তেহরানের আকাশে বারুদ : ট্রাম্পের জুয়া আর মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই হামলার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগেও ওয়াশিংটন আর তেহরানের মধ্যে আলোচনার ক্ষীণ এক জানালা খোলা ছিল। বোমা পড়ার সাথে সাথে সেই জানালা কেবল বন্ধই হয়নি, বরং কূটনীতির ভাষাটাই বদলে গেছে।

সৈয়দ মূসা রেজা
তেহরানের আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী
তেহরানের আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী |সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে আগুনের রেখা নতুন কিছু নয়, কিন্তু এবার ডোনাল্ড ট্রাম্প যে সলতেয় আগুন দিলেন, তা পুরো অঞ্চলকে এক ভয়ঙ্কর খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। শনিবার আমেরিকা ও ইসরাইলের যৌথ বাহিনী যেভাবে সরাসরি ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক স্নায়ুকেন্দ্রে আঘাত হেনেছে, তাকে কেবল একটি ‘সামরিক অভিযান’ বললে ভুল হবে; এটি একটি চরম রাজনৈতিক জুয়া। প্রশ্ন উঠেছে- কূটনীতি, আন্তর্জাতিক আইন আর আলোচনার টেবিল কি তবে এখন জাদুঘরের সামগ্রী?

তেহরানের শাসনব্যবস্থা কতটা কঠোর, কিংবা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কতটা অস্বচ্ছ- তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ মানতে দ্বিধা নেই পশ্চিমাদের। রক্তাক্ত গাজার দিকে না তাকিয়েই তারা এমন তর্কে নামেন। এবারে মুশকিল হলো, যখন কোনো পরাশক্তি আন্তর্জাতিক রীতিনীতি আর জাতিসঙ্ঘের তোয়াক্কা না করে সরাসরি ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসন পরিবর্তনের আশায় বোমা ফেলে, তখন সমাধানের চেয়ে জটিলতাই বেশি জন্ম নেয়। ট্রাম্প, নেতানিয়াহু এবং ইরানের সাবেক শাহের ছেলে রেজা পাহলভি। বাংলা লোকগানের সুরে বলতে হয়, তিন পাগলে হইলো দেখা নদেয় এসে, ওরা তোরা কেউ যাসনে ও পাগলের কাছে। আর এ তিনজনেই এক সুরে ইরানের ৯ কোটি মানুষকে রাজপথে নামার ডাক দিয়েছেন। তাদের ধারণা, বাইরের এই প্রবল আঘাতে ইরানের ৪৭ বছরের পুরনো ক্ষমতার কাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।

ইরানে রাহবার হিসেবে পরিচিত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ির শাহাদতে পর রাজধানী তেহরানসহ গোটা ইরানে মানুষ নেমে এসেছে। তবে এ মানুষ নামা ধরন দেখে ওই তিনজনের খুশি হওয়া মতো কিছুই ঘটেনি। তারা নেমে এসেছে শোকের কালো পোশাক পরে প্রিয় রাহবারের শাহাতদের প্রতিশোধ কামনায়। এখানেই ইতিহাস আমাদের অন্য পাঠ দেয়। বাইরের চাপের মুখে ইরান নিজদের ভেদাভেদ ভুলে যায়।

তেহরানের ভেতরের খবর ঠিক তাই বলছে, শোক এখন বদলে যাচ্ছে প্রতিশোধের হুঙ্কারে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সহকারী মোহাম্মদ মোখবার যখন সংবিধানের ১১১ নম্বর অনুচ্ছেদের দোহাই দিয়ে ‘অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব পরিষদ’ গঠনের কথা বলেন, তখন বুঝতে হবে ইরান তাদের সিস্টেম বা রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়তে দিচ্ছে না। বরং মোখবারের ভাষায়, ‘এই অপরাধের এমন জবাব দেয়া হবে যা বিশ্ব মনে রাখবে।’

এটি কেবল আবেগ নয়, এটি একটি স্পষ্ট রণকৌশল। ইরান সম্ভবত সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধে জড়াবে না, কিন্তু তাদের ‘অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার’ বা অসম যুদ্ধের যে সক্ষমতা- প্রক্সি গোষ্ঠী ব্যবহার, সমুদ্রপথে অস্থিরতা তৈরি কিংবা জ্বালানি বাজারে ধাক্কা দেয়া- তা পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে কাঁপিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই হামলার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগেও ওয়াশিংটন আর তেহরানের মধ্যে আলোচনার ক্ষীণ এক জানালা খোলা ছিল। বোমা পড়ার সাথে সাথে সেই জানালা কেবল বন্ধই হয়নি, বরং কূটনীতির ভাষাটাই বদলে গেছে। এখন যুদ্ধের ভাষাটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। যখন অস্ত্রকে আলোচনার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়, তখন পৃথিবী এক অনিয়ন্ত্রিত অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়।

ওয়াশিংটন হয়তো ভেবেছিল ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ করে সব সাফ করে দেবে। কিন্তু আদতে তারা এক ‘প্যান্ডোরার বাক্স’ খুলে দিয়েছে। ভূমধ্যসাগর থেকে হরমুজ প্রণালী পর্যন্ত এখন কেবল যুদ্ধের দামামা। লিবিয়া বা ইরাকের ক্ষত আমরা দেখেছি; সেখানেও শাসন বদলেছিল, কিন্তু শান্তি আসেনি।

আজ মধ্যপ্রাচ্যে যা দরকার তা হলো চূড়ান্ত সংযম এবং আন্তর্জাতিক মহলের মধ্যস্থতা। কারণ, বোতাম টিপে যুদ্ধ শুরু করা সহজ, কিন্তু তার ধ্বংসস্তূপ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।