হরমুজ প্রণালীতে ইরানি ডুবোজাহাজ: কেমন হবে রণকৌশল?

বর্তমানে গাদির শ্রেণির ডুবোজাহাজ উন্নত নজরদারি প্রযুক্তি ও জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপে সক্ষম। ২৯ মিটার দীর্ঘ ও ১১৫ টন ওজনের এ ডুবোজাহাজগুলো পারস্য উপসাগরের অগভীর ও জটিল জলসীমার জন্য বিশেষভাবে উপযোগী।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ইরানের গাদির ডুবোজাহাজ
ইরানের গাদির ডুবোজাহাজ |সংগৃহীত

হরমুজ প্রণালী এলাকায় শত্রুপক্ষের জাহাজ মোকাবিলায় বিশেষ সক্ষমতাসম্পন্ন ডুবোজাহাজ মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে ইরান। দেশটির সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীর অগভীর জলসীমার উপযোগী করে তৈরি ‘গাদির’ শ্রেণির ডুবোজাহাজই এ অভিযানে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এর আগে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল শাহরাম ইরানি জানান, হরমুজ প্রণালী এলাকায় এমন কিছু ডুবোজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে, যেগুলোর সমুদ্রের তলদেশে নেমে লুকিয়ে থাকার বিশেষ সক্ষমতা রয়েছে। যদিও তিনি সরাসরি কোনো ডুবোজাহাজের নাম উল্লেখ করেননি, সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এ সক্ষমতা মূলত ‘গাদির’ শ্রেণির ডুবোজাহাজের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গেই মিলে যায়।

নৌযুদ্ধের ইতিহাসে ডুবোজাহাজ বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত। শত্রুর নজর এড়িয়ে পানির নিচে অবস্থান করে আকস্মিক হামলা চালানোর সক্ষমতার কারণে এটি আধুনিক সামরিক শক্তির অন্যতম প্রধান উপাদান। অল্পসংখ্যক ডুবোজাহাজও প্রতিপক্ষের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

ইসলামী বিপ্লবের আগে ইরানের নৌবাহিনীর হাতে কোনো ডুবোজাহাজ ছিল না। তবে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় থেকেই দেশটি নিজস্ব ডুবোজাহাজ বহর গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়।

পরবর্তীতে নব্বইয়ের দশকে রাশিয়া থেকে তিনটি কিলো-ক্লাস ডুবোজাহাজ সংগ্রহ করে ইরান। ডিজেল ও বিদ্যুৎচালিত এসব ডুবোজাহাজ বিশ্বের অন্যতম উন্নত সাবমেরিন হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রায় ২ হাজার ৩০০ টন ওজনের এসব ডুবোজাহাজ ১৮টি টর্পেডো বা ২৪টি মাইন বহনে সক্ষম।

তবে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীর অগভীর জলসীমায় বড় আকারের সাবমেরিন পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা থাকায় ইরান নিজস্ব নকশায় ছোট আকারের ডুবোজাহাজ তৈরির পরিকল্পনা নেয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে প্রথমে ‘হোয়েল’ নামে একটি গবেষণা প্রকল্প শুরু হয়।

সেই প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালে ইরানের নৌবাহিনী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মেরিন ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশন যৌথভাবে প্রথম ‘গাদির’ ডুবোজাহাজ তৈরি করে। সময়ের সঙ্গে এ ডুবোজাহাজকে আরও আধুনিক করা হয়েছে।

বর্তমানে গাদির শ্রেণির ডুবোজাহাজ উন্নত নজরদারি প্রযুক্তি ও জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপে সক্ষম। ২৯ মিটার দীর্ঘ ও ১১৫ টন ওজনের এ ডুবোজাহাজগুলো পারস্য উপসাগরের অগভীর ও জটিল জলসীমার জন্য বিশেষভাবে উপযোগী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গাদির ডুবোজাহাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো সমুদ্রের তলদেশে স্থির হয়ে লুকিয়ে থাকার ক্ষমতা। এ অবস্থায় অত্যাধুনিক রাডার বা শনাক্তকারী যন্ত্র দিয়েও এগুলোকে খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।

ডুবোজাহাজটির সামনের অংশে ৫৩৩ মিলিমিটারের দুটি টর্পেডো টিউব রয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে টর্পেডোর পাশাপাশি দূরপাল্লার জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রও নিক্ষেপ করা সম্ভব।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীর মতো ভূ-কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে পানির নিচে ওঁত পেতে থেকে আকস্মিক হামলা চালানোর সক্ষমতা ইরানকে উল্লেখযোগ্য প্রতিরক্ষা সুবিধা এনে দিতে পারে। ফলে গাদির শ্রেণির ডুবোজাহাজ শত্রুপক্ষের যুদ্ধজাহাজের জন্য এক বড় ধরনের হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সূত্র: তাসনিম নিউজ