ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের প্রথম মাসেই বিশ্বের নামী-দামি তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো প্রতি ঘণ্টায় ৩০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি মুনাফা করেছে। এই যুদ্ধে আমেরিকা দিনে গড়ে ১.৮ বিলিয়ন ডলার খরচ করছে, যার বড় অংশই যাচ্ছে 'লকহিড মার্টিন'-এর মতো যুদ্ধাস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের পকেটে। ইরানের মাটিতে যুদ্ধের দামামা বাজার দুই মাস পার হয়ে গেছে। যুদ্ধের আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি মানুষ।
একদিকে যখন লাশের মিছিল বাড়ছে, অন্যদিকে তখন হু হু করে বাড়ছে তেল, গ্যাস আর অস্ত্র ব্যবসার মুনাফা। হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থার কারণে প্রায় ১৬০০ জাহাজ আর ২০ হাজার নাবিক আটকা পড়েছেন। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০৭ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। সাধারণ মানুষের পকেটে যখন টান পড়ছে, ঠিক তখনই পকেট ভারী হচ্ছে হাতেগোনা কিছু রাঘববোয়াল কোম্পানির।
সুইডেনের থিঙ্কট্যাঙ্ক 'সিপরি' জানাচ্ছে, ২০২৫ সালে এসে বিশ্বজুড়ে সামরিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২.৯ ট্রিলিয়ন ডলারে। গত ১১ বছর ধরে এই খরচ কেবল বেড়েই চলেছে। যুদ্ধের বাজারে কার লাভ আর কার লোকসান— তা নিয়ে এক বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন মিডলইস্ট মনিটরের লেখক ফ্লেউর হারগ্রেভস।
জ্বালানি সঙ্কটের কারণে সারা বিশ্বে যখন বিল বাড়ছে, তখন সাধারণ মানুষের কষ্টকে পুঁজি করে বড় বড় কোম্পানিগুলো মেগা মুনাফা লুটছে। এই সঙ্কট যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপ ও এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের পকেটে বড় ধরনের চোট দিয়েছে। অথচ এই যুদ্ধের ডামাডোলে বড় কোম্পানিগুলোর প্রধানদের ব্যক্তিগত সম্পদ কয়েক মিলিয়ন বেড়েছে। হার্বার এনার্জি বা শেলের মতো কোম্পানির কর্তারা যুদ্ধের বাজারে নিজেদের শেয়ারের দাম বাড়িয়ে রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছেন। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজার অস্থির হওয়ায় সাধারণ মানুষকে বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে, আর সেই বাড়তি টাকার পুরোটা কোম্পানিগুলো পকেটে ভরছে। একে এক ধরণের প্রকাশ্য লুটপাট বললেও ভুল হবে না।
অস্ত্র ব্যবসার চিত্র আরো ভয়ংকর। যুদ্ধের অনিশ্চয়তাকে পুঁজি করে অস্ত্র কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব কোম্পানি মানুষের দুর্ভোগকে স্রেফ ব্যবসায়িক পণ্য বানিয়ে ফেলেছে। যেখানে সাধারণ মানুষ ঘর গরম রাখার খরচ জোগাতে পারছে না, সেখানে তেল ও অস্ত্র কোম্পানিগুলো সরকারের কাছ থেকে উল্টো কোটি কোটি টাকার ভর্তুকি পাচ্ছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তারা যেমন কর ফাঁকি দিচ্ছে, তেমনি যুদ্ধের ময়দানে রক্ত ঝরিয়ে মুনাফা লুটছে। যুদ্ধের এই আগুনে সাধারণের ঘর পুড়লেও করপোরেট সিন্দুকে এখন কেবলই লাভের গুড়। এই করপোরেট চক্র আর রাজনীতির সখ্যতা সাধারণ মানুষের জীবনকে দিনে দিনে আরো দুর্বিষহ করে তুলছে।
যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপ ও এশিয়ার কোটি কোটি মানুষ জ্বালানি সঙ্কটে ভুগছে। জুলাই মাস নাগাদ ব্রিটিশ পরিবারগুলোর জ্বালানি বিল বছরে ৩০০ পাউন্ড পর্যন্ত বাড়তে পারে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, দেশটির প্রায় ৪৪ শতাংশ মানুষ এই বাড়তি খরচ মেটানোর ক্ষমতা হারিয়েছে। কিন্তু ঠিক এই সময়েই তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো প্রতি ঘণ্টায় ৩০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি মুনাফা করছে। হার্বার এনার্জি, শেল, বিপি কিংবা সেন্ট্রিকার মতো কোম্পানির প্রধানরা রাতারাতি কোটিপতি বনে যাচ্ছেন। তাদের শেয়ারের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। অথচ সাধারণ মানুষ শীতে ঘর গরম রাখার খরচ জোগাতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
ইরান যুদ্ধে আমেরিকা দিনে গড়ে ১.৮ বিলিয়ন ডলার খরচ করছে। এই বিপুল অর্থের বড় অংশ যাচ্ছে 'লকহিড মার্টিন'-এর মতো যুদ্ধাস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের পকেটে। বছরের শুরু থেকে তাদের শেয়ারের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকিটাকে সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়, আর যুদ্ধের ফলস্বরূপ আসা মুনাফাটা নিজেদের সিন্দুকে ভরে। তেলের দাম বাড়লে তাদের উৎপাদন খরচ বাড়ে না, কিন্তু সঙ্কট দেখিয়ে তারা দাম বাড়িয়ে দেয়। এটা এক ধরণের প্রকাশ্য লুটপাট ছাড়া আর কিছুই নয়।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে যে, এই কোম্পানিগুলো সরকারকে প্রভাবিত করে কর ফাঁকি দিচ্ছে। ব্রিটিশ সরকার জ্বালানি কোম্পানিগুলোর ওপর 'উইন্ডফল ট্যাক্স' বা বাড়তি মুনাফার ওপর কর আরোপ করতে দ্বিধা করছে। লবিস্টদের প্রভাবে রাজনীতি এখন করপোরেটদের কবজায়। অন্যদিকে, বিকল্প জ্বালানি বা নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে না ঝুঁকে তেল-গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা বজায় রাখা হচ্ছে কেবল ব্যবসায়িক স্বার্থে। স্পেন যেমন আমেরিকার ওপর জ্বালানি নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বাধীনতা বজায় রেখেছে, ব্রিটিশ সরকার তা পারছে না। কারণ বড় কোম্পানিগুলোর অনুদানেই অনেকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার টিকে আছে।
অস্ত্র আর জ্বালানি খাত এখন রাষ্ট্রের ভর্তুকির ওপর টিকে থাকা এক 'শোষণের যন্ত্র' হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র নির্মাতা বিএই সিস্টেমস কিংবা ইসরাইলি প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমস— সবাই সরকারের ভেতরে বিশাল প্রভাব খাটায়। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নীতিনির্ধারণেও তাদের সরাসরি হস্তক্ষেপ থাকে। সাবেক রাজনীতিক অ্যান্ড্রু ফেইনস্টাইন বলছেন, এবারের ইরান যুদ্ধটা এক অনন্য উদাহরণ যেখানে ইনসাইডার ট্রেডিং বা গোপন তথ্য ব্যবহার করে শেয়ার বাজারে মুনাফা লোটার বিষয়টি একদম নগ্নভাবে সামনে চলে এসেছে। যুদ্ধের ময়দানে রক্ত ঝরছে সাধারণের, আর সেই রক্তের বিনিময়ে লভ্যাংশ গুনছে প্রভাবশালী গোষ্ঠী। এই দুষ্টচক্র ভাঙার কোনো লক্ষণ আপাতত নেই।
সূত্র : মিডলইস্ট মনিটর



