ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা হোসেইনি খামেনি দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথমবারের মতো জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন। দীর্ঘ এই বার্তায় তিনি একদিকে নিহত নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন, অন্যদিকে চলমান যুদ্ধ, প্রতিশোধ এবং আঞ্চলিক রাজনীতির বিষয়ে বেশকিছু কড়া বার্তা দিয়েছেন।
ভাষণের শুরুতেই তিনি বলেন, বিপ্লবের মহান নেতার মৃত্যুর পর তার আসনে বসা সহজ নয়। খোমেনি ও খামেনির মতো দুই নেতার পর নেতৃত্ব নেয়া বড় দায়িত্ব।
তিনি নিজেকে জনগণের সেবক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এই দায়িত্ব পালন সম্ভব হবে শুধু আল্লাহর সাহায্য ও জনগণের সমর্থন থাকলে।
নতুন নেতা তার বক্তব্যে বিশেষভাবে ইরানের জনগণের ভূমিকার প্রশংসা করেন। সাম্প্রতিক সঙ্কটের সময় দেশ কিছু সময়ের জন্য সর্বাধিনায়কবিহীন ছিল। সেই সময় জনগণের ধৈর্য, উপস্থিতি ও ঐক্য দেশকে স্থিতিশীল রেখেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, দেশের প্রকৃত শক্তি নেতৃত্ব নয়— জনগণ।
ভাষণের একটি বড় অংশ ছিল চলমান যুদ্ধ নিয়ে। তিনি বলেন, বিদেশী শক্তির নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে যে আক্রমণ হয়েছে, তার জবাব দিতে সশস্ত্র বাহিনী শক্ত অবস্থান নিয়েছে। ইরানের যোদ্ধারা শত্রুর পরিকল্পনা ভেঙে দিয়েছে এবং দেশকে বিভক্ত করার যে কল্পনা ছিল তা নস্যাৎ করেছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার চাপ দেয়ার কৌশল অব্যাহত রাখা হবে। একইসাথে শত্রুর দুর্বল জায়গায় নতুন যুদ্ধফ্রন্ট খোলার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
মোজতবা খামেনি তার ভাষণে প্রতিরোধ ফ্রন্টের দেশ ও সংগঠনগুলোর প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান। ইয়েমেন, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকার প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, এই ঐক্যই শেষ পর্যন্ত জায়নবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামকে এগিয়ে নেবে। শহীদদের প্রসঙ্গেও কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন নতুন নেতা।
তিনি বলেন, শুধু বিপ্লবের প্রধান নেতার হত্যাকাণ্ড নয়, যুদ্ধে নিহত প্রতিটি ইরানি নাগরিকের রক্তের হিসাব নেয়া হবে। কিছু প্রতিশোধ ইতোমধ্যে নেয়া হয়েছে, তবে তা সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত এই বিষয় রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকবে।
বিশেষ করে শিশুদের ওপর হামলার ঘটনাকে তিনি গুরুতর অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেন। যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের কথাও তুলে ধরেন তিনি। আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসা, ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা এবং শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।
একইসাথে তিনি বলেন, ইরান শত্রুর কাছ থেকেও ক্ষতিপূরণ দাবি করবে। তা না হলে সমপরিমাণ সম্পদের ক্ষতি করে প্রতিশোধ নেয়া হবে।
ভাষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল প্রতিবেশী দেশগুলোর উদ্দেশে সতর্কবার্তা। মোজতবা খামেনি বলেন, ইরানের ১৫টি প্রতিবেশী দেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় তেহরান। তবে কিছু দেশে শত্রুপক্ষ সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে এবং সাম্প্রতিক হামলায় সেই ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। তাই ইরান ওই ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে নয়। ভবিষ্যতেও এমন পরিস্থিতি হলে একই ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে তিনি জানান।
সবশেষে তিনি ইরানের জনগণকে ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানান। সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজন এড়িয়ে একে অপরের পাশে দাঁড়াতে বলেন। তার ভাষায়, জনগণের ঐক্য, ধৈর্য এবং ঈমান থাকলে ইরানের সামনে আবারো গৌরবের দিন ফিরে আসবে।
মোজতবা খামেনির এই প্রথম ভাষণকে বিশ্লেষকেরা দেখছেন একটি রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা হিসেবে— যেখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে যুদ্ধের চাপের মধ্যেও ইরান পিছু হটবে না, বরং প্রতিরোধ ও প্রতিশোধের নীতিই সামনে থাকবে।



