হিজবুল্লাহর পুনরুত্থান

ড্রোন আর প্রযুক্তির চালে কোণঠাসা ইসরাইল

তবে এই ১৫ মাসের যুদ্ধবিরতি আর ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেই নিজেদের সামরিক কাঠামো সম্পূর্ণ পুনর্গঠন করেছে তারা।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
হিজবুল্লাহ'র দেয়ালচিত্রের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে বাবা ও ছেলে
হিজবুল্লাহ'র দেয়ালচিত্রের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে বাবা ও ছেলে |সংগৃহীত

পতন ঘটেছে, শক্তি হারিয়েছে—এমন ধরে নিয়ে লেবাননের প্রতিরোধ যোদ্ধা সংগঠন হিজবুল্লাহকে একপ্রকার বাতিলই করে দেওয়া হয়েছিল। তবে সব দিক থেকে আসা শত্রুর তীব্র চাপ সত্ত্বেও আবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে তারা। কীভাবে তা সম্ভব হলো, তারই ভেতরের খবর উঠে এসেছে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ইসরাইলি হামলায় পুরোপুরি ধসে পড়েছিল সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়। নিহত হন প্রধান হাসান নাসরুল্লাহসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা। যোগাযোগের পেজার ও ওয়াকিটকিগুলো বিস্ফোরিত হওয়ার পর বেঁচে থাকা অধিনায়করা ফোন ফেলে মোটরসাইকেলে চেপে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরতলি দাহিয়েহর বিভিন্ন গোপন আস্তানায় জড়ো হন। তারা কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার না করে সরাসরি দেখা করে স্থল হামলা মোকাবিলার পরিকল্পনা তৈরি করেন। সেখান থেকেই মূলত তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই শুরু।

অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে মিডলইস্ট আই বুধবার (৫ আগস্ট) জানায়, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরাইলে হামলা চালানো প্রতিরোধ আন্দোলনটির একটি বড় ভুল ছিল। সিদ্ধান্তটি এককভাবে নাসরুল্লাহর ছিল এবং এতে শীর্ষ পরিষদের আপত্তি ছিল। এরপর ২০২৪ সালে পেজার ও ওয়াকিটকি হামলায় তারা বড় ক্ষতির মুখে পড়ে। পেজার হামলা মূল লক্ষ্য না হলেও, মাঠপর্যায়ে ব্যবহৃত ১৫ হাজার ওয়াকিটকি আগেভাগে বিস্ফোরিত করায় আরও বড় বিপর্যয় এড়ানো গেছে বলে দাবি সূত্রগুলোর।

পরবর্তী ৬৬ দিনের ইসরাইলি অভিযানে নাসরুল্লাহ ও তাঁর সম্ভাব্য উত্তরসূরি হাশেম শফিউদ্দিনসহ সামরিক নেতৃত্ব প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। পুরো একটি অংশ ধ্বংসের মুখে পড়ার পর সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতনে লেবাননের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহ আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপও বাড়তে থাকে তাদের ওপর।

তবে এই ১৫ মাসের যুদ্ধবিরতি আর ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেই নিজেদের সামরিক কাঠামো সম্পূর্ণ পুনর্গঠন করেছে তারা। শহীদ কমান্ডার ইমাদ মুঘনিয়াহর মডেলে ইউনিটগুলোকে কেন্দ্রীয় কমান্ড ছাড়াই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। ফলে কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মারা গেলেও যুদ্ধক্ষেত্রে তার কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না। গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার পর, সংগঠনের নতুন মহাসচিব নাইম কাসেম সীমান্ত অতিক্রম করে রকেট হামলার নির্দেশ দেন।

বর্তমানে সংগঠনটি আগের মতো ভারী রকেটের ওপর নির্ভর না করে আধুনিক প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকেছে। 'ভিডিও গেম' খেলায় অভ্যস্ত স্থানীয় তরুণদের ড্রোন পরিচালনায় কাজে লাগানো হচ্ছে। ফাইবার-অপটিক ক্যাবল যুক্ত এফপিভি ড্রোনের তীব্র আঘাতে দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি সেনারা পুরোপুরি দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এই ড্রোনগুলোর ওপর কোনো সিগন্যাল জ্যামার কাজ করে না।

বর্তমানে গৃহহীন ও বাস্তুচ্যুত সাধারণ মানুষ তীব্র আর্থিক সংকটে ভুগছে। তা সত্ত্বেও ইসরাইলের নির্বিচার আগ্রাসনের কারণে স্থানীয়রা প্রতিরোধ যোদ্ধাদের ওপরই ভরসা রাখছে। ২০২৩ সালের মতো শক্তি বা গালিল দখলের সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন এখন আর না থাকলেও, নাইম কাসেমের নেতৃত্বে নতুন প্রযুক্তি ও গেরিলা কৌশল নিয়ে নিজেদের টিকিয়ে রাখার চূড়ান্ত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে লেবাননের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহ।