটি জাহাজে ছিলেন) বলেন, ‘আগামী দিনে অবরোধ ভাঙার আরো প্রচেষ্টা হবে। আশা করা হচ্ছে, এটি সর্বোচ্চ ১৩টি নৌযান, জাহাজ ও নৌকা হতে পারে এবং এটি গাজায় পৌঁছানোর জন্য একই পথ অনুসরণ করবে।’
এটি আয়োজন করবে আলাদা একটি দল- ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন। তারা এর আগেও দুটি প্রচেষ্টা চালিয়েছিল, কিন্তু দুটোই বাধা দিয়েছিল ইসরাইলি বাহিনী।
ফ্লোটিলার নৌবহর এক মাস আগে স্পেন থেকে যাত্রা শুরু করে। এতে ৪০টিরও বেশি নৌযান এবং প্রায় ৫০০ মানুষ ছিলেন, যাদের মধ্যে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য, আইনজীবী ও কর্মী ছিলেন। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল সরাসরি গাজায় সহায়তা পৌঁছে দেয়া।
সূত্র : বিবিসি



