আকাশের চোখ অন্ধ, যুদ্ধ ঢুকল ঘরে : রাডার ভাঙার পর পাল্টে গেল সমীকরণ

সবচেয়ে বড় ঘটনা হিসেবে তারা উল্লেখ করেন মার্কিন এফপি-১৩২ রাডার ধ্বংসের দাবি। পাঁচ হাজার কিলোমিটার পাল্লা, চারদিক জুড়ে নজরদারির ক্ষমতা- এই রাডারকে ধরা হতো আকাশ প্রতিরক্ষার ভরসা। সেটি নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সৈয়দ মূসা রেজা
সংগৃহীত

ইরান বলছে, তারা শুধু দূর থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েনি, ইসরাইলের ভেতর থেকেও অভিযান চালিয়েছে। এই দ্বিমুখী চাপেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বলয়ে ফাঁক তৈরি হয়েছে।

এই দাবি করা হয়েছে ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সির এক ভিডিও আলোচনায়। সংস্থাটির হিব্রু বিভাগের পরিচালক সোহেইল কাথিরিনেজাদ ও সামরিক-নিরাপত্তা বিশ্লেষক সাইয়্যেদ মোহাম্মদ তাহেরি বলেন, যুদ্ধের প্রথমেই গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত রাডারগুলোকে নিশানা করা হয়।

তাদের কথায়, শুরুতেই প্রতিপক্ষের ‘চোখ’ অন্ধ করে দিলে আকাশ প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়তে সময় লাগে না।

সবচেয়ে বড় ঘটনা হিসেবে তারা উল্লেখ করেন মার্কিন এফপি-১৩২ রাডার ধ্বংসের দাবি। পাঁচ হাজার কিলোমিটার পাল্লা, চারদিক জুড়ে নজরদারির ক্ষমতা- এই রাডারকে ধরা হতো আকাশ প্রতিরক্ষার ভরসা। সেটি নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এরপর দ্বিতীয় দিনে সংযুক্ত আরব আমিরাতে মোতায়েন থাকা টিপিওয়াই-২ রাডারেও হামলার কথা তুলে ধরা হয়। এই রাডার মূলত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত এবং প্রতিহত করার কাজে ব্যবহৃত হয়।

ইরানের দাবি, ইসলামী বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী বা আইআরজিসি আগেই সামরিকমহড়ায় এমন রাডার ধ্বংসের অনুশীলন করেছে।

এখানেই আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ‘সিকার’। সিকার মানে হলো ক্ষেপণাস্ত্রের ভেতরে থাকা লক্ষ্য-অনুসরণ যন্ত্র।

সহজ করে বললে, এটি ক্ষেপণাস্ত্রের চোখ এবং কান। রাডার যখন তরঙ্গ ছড়ায়, সেই তরঙ্গই তার অবস্থান জানান দেয়। রাডার তরঙ্গ অনুসরণকারী সিকার সেই সঙ্কেত ধরে উৎসের দিকে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ ক্ষেপণাস্ত্রকে আলাদা করে নির্দেশনা দিতে হয় না; সে নিজেই রাডারের সিগন্যাল ধরে লক্ষ্যবস্তুতে গিয়ে আঘাত হানে। তাসনিমের আলোচনায় বলা হয়, এই প্রযুক্তির কারণেই সরাসরি রাডারকে লক্ষ্য করে আঘাত হানা সম্ভব হয়েছে।

আলোচনায় আরো বলা হয়, আগের সঙ্ঘাতে ইসরাইল ‘ইনসাইডার স্ট্রাইক’, অর্থাৎ ভেতর থেকে আঘাতের কৌশল বা বিভীষণ বাহিনী- ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছিল। ড্রোন বা অভ্যন্তরীণ এজেন্ট দিয়ে হামলা চালানো ছিল ইরানের দুশমনদের বড় কৌশল। কিন্তু এবারের যুদ্ধে সেই ধারা কমেছে বলেই দাবি তেহরানের। বরং সমীকরণ কিছুটা উল্টা হয়েছে।

কিছুকিছু ইসরাইলি গণমাধ্যমেও সম্প্রতি এমন ইঙ্গিত দিয়েছে যে ইসরাইলের ভেতর থেকেই ইরান অভিযান চালাচ্ছে। যদিও এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি, তবুও দু’পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট- যুদ্ধ এখন শুধু সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই, ভেতরেও ছড়িয়ে পড়েছে।

শুরুতে যে আঘাত পড়েছিল রাডারের ওপর, সেটিই ছিল দরজা খোলার শব্দ। আকাশে নজরদারির চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হলে মাটির লড়াইও বদলে যায়। বাইরে থেকে ক্ষেপণাস্ত্র, ভেতর থেকে অভিযান- এই দুই দিকের চাপের কথাই বলছে ইরান। যুদ্ধের গল্প তাই শুরু হয়েছিল আকাশের চোখ অন্ধ করে, আর শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়িয়েছে ভেতরের অদৃশ্য লড়াইয়ে।