গাজায় হামাসকে কেন পরাস্ত করতে পারেনি ইসরাইল

ইসরাইল হামাসকে পুরোপুরি পরাস্ত করতে এখনো বদ্ধপরিকর। তবে বাস্তবতা হলো, তাদের পক্ষে হামাসকে পরাস্ত করা সম্ভব নয়। কারণ...

নয়া দিগন্ত অনলাইন
গাজায় ইসরাইলি বাহিনী
গাজায় ইসরাইলি বাহিনী |সংগৃহীত

ইসরাইল হামাসকে পুরোপুরি পরাস্ত করতে এখনো বদ্ধপরিকর। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরও তারা এমন মনোভাব প্রকাশ করেছে। তবে বাস্তবতা হলো, তাদের পক্ষে হামাসকে পরাস্ত করা সম্ভব নয়। এমনটিই দাবি করেছেন ব্রিটিশ গবেষক আজিম ইবরাহিম। তিনি ওয়াশিংটনের নিউজ লায়েন্স একাডেমির পরিচালক।

এ বিষয়ে দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট ম্যাগাজিনে তিনি একটি নিবন্ধ লিখেছেন। সেখানে তিনি বলেন, হামাসে নতুন করে অন্তত ১৫ হাজার যোদ্ধা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ফলে দলটি আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এদের অধিকাংশ পরিপূর্ণভাবে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। তারা ধ্বংসস্তুপ থেকে উঠে এসেছে উপত্যকায় ইসরাইলি আধিপত্যের কবর দিতে।

তিনি দাবি করেন, হামাস এখন পরাজিত না হয়েই যুদ্ধের পাঠ চুকিয়ে ফেলতে পেরেছে। আর এটা এমনি এমনিই হয়ে যায়নি। বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন যে হামাসকে সামরিকভাবে পরাজিত করা সম্ভব নয়। কারণ, এরা শুধুই একটি যোদ্ধা দল নয়। বরং এটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক পরিসরেও প্রোথিত। ফিলিস্তিনি সমাজের গভীরে এর শেকড় রয়েছে; যা উপড়ানো সম্ভব নয়।

তিনি আরো বলেন, সামরিক অভিযান চালিয়ে সর্বোচ্চ নেতাদের হত্যা করা যাবে, তাদের টানেল ভাঙ্গা যাবে; এমনকি ভূমিও দখল করা যেতে পারে। কিন্তু এই আদর্শকে কিছুতেই উপড়ে ফেলা যাবে না।

ব্রিটিশ এই গবেষক বলেন, ইসরাইল হামাসের বিরুদ্ধে পূর্ণ বিজয়ের যে স্বপ্ন দেখছে, এটি আসলে মরিচিকা। এই যুদ্ধে যদিও হামাসের নেতৃবৃন্দ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কিন্তু তারা এখনো অভিযান চালিয়ে যেতে সক্ষম।

হামাসের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি

ব্রিটিশ গবেষক ইবরাহিম জানান, ইসরাইলের সাম্প্রতিক আগ্রাসনে গাজার নাগরিক কাঠামো বিলীন হয়েছে গেছে। এতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে কয়েক মিলিয়ন। অনেক এলাকা একেবারেই মাটির সাথে মিশে গেছে। তদুপরি যেই প্রেরণা থেকে হামাসের জন্ম, তা এখনো বহাল আছে। বরং উত্তরোত্তর তা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অবশ্য তাদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির ভিন্ন একটি কারণও তিনি নির্দেশ করেছেন। তিনি বলেন, হামাসের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পেছনে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতাও নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। ফাতাহ আন্দোলনের নেতৃত্বাধীন এই কর্তৃপক্ষের দুর্নীতি, ইসরাইলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব, ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা, শান্তি আলোচনায় ব্যর্থতা, অর্থনীতির করুণদশা ও ইসরাইলি অব্যাহত অবৈধ দখলদারিত্ব প্রতিরোধে ব্যর্থতায় ফিলিস্তিনিরা অতিষ্ঠ। ফলে ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছে তারা। এমনকি এদের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না বলেও বিশ্বাস জন্ম নিতে শুরু করেছে ফিলিস্তিনিদের হৃদয়ে। এর বিপরীতে হামাস একটি পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল বিকল্প দিতে পারছে, যেখানে সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত হচ্ছে। একইসাথে শত্রুপক্ষকেও প্রতিরোধ করতে পারছে।

প্রবন্ধে গবেষক দাবি করেন, হামাসের বিরুদ্ধে ইসরাইলি পরিকল্পনা দলটিকে আরো শক্তিশালী করেছে। বিশেষ করে ইসরাইলি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর শাসনামলেই তারা অধিক সুসংহত হয়েছে।

তিনি বলেন, নেতানিয়াহু বেশ কয়েক বছর ধরে ফিলিস্তিনের দুই অংশকে -গাজা ও অধিকৃত পশ্চিমতীর- পারস্পরিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। এতে ফিলিস্তিনি নেতৃবৃন্দের মধ্যে শক্তিশালী ঐক্য গড়ে উঠেছে; যাতে তারা রাজনৈতিক সমতার পথ মসৃণ করে তুলতে পেরেছে।

ইবরাহিম বলেন, নেতানিয়াহুর এই একটি নীতিই তার উপর দীর্ঘমেয়াদে বোমেরাং হয়ে দাঁড়ালো। কারণ, এর মধ্য দিয়ে পশ্চিমতীরে ইসরাইলি দখলদারিত্ব অব্যাহত ছিল। রাজনৈতিক পরিস্থিতিও দিন দিন অবনতির দিকে গেছে। কিন্তু হামাস তার প্রশাসনকে শক্তিশালী করার সুযোগ পেয়েছে এবং গাজায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠারও সুযোগ পেয়েছে। আর এই স্থিতিশীলতাই তাদেরকে তুফানুল আকসার সুযোগ তৈরি করেছে।

মোটকথা, গবেষকের বিশ্বাস, শত শক্তি প্রয়োগ করেও হামাসকে পরাস্ত করা সম্ভব নয়। কারণ, তাদের আদর্শ ফিলিস্তিনিদের মাটি ও মাংসে মিশে গেছে।

সর্বশেষ তিনি বলেন, হামাসকে অস্ত্রের জোরে পরাস্ত করা সম্ভব নয়। বরং ফিলিস্তিনিদেরকে এমন একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প দিতে হবে, যা তাদেরকে একটি স্বতন্ত্র দেশ প্রতিষ্ঠার হাতছানি দেবে।

এর জন্য তিনি প্রস্তাব করেন যে ফিলিস্তিনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় সচল করতে হবে; গাজাকে পুনর্গঠন করতে হবে। একইসাথে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফিলিস্তিনে নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে।

তিনি ইসরাইলকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, ইসরাইলকে বিশ্বাস করতে হবে যে ফিলিস্তিনিদেরকে অবরুদ্ধ করা বা দখলদারিত্ব অব্যাহত রাখাই কোনো সমাধান নয়; বরং পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানই হতে পারে উত্তম পন্থা।

ব্রিটিশ এই গবেষক বলেন, পরিশেষে গাজা যুদ্ধ এই বাস্তবতাই আবার প্রমাণ করল যে শক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষের যোদ্ধাদের পরাজিত করা যায়। কিন্তু তাদের আদর্শকে পরাস্ত করা যায় না।

সূত্র : আল জাজিরা