চলতি সপ্তাহের শেষ নাগাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি রূপরেখা চুক্তি সই হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। তবে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকরা একে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে না দেখে একটি সুনিয়ন্ত্রিত ও অনিশ্চিত আলোচনা প্রক্রিয়ার শুরু হিসেবে বিবেচনা করছেন।
পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডন আজ জানিয়েছে, আটলান্টিক কাউন্সিল এবং ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের মতো শীর্ষস্থানীয় মার্কিন থিঙ্ক ট্যাংকের বিশ্লেষকরা সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, প্রাথমিক কোনো বোঝাপড়া হলেও তা মূলত একটি চুক্তির খসড়া রূপরেখা হবে, কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। তবে মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্ব ব্যবস্থার চলমান কৌশলগত পরিবর্তনের ভেতরেই এই বিষয়টি ঘটছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করছেন যে, ইরানের সাথে একটি বড় ধরনের বোঝাপড়া খুব কাছাকাছি রয়েছে। অন্যদিকে ইরানি কর্মকর্তারাও অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার দিকে অগ্রগতি হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। আলোচনার দিকে নজর রাখছেন এমন কূটনীতিকরা বলছেন, উদ্ভূত এই ফলাফল মূলত একটি সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ, যা পরবর্তী আলোচনার মূলনীতি ঠিক করবে, তবে মূল বিরোধগুলোর এখনই অবসান ঘটাবে না।
আটলান্টিক কাউন্সিলের স্কোক্রফ্ট মিডল ইস্ট সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভের পরিচালক জোনাথন প্যানিকফ মনে করেন, সমঝোতাটি আসলে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়, বরং একটি খসড়া রূপরেখা। এই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর আরো ৬০ দিন আলোচনার সুযোগ পাওয়া যাবে। প্যানিকফ মনে করেন, এই পুরো সময়টাতে ওয়াশিংটনকে নিজেদের অবস্থান শক্ত রাখতে হবে, যার মানে হলো এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা। একই সাথে ইরানের ওপর পশ্চিমি চাপ ধরে রাখতে ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের মতো ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে মিলে একসাথে কাজ করার তাগিদ দিয়েছেন তিনি। তার মতে, যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী চুক্তিতে পরমাণু নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক মিত্রদের নেটওয়ার্কের বিষয়টিও যুক্ত হতে পারে।
এই সম্ভাব্য চুক্তিকে একটি কূটনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখা হলেও ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশ্লেষকরা বলছেন, গভীর ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পটভূমিতে এই ঘটনা ঘটছে। মার্কিন গবেষক রবার্ট কাগানের বিশ্লেষণ এবং ব্রুকিংসের কৌশলগত মূল্যায়ন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বড় যুদ্ধগুলো অনিষ্পন্ন ও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত কার্যকারিতাকে দুর্বল করছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ক্রমেই খণ্ডিত হয়ে পড়ছে এবং সনাতন পরাশক্তিগুলোর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
ব্রুকিংসের অন্য এক বিশ্লেষণে ক্যারি হিয়ারম্যান এবং ডেভিড ওয়েসেল হরমুজ প্রণালীর ঘটনাবলীর দিকে ইঙ্গিত করে দেখিয়েছেন যে, কীভাবে এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য নিরাপত্তাকে নতুন রূপ দিচ্ছে। বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক বাণিজ্যের বিস্তার, তুলনামূলক দুর্বল শক্তির প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পশ্চিমা নৌ-আধিপত্যের আপেক্ষিক দুর্বলতার কারণে নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে বলে ব্রুস জোন্স তার মূল্যায়নে জানান।
সব মিলিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই সমঝোতা চুক্তি নিশ্চিত হলে তা হবে কয়েক মাসের সংঘাতের পর একটি বড় কূটনৈতিক অগ্রগতি। তবে আটলান্টিক কাউন্সিল ও ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশ্লেষকরা পরামর্শ দিচ্ছেন যে, একে কোনো চূড়ান্ত সমাধান না ভেবে বৈশ্বিক ব্যবস্থার একটি মোড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা উচিত। এটি সাময়িক উত্তেজনা কমাতে পারলেও এমন একটি অস্থিতিশীল ও খণ্ডিত পরিবেশের মধ্যে ঘটবে, যা বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কঠিন।
সূত্র: ডন



