ইরানের তেলবাহী ট্যাঙ্কারে মার্কিন হামলা, কঠোর প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি তেহরানের

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা শুরুর পর সর্বশেষ এই সংঘাতের ঘটনা ঘটল। ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধ এখন অচলাবস্থার মধ্যে রয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে ইরান নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর পাল্টা অবরোধ আরো জোরদার করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা |ফাইল ছবি

মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টার জবাবে শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) ইরানের তিনটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার ধ্বংস করার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে, এর পাল্টা জবাব হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলার দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা শুরুর পর সর্বশেষ এই সংঘাতের ঘটনা ঘটল। ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধ এখন অচলাবস্থার মধ্যে রয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে ইরান নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর পাল্টা অবরোধ আরো জোরদার করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলতেও উদ্যোগ নিয়েছে ওয়াশিংটন। ইরানের সাথে আর্থিকভাবে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দেশটিকে নতি স্বীকারে বাধ্য করার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) শনিবার সকালে জানায়, তারা ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা চালিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরানের সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী এই শাখা মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা করেছিল, তবে তা ব্যর্থ হয়েছে।

সেন্টকম জানায়, খার্গ দ্বীপের উপকূলে এমটি ডাউনি এবং জাস্কের কাছে এমটি স্টার্ক-১ নামের দু’টি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজকে এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে যে সেগুলো আর ব্যবহার করা সম্ভব নয়।

এছাড়া ওমান উপসাগরে এমটি কাইলো নামের একটি খালি তেলবাহী জাহাজও পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানায় সেন্টকম। জাহাজটির কর্মীদের সেটি পরিত্যাগ করার নির্দেশ দেয়ার পর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলা চালিয়ে সেটিকে অচল করে দেয়া হয়।

সেন্টকম প্রকাশিত ভিডিওতে জাহাজগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর বড় বড় আগুনের গোলা ও ধোঁয়া দেখা গেছে।

সেন্টকমের দাবি, তিনটি জাহাজই ‘বহু বিলিয়ন ডলারের একটি গোপন নেটওয়ার্কের’ অংশ ছিল, যার মাধ্যমে আইআরজিসি এবং ইরানের আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর জন্য অর্থের জোগান দেয়া হতো।

হামলার পর সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেন, ‘আপনারা যদি আমাদের দু’টি জাহাজে হামলা করেন, তাহলে আমরা আপনাদের তিনটি জাহাজ ধ্বংস করে আরো বড় অর্থনৈতিক মূল্য চাপিয়ে দেবো।’

ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তাসংস্থা আইআরএনএ-তে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে রেভল্যুশনারি গার্ড জানিয়েছে, তাদের বিমানবাহিনী বেশ কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ও একটি ডেস্ট্রয়ারে হামলা চালিয়েছে।

ইরানের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ওই দু’টি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে পিছু হটতে হয়েছে। তবে সেন্টকম বলেছে, জাহাজ দু’টি সফলভাবে ইরানের হামলা এড়িয়ে গেছে।

লাইফবোটে তীরে নেয়া হয় নাবিকদের
মার্কিন হামলার পর আইআরজিসি জানায়, তাদের নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালীর অনুমোদনহীন পথে চলাচলকারী তিনটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার এবং অন্যান্য এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সংশ্লিষ্ট তিনটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে।

এ সময় অন্য জাহাজগুলোকে অনুমোদনহীন পথে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম না করার সতর্কবার্তা দেয় আইআরজিসি।

আইআরজিসির এই দাবির বিষয়ে এএফপির প্রশ্নের তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেয়নি সেন্টকম। হরমুজ প্রণালীতে বেসামরিক তেলবাহী জাহাজে হামলার বিষয়ে ব্রিটিশ নৌ নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

এর আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তেলবাহী ট্যাঙ্কারে মার্কিন হামলার নিন্দা জানিয়ে একে ‘অবৈধ ও আগ্রাসী কর্মকাণ্ড’ বলে আখ্যা দিয়েছে।

দক্ষিণ ইরানের হরমোজগান প্রদেশের জাস্ক থেকে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক প্রতিবেদক জানান, হামলার শিকার একটি ট্যাঙ্কার খালি ছিল এবং অন্যটিতে তেল ছিল। লাইফবোটে করে জাহাজগুলোর নাবিকদের তীরে নিয়ে যাওয়া হয়।

খার্গ দ্বীপ থেকে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের আরেক প্রতিবেদক জানান, সেখানে চালানো হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

ইরানের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড খাতাম-আল-আনবিয়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা অব্যাহত রাখলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের বিরুদ্ধে তেহরানের পাল্টা হামলা আগের চেয়ে আরো ভয়াবহ হবে এবং এর পরিধি আরো বাড়তে পারে।

ট্রাম্পের কাছে ইরান যুদ্ধ ‘ছোটখাটো বিষয়’
ছয় মাস ধরে চলা এই সংঘাতের গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধটির জনপ্রিয়তা ক্রমেই কমছে এবং সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন হওয়ায় বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এমনকি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, তিনি এই সংঘাতকে ‘যুদ্ধ’ বলবেন না।

শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ভ্যান্সের মন্তব্যের সমর্থন করে ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘ছোটখাটো বিষয়’ বলে মন্তব্য করেন।

অন্যদিকে, ইরানের নিরাপত্তা প্রধান মোহসেন রেজাই চলতি সপ্তাহে সতর্ক করে বলেছেন, ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরান ‘নতুন কৌশল’ গ্রহণ করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ভিত্তি নড়িয়ে দেবে।

হরমুজ প্রণালী নিয়ে উত্তেজনা
হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের অবরোধের কারণে তেহরানের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।

জুলাই মাসে কৌশলগত এই পানিপথে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার পর একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প বারবার হরমুজ প্রণালীর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার হুমকি দিয়েছেন। এমনকি তিনি একটি মানচিত্র প্রকাশ করেন, যেখানে প্রণালীটিকে ‘নতুন মার্কিন ভূখণ্ড’ হিসেবে দেখানো হয়।

ভ্যান্সও বলেছেন, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ না করা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাথে নতুন করে আলোচনা শুরু করবে না।

তবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় প্রশাসন এখন এমন বার্তা দেয়ার চেষ্টা করছে যে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল সরবরাহ যুদ্ধের আগের পর্যায়ে ফিরে আসছে।

বৃহস্পতিবার ভ্যান্স বলেন, ‘হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ কার্যত শেষ হয়ে গেছে।’

সামরিক চাপের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ
সর্বশেষ সংঘাত শুরু হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযানের বদলে ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছিল বলে মনে করা হচ্ছিল।

শুক্রবার মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় একটি তুর্কি ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ব্যাংকটির বিরুদ্ধে আইআরজিসির সাথে সম্পর্ক থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। এর আগে গত সপ্তাহে একটি বড় মিসরীয় ব্যাংকের সংযুক্ত আরব আমিরাতের কার্যক্রমকে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার পদক্ষেপ নেয় ওয়াশিংটন।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের ওপর ‘অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ’ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। একইসাথে তিনি সতর্ক করেছেন, যারা যুক্তরাষ্ট্রের এই চাপ প্রয়োগের অভিযানে অংশ নেবে না, তাদের জন্যও গুরুতর পরিণতি হতে পারে।

সূত্র : বাসস