তেহরানের গ্রান্ড মোসাল্লার ময়দানে ভোর থেকেই জড়ো হতে শুরু করেছিলেন হাজার হাজার মানুষ। ইরানের ছাত্র বার্তা সংস্থা ইসনা শনিবার (৪ জুন) জানিয়েছে, হাতে ইরান আর আঞ্চলিক প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর পতাকা, ইমাম হোসেনের শাহাদতের স্মরণে আবেগময়বার্তা, ফুলের ডাল আর তাদের শহীদ নেতার ছবি। বিদায় আর জানাজার এই দিনে প্রিয় নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন তারা। কান্না, ক্ষোভ, স্লোগান আর নতুন করে নেয়া শপথের এক মহাসমুদ্র যেন তৈরি হয়েছিল সেখানে। শোকার্ত মানুষগুলো তাদের নিজেদের ভাষায় প্রকাশ করছিলেন কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা আর লড়াইয়ের পথ ধরে রাখার অঙ্গীকার।
ইসনার প্রতিনিধিরা এই বিদায় অনুষ্ঠানে আসা সাধারণ মানুষের কাছে তিনটি প্রশ্ন রেখেছিলেন। আজ যদি শহীদ নেতার সাথে কথা বলার সুযোগ পেতে তবে কী বলতে? ইমাম খোমেনী আর তার সবচেয়ে বড় অবদান বা ঐতিহ্য কী বলে মনে করো? আর আজ এই বিদায়যাত্রায় এসে তোমার কেমন লাগছে? মানুষের সেই মনের কথাগুলোই উঠে এসেছে তাদের মুখে।
শহীদ নেতা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সাধারণ মানুষের সাথেই ছিলেন
শহীদ নেতা ও সর্বোচ্চ নেতার ছবি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণী ২১ মার্চের ঘটনা মনে করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘সারা দুনিয়ার কাছে আজ এটা প্রমাণ হয়ে গেছে যে আমাদের নেতা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইরান ছেড়ে যাননি, তিনি তার দেশের মানুষের সাথেই দাঁড়িয়েছিলেন। আমরা এর জন্য গর্বিত। আমরা সবসময় বলতাম আমরা নেতার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে পারি, কিন্তু এবার প্রমাণ হলো খোদ নেতাই নিজের জীবন দেশের মানুষের জন্য উৎসর্গ করে গেলেন।’
আজকের বার্তা একটাই, প্রতিরোধ
গলায় স্কার্ফ জড়ানো আর হাতে ‘ইয়া হুসাইন’ লেখা নিশান নিয়ে অশ্রুসজল চোখে এক মধ্যবয়সী ব্যক্তি বললেন, ‘আমাদের বুকটা ফেটে যাচ্ছে। আমরা কখনো ভাবিনি যে কোনোদিন শহীদ নেতার জানাজায় আমাদের আসতে হবে। আমাদের ইচ্ছা ছিল তিনি নিজে আমাদের হাত ইমাম মাহদির হাতে সঁপে দেবেন।’
তিনি বুক কাঁপানো কণ্ঠে জোর দিয়ে বললেন, ‘যারা আমার কথা শুনছেন তাদের সবাইকে আমি বলতে চাই, আমরা আমাদের শহীদ নেতার পথ থেকে এক চুলও নড়ব না। ইসলামের জন্য, মুসলমানদের জন্য আমাদের শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত প্রিয় নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতবা খামেনির পেছনে আমরা ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকব। আজ এই জানাজার বার্তা একটাই, তা হলো প্রতিরোধ, প্রতিরোধ আর প্রতিরোধ।’
আমি এসেছি নতুন করে আমার শপথ নিতে
ইরানের পতাকা আর শহীদ নেতার ছবি বুকে চেপে এক কিশোরী ইসনা প্রতিনিধিকে বললেন, ‘আজ আমি এখানে এসেছি আমার শহীদ নেতার প্রতি নতুন করে শপথ ব্যক্ত করতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরাইল ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত আমি আমার এ পথই অবিচল থাকব।’
আজ আমি এসেছি কেবল কৃতজ্ঞতা জানাতে
হাতে একটি সূর্যমুখী ফুল আর শহীদ নেতার ছবি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক তুরুণী বলেন, ‘আজ আমি শহীদ নেতার প্রতি আমার গভীর কৃতজ্ঞতা আর সমর্থন জানাতে এসেছি। তিনি যখন বেঁচে ছিলেন, আমরা হয়তো তাকে সেভাবে মূল্যায়ন করতে পারিনি যেভাবে করা উচিত ছিল। আজ আমি এখানে এসেছি তার সমস্ত ত্যাগ আর পরিশ্রমের জন্য তাকে একটা ধন্যবাদ দিতে।’
নেতার রক্ত মানুষকে জাগিয়ে তুলেছে
মাথায় হিজাবের বদলে কাফিয়া জড়ানো অন্য এক তরুণী বলেন, ‘আমি খুব আনন্দিত যে আমাদের নেতার রক্ত আমার মতো অনেক ঘুমন্ত মানুষকে জাগিয়ে তুলেছে। আমি সাধারণত কোনো রাজনৈতিক সমাবেশে যাই না, কিন্তু এখন আমার মনে হচ্ছে দেশের জন্য আমার যা কিছু করার আছে তা করা উচিত, নিজের ভূমিকা রাখা উচিত।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমি আশা করি আমাদের নেতার রক্ত কখনো বৃথা যাবে না এবং তা পৃথিবীর সব স্বাধীনতাকামী মানুষকে জাগিয়ে তুলবে। নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করার একমাত্র উপায় হলো শক্ত হয়ে দাঁড়ানো, কোনো ভয় না পাওয়া। আমাদের নেতার প্রতি আমার একটাই কথা, আপনি শান্তিতে ঘুমান; আমরা জেগে উঠেছি এবং আমরা আপনার পথেই চলব।’
এই পতাকা মাটিতে পড়তে দেয়া যাবে না
হাতে ইরানের পতাকার ব্রেসলেট পরা আশির দশকের এক যুবতী বলল, ‘আমাদের নেতা সাইয়্যেদ আলী খামেনির শাহাদতে আমি আগা মুজতবার প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। আমি আশা করি নেতার এই রক্ত কখনো কেউ ভুলে যাবে না। আজ আমরা দুনিয়াকে প্রমাণ করতে এসেছি যে ইরানের জনগণ এই পতাকার পেছনে আছে এবং সবসময় থাকবে।’
তিনি আরো যোগ করেন, ‘আমি আনন্দিত যে এই জানাজায় অংশ নিয়ে আমার নেতাকে বিদায় জানাতে পেরেছি। শহীদ নেতার আসল ঐতিহ্য হলো তার পথ সচল থাকা। এই ঝাণ্ডা সবসময় উঁচু করে রাখতে হবে এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র ও তার নেতাকে সারাবিশ্বের মুসলমানদের জন্য একটা আদর্শ হয়ে টিকে থাকতে হবে।’
আমার বুকটা একই সাথে ভাঙছে আবার ভরে উঠছে
জনতার ভিড়ে দাঁড়িয়ে চোখ মুছতে মুছতে এক মধ্যবয়সী মা বললেন, ‘একজন মায়ের মনে আজ যেমন অনুভূতি হয়, আমারো ঠিক তেমন হচ্ছে—আমি একই সাথে কাঁদছি আবার হাসছি। কাঁদছি এমন একজন মানুষকে হারানোর জন্য যিনি সারাজীবন আমাদের বাবার মতো আগলে রেখেছিলেন, আর হাসছি এটা দেখে যে মানুষ তাকে বিদায় জানাতে এভাবে দলে দলে একসাথে ছুটে এসেছে।’
কান্না চেপে তিনি বললেন, ‘আমরা আমাদের শহীদ নেতার কাছে চিরঋণী এবং আমরা তাকে এখনো ভীষণ ভালোবাসি। আমি আশা করি তার সন্তান যেন তার বাবার এই পথ খুব সুন্দরভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। আমাদের জন্য শহীদ ইমামের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো আমাদের এই ঐক্য। আমি বিপ্লবের আগের আমলও দেখেছি, আজকের দিনটাও দেখছি; আমাদের মধ্যে মতের অমিল থাকতে পারে, কিন্তু আজকের এই উপস্থিতি প্রমাণ করেছে যে কোনো বিপর্যয় বা বিশৃঙ্খলার মাঝেও ইরানের মানুষ সবাই একসাথে দাঁড়িয়ে আছে।’
ইসনার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের চোখের পানি, উড্ডীয়মান ঝাণ্ডা, শহীদ নেতার ছবি আর স্লোগানের মাঝে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, তা হলো ইরানের প্রতি আনুগত্য, কৃতজ্ঞতা আর এই লড়াইয়ের পথ ধরে রাখার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা। তরুণ-কিশোর থেকে শুরু করে মা আর বৃদ্ধ—সব প্রজন্মের এবং সব মতের মানুষ আজ এই বিদায়কে কোনো পথের শেষ হিসেবে দেখছেন না। বরং তারা মনে করছেন, এটি ঐক্য ও প্রতিরোধ টিকিয়ে রাখার এক নতুন দায়িত্বের শুরু মাত্র। যে পথ শাহাদতের পরেও কখনো ফুরিয়ে যাওয়ার নয়।



