গাজা উপকূলের কাছে মানবিক জাহাজ ‘ম্যাডলিন’ : এর পেছনে যারা

উদ্যোক্তারা বলছেন, তারা ইসলাইলি প্রতিরোধ ভেদ করেই গাজায় ত্রাণ পৌঁছে দিতে দৃঢ়প্রতীজ্ঞ।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ম্যাডলিন জাহাজ
ম্যাডলিন জাহাজ |সংগৃহীত

ফিলিস্তিনের গাজার জনগণের ওপর ইসরাইলি অব্যাহত গণহত্যা ও অবরোধের মাঝে মানবিক সহায়তা করতে ‘ম্যাডলিন’ জাহাজটি ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা শুরু করেছে। ইতোমধ্যে এটি উপকূলের কাছে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আলজাজিরা।

জাহাজটিতে থাকা একজন মানবিক কর্মীর বরাতে গণমাধ্যমটি জানিয়েছে, জরুরি ত্রাণবাহী জাহাজটি গাজা উপকূলের সন্নিকটবর্তী রয়েছে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, তারা ইসলাইলি প্রতিরোধ ভেদ করেই গাজায় ত্রাণ পৌঁছে দিতে দৃঢ়প্রতীজ্ঞ।

অপরদিকে, জাতিসঙ্ঘের বিশেষ রিপোর্টিয়ার ফ্রান্সেসকা আলবেনিস জাহাজটি উপকূলে ভিড়তে কোনো বাধা না দিতে ইসরাইলের প্রতি আবারো আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি এক এক্স পোস্টে বলেছেন, ‘এটি শুধু ত্রাণ বহন করছে না, বরং মানবিকতা নিয়ে এসেছে।’ আগের ত্রাণ বহরগুলোতে বাধা দিলেও এবার ইসরাইল তা করবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

জাহাজটিতে থাকা তুরস্কের মানবাধিকার কর্মী হোসেইন সোয়ায়েব বলেন, নাবিকরা আশাবাদী যে তারা ইসরাইলি সামরিক আক্রমণের ঝুঁকির মধ্যেই অবরুদ্ধ গাজার উপকূলে ভিড়তে পারবেন।

তিনি জানান, ‘আমরা এখনো গাজা অভিমুখে এগিয়ে চলেছি। সামান্য দূরত্বেই রয়েছি আমরা। আমরা যদি বড় কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন না হই তাহলে আগামীকালই গাজা পৌঁছাব।

এদিকে, ইরানি সংবাদমাধ্যম পার্সটুডে রোববার এক প্রতিবেদনে মানবিক মিশন ‘ম্যাডলিন’ নিয়ে এক বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজার জনগণের ওপর ইসরাইল আক্রমণ চালিয়ে আসছে। তারা হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করছে এবং এই অঞ্চলের ওপর নিষ্ঠুর অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। ‘ম্যাডলিন’ জাহাজটি গাজার নিপীড়িত জনগণকে সাহায্য করার লক্ষ্যে অনুকরণীয় সাহসিকতার সাথে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা শুরু করেছে। সংহতি, আশা ও মূল্যবান মানবিক ত্রাণ-পণ্য বহনকারী ওই জাহাজটি এখন গাজার তীরে পৌঁছেছে। ভূমধ্যসাগরের ঢেউয়ের বুকে প্রতিরোধ ও মানবতার পতাকা উড়িয়েছে ওই জাহাজ।

ওই জাহাজের মিশন সম্পর্কে নিম্নে বিশদ আলোচনা করার চেষ্টা করা হলো :

ম্যাডেলিন নামটি কোত্থেকে এসেছে?

গাজার প্রথম ফিলিস্তিনি নারী জেলে ম্যাডলিন কোল্লাবের সম্মানে জাহাজটির নামকরণ করা হয়েছে ম্যাডলিন; এটি এমন এক নাম যা দৃঢ়তা এবং সংগ্রামের প্রতীক।

এই মানবিক অভিযানের পেছনে কে?

গাজার অবরোধ ভাঙার জন্য ২০১০ সাল থেকে গঠিত আন্দোলন ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশনের অংশ হিসেবে পরিচালিত আন্তর্জাতিক কমিটি টু ব্রেক দ্য গাজা অবরোধ, এই পথে ৩৬টি জাহাজ পাঠিয়েছে। তারা এবারো এই যাত্রার আয়োজন করেছে।

‘ম্যাডলিন’ জাহাজ কখন যাত্রা শুরু করে?

ইতালির সিসিলি দ্বীপের ক্যাটানিয়া বন্দর থেকে ১ জুন, ২০২৫ তারিখে ম্যাডলিন ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে দুই হাজার কিলোমিটারের দীর্ঘ যাত্রা শুরু করে। জাহাজটি এখন মিসরের পানিসীমার কাছে গাজার দিকে সাহসের সাথে এগিয়ে যাচ্ছে।

জাহাজটি কী বহন করছে?

আয়োজকদের মতে, ম্যাডলিন গুরুত্বপূর্ণ সাহায্যের যেসব পণ্য বহন করছে, তার মধ্যে রয়েছে— ওষুধ, ময়দা, চাল, গুঁড়ো দুধ, শিশুর ডায়াপার, নারী স্বাস্থ্যবিধি পণ্য, পানি বিশুদ্ধকরণ সরঞ্জাম, হাঁটার লাঠি এবং শিশুদের জন্য কৃত্রিম অঙ্গ।

আল জাজিরার সাথে এক সাক্ষাৎকারে মানবাধিকার কর্মী ইয়াসমিন আজার জোর দিয়ে বলেন, লক্ষ্য কেবল সাহায্য পৌঁছে দেয়া নয়, বরং গাজার জনগণকে বাঁচানোর পথ খুলে দেয়াও। কমিটির প্রধান জাহের বিরাউই বলেন, ‘জাহাজটি ছোট, কিন্তু এর বার্তা বিশাল; মুক্ত জাতির দায়িত্বের প্রতীক এবং এই অপরাধ বন্ধ করার আহ্বান।’

‘ম্যাডলিনের’ সাথে কারা আছেন?

বিভিন্ন জাতীয়তার ১২ জন সাহসী কর্মী জাহাজে আছেন— সুইডিশ পরিবেশ ও সামাজিক ন্যায়বিচার কর্মী গ্রেটা থানবার্গ, ফরাসি এমপি রিমা হাসান, মিশনটি কভার করছেন আল জাজিরার সংবাদদাতা ওমর ফায়াদ, ফরাসি প্ল্যাটফর্ম ব্লাস্টের প্রতিবেদক ইয়ানিস মোহাম্মদী, ফ্রিডম ফ্লোটিলা মিশনে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ফরাসি কর্মী পাস্কাল মোরিরেস, ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিক এবং ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘদিনের সমর্থক থিয়াগো আভিলা, আহতদের সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত ফরাসি ডাক্তার ব্যাপটিস্ট আন্দ্রে, কুর্দি বংশোদ্ভূত জার্মান কর্মী ইয়াসমিন আজার, ফরাসি জলবায়ু কর্মী রিভা ফিয়ার, তুর্কি কর্মী হোসেইন সোয়ায়েব, সি শেফার্ড সামুদ্রিক সংরক্ষণ সংস্থার স্প্যানিশ সদস্য সার্জিও টোরিবিও এবং নেদারল্যান্ডসের নৌ প্রকৌশলের ছাত্র মার্কো ভ্যান রিনিস।

ম্যাডেলিন কখন পৌঁছাবে গাজায়?

যদি সবকিছু পরিকল্পনা অনুসারে চলে, তাহলে সোমবার জাহাজটি গাজা উপকূল থেকে ১০০ নটিক্যাল মাইল দূরে পৌঁছাবে। ইয়াসমিন আজার ঘোষণা করেছেন যে জাহাজটি মিসরীয় উপকূলের কাছাকাছি চলে এসেছে এবং গাজা অবরোধ সমাপ্ত করার জন্য আন্তর্জাতিক কমিটি আসন্ন সময়গুলোকে ‘মারাত্মক’ বলে অভিহিত করেছে।

ইসরাইলের প্রতিক্রিয়া কী?

ইসরাইল দৃঢ়ভাবে বলে আসছে যে তারা ম্যাডলিনকে গাজায় প্রবেশ করতে দেবে না এবং এমনকি বল প্রয়োগের হুমকিও দিয়েছে, যেমন ২০১০ সালে মাভি মারমারার ওপর ভয়াবহ হামলায় ১০ জন তুর্কি নাগরিক নিহত হয়েছিল।

ইসরাইল ২০২৫ সালের মে মাসে আল-ধামির জাহাজে ড্রোন দিয়ে আক্রমণ করে এবং এখন মিডিয়া রিপোর্ট করছে যে নৌ কমান্ডোরা ম্যাডলিনকে আটক করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

জেরুসালেম পোস্ট জানিয়েছে, সেনাবাহিনী জাহাজটি আটক করতে পারে এবং কর্মীদের গ্রেফতার করতে পারে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে মনে করে। ম্যাডলিন জাহাজের অন্যতম সংগঠক ‘রাশাদ আল-বাজ’ আল-আলম নেটওয়ার্ককে বলেছেন, জাহাজটি ড্রোন হামলার শিকার হয়েছিল, মনে করা হচ্ছে ওই ড্রোন ইসরাইলি ছিল।

তিনি আরো জানান, আক্রমণ সত্ত্বেও ম্যাডলিন গাজার দিকে যাত্রা অব্যাহত রেখেছে এবং কয়েক ঘণ্টা আগে মিসরের পানিসীমায় প্রবেশ করেছে।

ইসরাইল কেন ম্যাডলিনকে ভয় পায়?

১. অপরাধ ফাঁস হবার ভয় : ইসরাইল চায় না বিশ্ব দেখুক যে তারা গাজার জনগণকে কিভাবে মারাত্মক অবরোধের মধ্যে রেখেছে। স্বাধীন ত্রাণসামগ্রীর আগমনের ‘নিরাপত্তা’ সম্পর্কে তাদের মিথ্যা প্রচারণা যেন ফাঁস হয়ে না যায়।

২. প্রচারণার ব্যর্থতা : মানবিক সাহায্য প্রমাণ করে যে গাজায় সাহায্য পৌঁছানোর পথে ইসরাইলই প্রধান বাধা, হামাস নয়। নিরাপত্তার অজুহাতে সরকার শিশু এবং অসুস্থদেরও ওষুধ গ্রহণ থেকে বঞ্চিত করে।

৩. বৈশ্বিক ঐক্যের ভয়: মানবিক আন্দোলনগুলো ইসরাইলি দখলদারিত্ব এবং তাদের গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীকে ঐক্যবদ্ধ করে তুলতে পারে, যেমনটি আমরা বিডিএস প্রচারণায় দেখেছি।

৪. অবৈধ অবরোধ ভাঙা : আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী গাজার ওপর অবরোধ একটি যুদ্ধাপরাধ আর এই জাহাজগুলো অবরোধ ভেঙে ইসরাইলের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

এই যাত্রা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ম্যাডলিন কেবল গুরুত্বপূর্ণ ত্রাণই বহন করছে না বরং নাগরিক প্রতিরোধের প্রতীক এবং গাজা ট্র্যাজেডির ওপর বিশ্বব্যাপী নীরবতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের স্লোগানও বহন করছে। হুমকির ঝড়ের মধ্যে ম্যাডলিন সাহসিকতার সাথে গাজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে; যে যাত্রা মানবিক সংহতির ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করতে পারে।