বিশ্ব ইন্টারনেটের নতুন 'হরমুজ প্রণালী' বাব-এল-মান্দেব

সমুদ্রের তলার এসব ক্যাবল কোনো কারণে হঠাৎ কেটে গেলে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যকার ৯০ শতাংশের বেশি তথ্য আদান-প্রদান সাথে সাথে বন্ধ বা ব্যাহত হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেন ও ক্লাউড সেবায় বড় ধরনের ধস নামবে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
এআইদিয়ে আঁকা প্রতীকী ছবি
এআইদিয়ে আঁকা প্রতীকী ছবি |সংগৃহীত

ইন্টারনেটে আমরা যেসব তথ্য বা বার্তা আদান-প্রদান করি, তার একটা বড় অংশ সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়। এই যাত্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হলো বাব-এল-মান্দেব প্রণালী। ইয়েমেন ও জিবুতির মাঝখানে অবস্থিত প্রায় ২৬ কিলোমিটার চওড়া এই সরু পথটি কেবল পণ্যবাহী জাহাজের জন্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ টিকিয়ে রাখার শাহ রগ বা মূল ধমনী হিসেবে কাজ করে।

এশিয়া, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানে এই প্রণালী কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে আসা ফাইবার-অপটিক ক্যাবলগুলো এই পথেই বিস্তৃত।

কেন বাব-এল-মান্দেব এতো গুরুত্বপূর্ণ?

লোহিত সাগর, এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরকে এক সুতোয় গেঁথেছে বাব-এল-মান্দেব। ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বড় অংশের সাবমেরিন ক্যাবলগুলো এই প্রণালী পার হয়ে সুয়েজ খাল হয়ে ভূমধ্যসাগরে পৌঁছায়।

বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, এই প্রণালী দিয়ে অন্তত ১৭টি সাবমেরিন ক্যাবল গেছে। এগুলো গোটা বিশ্বের মোট ইন্টারনেট ডাটার প্রায় ১৭ শতাংশ এবং ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যকার যোগাযোগের ৯০ শতাংশের বেশি পরিবহন করে।

তবে কেবল তথ্য পাঠানোই শেষ কথা নয়। এক জায়গায় বহু আন্তর্জাতিক ক্যাবলের উপস্থিতি থাকায় সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরে রয়েছে এই পথ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা গেছে, তথ্য সংগ্রহের জন্য সাবমেরিন ক্যাবলগুলোকে মূল লক্ষ্য বানানো হয়েছিল। এতে এই রাস্তার কৌশলগত গুরুত্ব আরো বেড়ে গেছে।

বাব-এল-মান্দেব দিয়ে যাওয়া প্রধান ক্যাবলসমূহ

এই পথের সবচেয়ে পুরনো সক্রিয় সংযোগ হলো 'সি-মি-উই ৩'। মিসর ও লোহিত সাগর হয়ে এটি ইউরোপকে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে যুক্ত করেছে। বহু টেলিকম প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে চালুর পর পুরনো হলেও এটি এখনো ডাটা বহন করে চলেছে।

অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ হলো 'সি-মি-উই ৪'। ফ্রান্স থেকে শুরু হয়ে মিসর ও বাব-এল-মান্দেব হয়ে এটি মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পৌঁছেছে। ফ্রান্সের অরেঞ্জ, টেলিকম ইজিপ্ট ও ভারতের টাটা কমিউনিকেশন্সের মতো প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক জোট এটি পরিচালনা করে।

নতুন প্রজন্মের 'সি-মি-উই ৫' ক্যাবলটি ফ্রান্স থেকে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রতি সেকেন্ডে ২৪ টেরাবিট তথ্য পরিবহনের ক্ষমতা থাকা এই সংযোগটি ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার ইন্টারনেট যোগাযোগের মূল শক্তি।

আন্তর্জাতিক সংযোগগুলোর মধ্যে 'এএই-১' অত্যন্ত শক্তিশালী। এই ক্যাবল পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, বাব-এল-মান্দেব ও মিসর হয়ে ইউরোপে গেছে। ৪০ টেরাবিটের বেশি ক্ষমতা সম্পন্ন এই ক্যাবল এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অধীনে রয়েছে।

ভারত থেকে শুরু হয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, বাব-এল-মান্দেব ও মিসর হয়ে ইউরোপে গেছে 'আইএমইডব্লিউই' ক্যাবল ব্যবস্থা। এটি তৈরি করেছে ফ্রান্সের অরেঞ্জ, টেলিকম ইজিপ্ট ও টাটা কমিউনিকেশনস।

যুক্তরাজ্য ও ইউরোপকে ভূমধ্যসাগর, মিসর, বাব-এল-মান্দেব ও আরব সাগর হয়ে ভারতের সাথে যুক্ত করেছে 'ইউরোপ ইন্ডিয়া গেটওয়ে'। ভোডাফোন, ভারতী এয়ারটেল ও টেলিকম ইজিপ্ট এর প্রধান অংশীদার।

পুরনো ও বড় ফাইবার-অপটিক নেটওয়ার্কের অন্যতম 'ফ্ল্যাগ ইউরোপ-এশিয়া'। ইউরোপ থেকে শুরু হয়ে মিসর, বাব-এল-মান্দেব, পারস্য উপসাগর ও ভারত মহাসাগর হয়ে এটি পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত গেছে। ভারতের গ্লোবাল ক্লাউড এক্সচেঞ্জ এখন এটি দেখভাল করে।

পারস্য উপসাগরের উপকূলীয় দেশগুলোকে লোহিত সাগর ও মিসর হয়ে ইউরোপের সাথে যুক্ত করেছে 'ফ্যালকন' নামের একটি আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক। আরব দেশগুলোর আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই ক্যাবল বেশ বড় ভূমিকা রাখে।

একদম নতুন আন্তঃমহাদেশীয় ক্যাবলগুলোর একটি হলো 'পিস'। চীন ও পাকিস্তানকে বাব-এল-মান্দেব ও মিসর হয়ে ইউরোপের সাথে জোড়ে এই ব্যবস্থা। প্রতি সেকেন্ডে ৯০ টেরাবিটের বেশি সক্ষমতার এই ক্যাবল এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের মধ্যে বাড়তে থাকা তথ্যের চাহিদা মেটাতে তৈরি করা হয়েছে।

পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে বাব-এল-মান্দেব, লোহিত সাগর ও মিসর হয়ে ইউরোপের সাথে যুক্ত করেছে 'সিকম'। এই নেটওয়ার্কটি পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য অন্যতম প্রধান ইন্টারনেট যোগাযোগ পথ।

ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যকে যুক্ত করা বিশ্বের অন্যতম বড় সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্প হলো 'টু-আফ্রিকা'। লোহিত সাগর ও বাব-এল-মান্দেব পার হয়ে মিসর দিয়ে ভূমধ্যসাগরে পৌঁছানো এই প্রকল্পের নকশায় সক্ষমতা প্রতি সেকেন্ডে ১৮০ টেরাবিট দেখানো হয়েছে। মেটা, অরেঞ্জ, ভোডাফোন, চীন মোবাইল, টেলিকম ইজিপ্ট, এমটিএন গ্লোবালকানেক্ট ও দক্ষিণ আফ্রিকার ডব্লিউআইওসিসি-র মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে এই বিশাল আন্তঃমহাদেশীয় নেটওয়ার্ক বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

বিচ্ছিন্ন হলে কী ঘটবে?

সমুদ্রের তলার এসব ক্যাবল কোনো কারণে হঠাৎ কেটে গেলে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যকার ৯০ শতাংশের বেশি তথ্য আদান-প্রদান সাথে সাথে বন্ধ বা ব্যাহত হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেন ও ক্লাউড সেবায় বড় ধরনের ধস নামবে।

আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনার কারণে এই সরু প্রণালীর নিরাপত্তা ঝুঁকি এখন আর কেবল সম্ভাবনার কথা নয়। বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলে অপ্রত্যক্ষভাবে সমুদ্রের তলার কাঠামোর ক্ষতি হতে পারে। যেমন ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ নোঙর টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় ক্যাবল ছিঁড়ে যেতে পারে, কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে মেরামতের দায়িত্বে নিয়োজিত জাহাজ পাঠানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

হরমুজ প্রণালী বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য স্পর্শকাতর। ইন্টারনেটের যোগাযোগের জন্য ঠিক তেমনি বাব-এল-মান্দেব প্রণালীও স্পর্শকাতর। এখানে কোনো বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে তা মুহূর্তেই পুরো পৃথিবীর ডিজিটাল নেটওয়ার্ককে পক্ষঘাতগ্রস্থ করে তুলতে পারে।

সূত্র: ওয়ানা