ফিলিস্তিনি এক মায়ের আশার শেষ আলোটুকুও নিভিয়ে দিলো ইসরাইলি বোমারু বিমান

গত ২০ জুলাই রাতে আল-বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে ফাতেমা নোফালের বাড়িতে বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় শিশু জায়েদকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেয় ইসরাইল।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
১৫ মাস বয়সী ফাতেমার ছোট্ট সোনামণি, জায়েদ।
১৫ মাস বয়সী ফাতেমার ছোট্ট সোনামণি, জায়েদ। |সংগৃহীত

গাজা সিটি, মোটামুটি নিঃশেষিত এক পরিবার

২০২৩ সালে ইসরাইলি বিমান হামলায় নিজের তিন তিনটি সন্তানকে হারান ফাতেমা নোফাল। বুকভাঙা সেই শোকের পর নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন হয়ে আলো ছড়িয়ে এসেছিল কোলের ছোট্ট শিশু জায়েদ নোফাল। কিন্তু গাজার মাটিতে ফাতেমার সেই বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়টুকুকেও টিকতে দিল না ইসরাইল। প্রথমবার তিন সন্তানকে কাড়ার পর, দীর্ঘ পোনে দুই বছর পর আরেকটি ইসরাইলি হামলায় মারা গেল মাত্র ১৫ মাস বয়সী ফাতেমার ছোট্ট সোনামণি, জায়েদ।

শনিবার (১ আগস্ট) মিডলইস্ট আই-এর এক প্রতিবেদনে মধ্য গাজার নির্মম এই ট্র্যাজেডির কথা প্রকাশ করা হয়। গত ২০ জুলাই রাতে আল-বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে ফাতেমা নোফালের বাড়িতে বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় শিশু জায়েদকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেয় ইসরাইল।

বোমার ধুলোয় ধূলিসাৎ আশার আলো

গাজার তীব্র খরতাপ আর অসহ্য ভ্যাপসা গরম থেকে বাঁচাতে ফাতেমা তার ১৫ মাসের বাচ্ছাটিকে খোলা জানালার পাশে শুইয়ে দিয়েছিলেন, যেন একটু বাতাসের ছোঁয়া পায় সে। রাত ৩টার দিকে বিকট শব্দে ইসরাইলি বিমান আঘাত হানে তাদের সাধারণ ঘরে। মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে জায়েদের ছোট্ট কোমল শরীর।

ধুলো আর রক্তে ভেসে যাওয়া ৩৮ বছর বয়সী ফাতেমা নোফাল এই তাণ্ডবের পর স্তব্ধ হয়ে পড়ে থাকেন। ২০২৩ সালে তিন ছেলেকে হারানো এই ফিলিস্তিনি মা এবারও চিৎকার করে প্রতিবেশীদের ডেকে তোলেন। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে হালকা কাঁথায় মোড়ানো রক্তাক্ত জায়েদকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা ততক্ষণে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

মিডলইস্ট আই-কে ফাতেমা নোফাল বলেন, 'আমি এখনও বুঝে উঠতে পারছি না কী ঘটে গেল। চরম একটা মানসিক ধাক্কার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। শুধু মনে আছে, হামলার কয়েক মিনিট আগে প্রচণ্ড গরমের জন্য ফাটল ধরা জানালার পাশে জায়েদকে একটু বাতাসের মধ্যে শুইয়ে দিয়ে নিজে অন্য পাশে সরে গিয়েছিলাম।'

ইসরাইলি হামলায় ফাতেমার নিজের দু'টি পা পুড়ে গেছে। তার দুই মেয়ে—বারা ও লিনা আঘাত পেয়ে বর্তমানে চিকিৎসাধীন। ছোট মেয়ে লিনা মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে হাসপাতালে আছে, যে এখনও জানে না তার প্রিয় ছোট্ট ভাইটি আর কোনোদিন বাড়ি ফিরবে না।

এক অলৌকিক উপহার, যা মিলিয়ে গেল ধোঁয়ায়

২০২৩ সালের ১৩ অক্টোবর ইসরাইলের হামলায় ফাতেমার কোল খালি হয়ে যায়—একসঙ্গে প্রাণ হারায় বড় ছেলে আমিন (১৬), মেজো ছেলে হামজা (১১) এবং মাত্র ২২ দিন বয়সী শিশু আহমেদ। কেবল ফাতেমা ও তার দুই মেয়ে সেই যাত্রায় বেঁচে গিয়েছিলেন।

Gaza's-kid-killed-2

ছেলেহারা এবং দিশেহারা ফাতেমার জীবনে আবার হাসির রেখা ফুটে উঠেছিল ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল, যখন কোল আলো করে জন্ম নেয় জায়েদ। পুরো পরিবার এই নতুন অতিথিকে তাদের জীবনে দুঃখের রাতের পর এক 'অলৌকিক আলো' হিসেবে উদযাপন করেছিল। জায়েদকে ঘিরে বেঁচে থাকার নতুন অর্থ খুঁজে পেয়েছিলেন তারা। কিন্তু এক বছরের মাথায় সেই একমাত্র বেঁচে থাকার আলোটিকেও নিভিয়ে দিল হানাদার ইসরাইল।

যুদ্ধবিরতি: এক নিষ্ঠুর প্রহসন

আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে তথাকথিত যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ইসরাইলি হামলায় গাজায় নতুন করে ১,২০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। যার মধ্যে অন্তত ২৬০ জনই শিশু। জাতিসঙ্ঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)-এর মুখপাত্র জেমস এল্ডার এই পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে একে "এক নিষ্ঠুর ও প্রাণঘাতী ছদ্ম-যুদ্ধবিরতি" বলে অভিহিত করেছেন, যেখানে প্রতিদিন গড়ে অন্তত একটি করে শিশুর প্রাণ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।

সব মিলিয়ে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সামরিক অভিযানে এ পর্যন্ত ৭৩,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরাইলি বাহিনী। জাতিসঙ্ঘের তদন্ত কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে, ইসরাইলি বাহিনী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে—যা সরাসরি গণহত্যা বা জেনোসাইডের অন্তর্ভুক্ত।

ফাতেমা নোফাল কোনো পরিসংখ্যানে নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারছেন না। নিজের আহত মেয়েকে পাশে নিয়ে বুকচাপা কান্নায় তিনি বলেন, 'আমার ছেলেহারা বুকে যে আগুন জ্বলছে, জানি না কে তা নেভাবে।'