আসিম মুনিরের মধ্যস্থতা: রণক্ষেত্র ছেড়ে ইরানি জেনারেলরা কি ফিরবেন আলোচনার টেবিলে?

নয়া দিগন্ত অনলাইন
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির ও ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও শীর্ষ সমন্বয়কারী মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির ও ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও শীর্ষ সমন্বয়কারী মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ |আল জাজিরা

ছয় মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে শুধু বারুদের গন্ধ। একদিকে মার্কিন আগ্রাসন আর ইসরাইলি তোষণনীতি, অন্যদিকে ইরানের প্রতিরোধ। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনার অচলাবস্থা কাটাতে এবার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ অনুরোধে সোমবার তিনি ইরানের রাজধানী তেহরানে দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে একাধিক বৈঠক করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, ওয়াশিংটনের লাগাতার হুমকি আর ইসরাইলের আগ্রাসী মনোভাবের মুখে ইরানি সিপাহি পাসদারান বা ইসলামী বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী সংক্ষেপে আইআরজিসি এবং সামরিক নেতৃত্বকে আবার আলোচনার টেবিলে ফেরাতে পারবেন কি পাকিস্তানের এই প্রভাবশালী সেনাপ্রধান?

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট, ২০২৬) এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই কূটনীতির নানা জটিল দিক তুলে ধরেছে। তেহরানে আসিম মুনির এক ব্যস্ত দিন পার করেন। তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার ও শীর্ষ সমন্বয়কারী মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব জেনারেল মহসিন রেজায়ির সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন।

কূটনীতি বনাম সামরিক বাস্তবতার ব্যবধান

ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সামরিক কৌশলে স্পষ্ট বিভাজন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তেহরানের বেসামরিক প্রশাসন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনৈতিক সমঝোতার পক্ষে থাকলেও, সেনাপোশাক পরিহিত জেনারেলরা ওয়াশিংটনকে বিশ্বাস করতে নারাজ। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ইরানি চিকিৎসকদের এক সমাবেশে বলেন, 'ইরান এখন শক্তিশালী এবং মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে, তাই এখনই যুদ্ধ শেষ করা শ্রেয়।'

তবে এর ঠিক কয়েক ঘণ্টা পরেই সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব দ্য জেনারেল স্টাফ মেজর-জেনারেল আলী আবদুল্লাহি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ভুল পদক্ষেপের জবাব হবে 'বিপ্লবী, বিধ্বংসী ও চরম অনুতাপমূলক'। এই চরম বাস্তবতায় মুনিরের আসল পরীক্ষা হলো রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি জলপাই পোশাকের জেনারেলদের বোঝানো।

হোয়াইট হাউসের চাপ ও ট্রাম্পের ‘প্রিয়’ ফিল্ড মার্শাল

আসিম মুনিরের এই তেহরান সফরের পেছনে কাজ করেছে ওয়াশিংটনের চাপ। সফরটি এমন এক দিনে অনুষ্ঠিত হয় যখন যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর অধীনে ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধের হুমকি দেয়। অন্যদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ নতুন করে সামরিক হামলার হুমকি দিয়ে রাখেন।

বিশ্লেষকদের মতে, কিছুদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই ফোন করে মুনিরকে অনুরোধ করেছিলেন পাকিস্তানের প্রভাব খাটিয়ে ইরানকে টেবিলে ফেরাতে। এমনকি ট্রাম্প আসিম মুনিরকে তার 'প্রিয় ফিল্ড মার্শাল' হিসেবেও অভিহিত করেছিলেন। রাজনীতিবিদ না হয়ে একজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা হওয়ায়, তেহরানের ক্ষমতাশীল আইআরজিসি এবং ওয়াশিংটন—উভয় পক্ষেই মুনিরের বিশেষ এক ধরণের প্রবেশাধিকার রয়েছে।

ইরানের কঠোর অবস্থান ও আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা

ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর অনুযায়ী, তেহরানের বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট। জেনারেল মহসিন রেজায়ি মুনিরকে সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন, 'আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করি না, তাদের আচরণ পরিবর্তন করতে হবে।' স্পিকার গালিবাফও স্পষ্ট করেন যে, পূর্ববর্তী সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতি যুক্তরাষ্ট্রকেই রক্ষা করতে হবে।

একদিকে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আলবুসাইদি হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু ও যৌথ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে পৃথক আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছেন, অন্যদিকে পাকিস্তান চেষ্টা করছে সামরিক স্তরে বরফ গলাতে। প্রতিরক্ষাবিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক আলোচনা যতই হোক না কেন, আইআরজিসি ও ইরানের প্রতিরক্ষা এস্টাবলিশমেন্ট যদি প্রস্তুত না হয়, তবে কোনো চুক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত এই অসম যুদ্ধের দাবানল থামাতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ইরানি জেনারেলদের যুদ্ধকক্ষ থেকে আলোচনার টেবিলে আনতে পারেন কি না, তার ওপরই নির্ভর করছে পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ।