মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যখন প্রথম বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেল, তখন অনেকেরই মনে হয়েছিল যুদ্ধের সমীকরণ খুব দ্রুত একদিকে ঝুঁকে পড়েছে। শক্তিশালী নির্ভুল হামলা, কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডারের মৃত্যু- সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল আঘাতটা এতটাই বড় যে তেহরানের সামরিক কাঠামো হয়তো ভেঙে পড়বে। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দেখা গেল ছবিটা অন্য রকম। যুদ্ধটা শুধু পাল্টা আঘাতের লড়াই নয়, বরং কৌশলের লড়াই হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে প্রভাবশালী সাময়িকী ফরেন অ্যাফেয়ার্স-এর একটি বিশদ বিশ্লেষণ বলছে, ইরান আসলে যুদ্ধের পুরো কাঠামো বদলে দেয়ার চেষ্টা করছে এবং সেই কারণেই যুদ্ধ দীর্ঘ হলে তাতে তেহরানের লাভ হতে পারে।
ইরানের তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সির বরাতে ওই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযান- যার নাম দেয়া হয়েছিল ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’; শুরুর দিকে বড় সামরিক সাফল্য হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছিল। শক্তিশালী নির্ভুল আঘাতে ইরানের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের পরিকল্পনা ছিল স্পষ্ট- এই হামলায় ইরানের সামরিক কমান্ড কাঠামো ভেঙে পড়বে এবং দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থাও চাপে পড়ে যাবে।
কিন্তু কয়েক ঘণ্টা যেতে না যেতেই পরিস্থিতি বদলে যায়। ইরান শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ে দেয় ইসরাইলের দিকে। একইসাথে পারস্য উপসাগরের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুকেও আঘাত করা হয়। এতে স্পষ্ট হয়ে যায়, ইরানের কমান্ড কাঠামো ভেঙে পড়েনি, বরং অল্প সময়ের মধ্যেই তারা বড় আকারের সামরিক অভিযান সংগঠিত করতে পারে।
ফরেন অ্যাফেয়ার্সের বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্রুত প্রতিক্রিয়া একটি পরিষ্কার বার্তা দেয় যে তেহরান এখনো যুদ্ধ পরিচালনা, সমন্বয় এবং বড় আকারের আক্রমণ চালানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
যুদ্ধের নতুন কৌশল: ‘হরাইজন্টাল এসকেলেশন’
এই প্রতিক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ফরেন অ্যাফেয়ার্স একটি গুরুত্বপূর্ণ রণকৌশলের কথা বলেছে। সেটি হলো ‘হরাইজন্টাল এসকেলেশন’- বাংলায় বলতে গেলে, যুদ্ধকে এক জায়গায় আরো তীব্র করার বদলে রণ-পরিসরকে নতুন নতুন ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ছড়িয়ে দেয়া। এই কৌশল অনুযায়ী তেহরান যুদ্ধের ময়দানকে শুধু নিজের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ রাখেনি। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান অন্তত নয়টি দেশে এমন লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করেছে বা আঘাতের আওতায় এনেছে, যেসব দেশের অনেকগুলোতেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
বার্তাটা ছিল স্পষ্ট যে দেশগুলো তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন সেনা রাখবে, তারা এই সংঘাতের বাইরে থাকবে না। এই অবস্থায় যুদ্ধ দ্রুতই একটি আঞ্চলিক সঙ্কটে পরিণত হয়। পারস্য উপসাগরের দেশগুলো এক অদ্ভুত চাপের মধ্যে পড়ে যায়। একদিকে তাদের নিজেদের নিরাপত্তা সামলাতে হচ্ছে, অন্যদিকে বিদেশী বিনিয়োগকারী ও পর্যটকদের আশ্বস্ত করতে হচ্ছে যে অঞ্চলটি এখনো নিরাপদ।
কেন দীর্ঘ যুদ্ধ ইরানের পক্ষে যেতে পারে
এই বিশ্লেষণের মূল প্রশ্নটি ছিল- যদি যুদ্ধ দীর্ঘ হয়, তাহলে তা কেন ইরানের পক্ষে যেতে পারে? ফরেন অ্যাফেয়ার্স বলছে, হরাইজন্টাল এসকেলেশনের আসল প্রভাব শুধু নতুন লক্ষ্যবস্তু তৈরি করা নয়। এর আসল প্রভাব হলো শত্রুর কাছে ঝুঁকির ধারণাটাই বদলে দেয়া। স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধে ঝুঁকি হিসাব করা হয় কতটি যুদ্ধবিমান উড়ল, কতটি ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকিয়ে দেয়া গেল বা ধ্বংস হলো- এসব দিয়ে।
কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘ হলে ঝুঁকি চলে যায় রাজনৈতিক অঙ্গনে। তখন সিদ্ধান্ত নেয়া অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে পারস্য উপসাগরের আরব দেশগুলোকে। এত দিন তারা ইসরাইলের সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতা করলেও সেটা অনেকটাই আড়ালে ছিল। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘ হলে সেই সম্পর্ক প্রকাশ্যে আনতে বাধ্য হতে পারে। আর সেটাই তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ আরব বিশ্বের সাধারণ মানুষের বড় অংশ এখনো ইসরাইলের সামরিক নীতির তীব্র বিরোধিতা করে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, শাসকদের জন্য সেই সম্পর্ক ধরে রাখা তত কঠিন হয়ে উঠবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের রাজনীতিতেও চাপ
এই যুদ্ধ দীর্ঘ হলে তার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও পড়তে পারে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধের শুরুতে ইরানের নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে আকস্মিক হামলা করলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা সাময়িকভাবে বাড়তে পারে। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যেই জরিপে দেখা যায়, বেশিভাগ আমেরিকান এই সংঘাতের বিরোধিতা করছেন।
যদি যুদ্ধ দীর্ঘ হয় এবং তার সাথে জ্বালানির দাম হঠাৎ বেড়ে যায়, মার্কিন সেনাদের হতাহতের খবর আসে, আর যুদ্ধের লক্ষ্য অস্পষ্ট থাকে, তাহলে ঘরের ভেতরের অসন্তোষ দ্রুত বাড়তে পারে।
বিশেষ করে ডোলান্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক সমর্থকদের একটি বড় অংশ শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের বিরোধিতা করে এসেছে। তাদের ধারণা, মার্কিন নেতারা অনেক সময় ইসরাইলের নীতির পেছনেই হাঁটেন। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, ততই ট্রাম্পের রাজনৈতিক শিবিরের ভেতরেও বিভাজন গভীর হতে পারে।
ইউরোপের সাথে ফাটল
এই সংঘাত দীর্ঘ হলে ইউরোপের সাথেও টানাপোড়েন বাড়তে পারে। ইউরোপীয় দেশগুলো স্থিতিশীল জ্বালানি দামের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। পাশাপাশি তারা নতুন শরণার্থী ঢলের আশঙ্কাও করে। যদি যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বাড়াতে চায় কিন্তু ইউরোপ দ্রুত সংঘাত থামাতে চায়, তাহলে আটলান্টিক মহাসাগরের দুই তীরের সম্পর্কেও ফাটল ধরতে পারে। ইতিহাস বলছে, সামরিক জোট ধরে রাখা সহজ নয়। কোসোভো যুদ্ধের সময়ও দেখা গিয়েছিল, জোটের ঐক্য বজায় রাখতে ক্রমাগত রাজনৈতিক সমন্বয় দরকার হয়। যদি ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের ভূখণ্ড লজিস্টিক সহায়তার জন্য ব্যবহার করতে না দেয়- যেমন আকাশে জ্বালানি ভরার সুবিধা বা সামরিক ঘাঁটি; তাহলে দীর্ঘমেয়াদি বোমা হামলা চালানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
দীর্ঘ যুদ্ধের আরেক বিপদ
দীর্ঘ সংঘাতে আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয় হয়ে ওঠা। পারস্য উপসাগর অঞ্চলে যদি যুদ্ধ দীর্ঘ হয়, তাহলে বিভিন্ন আধাসামরিক সংগঠন তাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে যদি মার্কিন স্থলবাহিনী সীমিত আকারেও মাটিতে নামে, তাহলে নতুন বা পুরোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে। তখন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময় দিয়ে শুরু হওয়া সংঘাত আরো বড় সহিংসতা ও অস্থিরতার দিকে যেতে পারে।
যুদ্ধ যখন অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে
ফরেন অ্যাফেয়ার্স বলছে, ইরানের কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো যুদ্ধকে অর্থনীতি ও জনমতের ময়দানে ছড়িয়ে দেয়া। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কারণে বিমানবন্দর বন্ধ হয়েছে, বাণিজ্যিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, জ্বালানি ও বীমা বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে দুবাইয়ের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কথা। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যস্ত বিমানবন্দরগুলোর একটি। সেখানে যদি ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা জারি হয়ে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বাস্তব ক্ষতির চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় নিরাপত্তা ভাবমূর্তির ক্ষতি।
ইতিহাসের শিক্ষা
এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ফরেন অ্যাফেয়ার্স ইতিহাসের দু’টি যুদ্ধের উদাহরণ দিয়েছে। প্রথমটি ভিয়েতনাম যুদ্ধ। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র মনে করেছিল আকাশে তাদের শক্তিশালী অবস্থানই যথেষ্ট। ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে উত্তর ভিয়েতনামের রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ভেঙে দেয়া যাবে। কিন্তু ১৯৬৮ সালের ‘টেট অফেনসিভ’-এর কথা, উত্তর ভিয়েতনাম ও ভিয়েতকং একযোগে শতাধিক শহরে হামলা চালায়। সামরিক দিক থেকে তা ব্যয়বহুল হলেও একটি বড় কাজ করে- যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন বিজয়ের যে ধারণা তৈরি হয়েছিল, সেটাকে ভেঙে দেয়। ফলে দ্রুতই আমেরিকার জনমত যুদ্ধের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ায়।
দ্বিতীয় উদাহরণ কসোভো যুদ্ধ। তখন ন্যাটো ভেবেছিল কয়েক দিনের নির্ভুল বিমান হামলাতেই সার্বিয়াকে পিছু হটানো যাবে। কিন্তু সার্বিয়া কসোভোতে বিপুল সেনা পাঠায় এবং আলবেনীয় বেসামরিক মানুষদের গণহারে তাড়িয়ে দেয়। এতে বড় মানবিক সঙ্কট তৈরি হয় এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত ৭৮ দিনের বিমান হামলা, কূটনৈতিক চাপ এবং স্থল অভিযানের পর যুদ্ধ শেষ হয়।
তেহরানের রাজনৈতিক লক্ষ্য
ফরেন অ্যাফেয়ার্সের মতে, ইরানের প্রতিক্রিয়ার পেছনে কয়েকটি স্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য রয়েছে। প্রথম লক্ষ্য হলো পারস্য উপসাগরের দেশগুলো যে নিজেদেরকে নিরাপদ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরে, সেই ধারণাটিকে দুর্বল করা। দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো যেসব আঞ্চলিক সরকার তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রাখতে দিয়েছে, তাদের জন্য সেই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক মূল্য বাড়িয়ে দেয়া। তৃতীয় লক্ষ্য হলো একটি নতুন আঞ্চলিক রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করা, যেখানে ইরান নিজেকে একটি মার্কিন-ইসরাইলি অক্ষের বিপরীতে দাঁড় করায়। আঞ্চলিক দেশগুলোতে থাকা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি ব্যাংকগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার ব্যাপারে ইরান সতর্কবার্তা দেয়ার পর থেকেই ব্যাংকগুলো বাড়তি সতর্কতা নিতে শুরু করেছে। মূলত গতকাল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের কিছু ব্যাংকে হামলা চালানোর পরিপ্রেক্ষিতেই তেহরান এই কড়া হুঁশিয়ারি দিলো।
এদিকে, তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সির বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের হুঁশিয়ারির পর বিশ্বের অন্যতম দু’টি ব্যাংক দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। এইচএসবিসি ব্যাংক কাতারে তাদের সব শাখা বন্ধ করে দিয়েছে। দুবাইয়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকও তাদের অফিসগুলো থেকে কর্মী সরিয়ে নেয়ার কাজ শুরু করেছে।
ওয়াশিংটনের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত
এই বিশ্লেষণের শেষ অংশে বলা হয়েছে, এখন ওয়াশিংটনের সামনে দু’টি কঠিন পথ খোলা। একটি হলো সামরিক অভিযান আরো বাড়ানো, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দমনে বিমান হামলা বাড়ানো। কিন্তু সেই পথে হাঁটলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি প্রয়োজন হতে পারে। অন্য পথ হলো অভিযান থামিয়ে ঘোষণা করা, অভিযানের লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। এতে রাজনৈতিক সমালোচনা হতে পারে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘ ক্ষয়যুদ্ধের ফাঁদে পড়া থেকে বাঁচানো সম্ভব হবে।
শেষ পর্যন্ত ফরেন অ্যাফেয়ার্স বলছে, যুদ্ধের শুরুতে হামলাগুলো হয়তো কৌশলগত সাফল্য ছিল, কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দাঁড়িয়ে গেছে একটি বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে পরের ক্ষেপণাস্ত্র কোথায় পড়ল তা দিয়ে নয়; বরং ওয়াশিংটন ইরানের কৌশলকে কতটা বুঝতে পারে এবং তার রাজনৈতিক ও সামরিক জবাব কিভাবে সাজায়, তার ওপরই নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের আগামী দিনের সমীকরণ।



