ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন পরিকল্পনা

তেহরানের শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদারদের কিভাবে লক্ষ্য বানাবে ওয়াশিংটন?

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বনেতাদের ফোন করে ইরানের সঙ্গে যাবতীয় বাণিজ্য বন্ধের নির্দিষ্ট তাগিদ দিচ্ছেন। অবশ্য, তিনি কোনো দেশের নাম প্রকাশ করেননি এবং কোনো সময়সীমাও নির্ধারণ করেননি।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি |সংগৃহীত

ইরানকে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। তেহরান কাদের সঙ্গে বাণিজ্য করে এবং এর সঙ্গে কী পরিমাণ অর্থনৈতিক লেনদেন জড়িত - সে বিষয় খতিয়ে দেখেছে আল জাজিরা।

আল জাজিরার মঙ্গলবারের (২৫ আগস্ট) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ইরানের ওপর “অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট” নামের নতুন এক বিধ্বংসী নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। এর আওতায় প্রায় ৬০টি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও বাণিজ্যিক জাহাজকে তালিকাভুক্ত করার পাশাপাশি শিপিং, সোনা, বিমান চলাচল, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সম্পদকে গৌণ (সেকেন্ডারি) নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত করা হয়েছে। স্কট বেসেন্ট জানান, তেহরান সরকারকে টিকিয়ে রাখা প্রতিটি অর্থনৈতিক লাইফলাইন কেটে দেওয়াই এই অভিযানের লক্ষ্য, যতক্ষণ না ইরান বিশ্বমঞ্চে একদম নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। তিনি আরও জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বনেতাদের ফোন করে ইরানের সঙ্গে যাবতীয় বাণিজ্য বন্ধের নির্দিষ্ট তাগিদ দিচ্ছেন। অবশ্য, তিনি কোনো দেশের নাম প্রকাশ করেননি এবং কোনো সময়সীমাও নির্ধারণ করেননি।

ট্রেড ডাটা মনিটর থেকে সংগৃহীত সরকারি কাস্টমস উপাত্তের ভিত্তিতে আল জাজিরা মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) একটি প্রতিবেদনে ইরানের শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদারদের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে। তবে এই হিসাবের বাইরে রয়েছে দেশটির প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি ইরানের অনানুষ্ঠানিক তেল বিক্রির প্রবাহ। গত দুই দশকের সিংহভাগ সময় পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে ইরানের অর্থনীতি ইউরোপীয় বাণিজ্য থেকে সরে এশীয় ও আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

সরকারি কাস্টমস তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরান অন্তত ১১২টি দেশ ও অঞ্চলে প্রায় ৫,৬০০ কোটি (৫৬ বিলিয়ন) ডলার মূল্যের পণ্য রফতানি করেছে। ইরানের সবচেয়ে বড় রফতানি গন্তব্য চীন, যেখানে রফতানির পরিমাণ ১,৪৫৮ কোটি ডলার। ট্যাংকার-ট্র্যাকিং বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং সমুদ্রপথে ইরানের তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কেনে, যার সিংহভাগই কম মূল্যে ছায়া জাহাজ বহরের মাধ্যমে পরিবহন করা হয়। এই পরিবতনের বিষয়টি কোনো দেশের কাস্টমস নথিতে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয় না। দ্বিতীয় শীর্ষ রফতানি অংশীদার ইরাক (১,১৭০ কোটি ডলার), দেশটিতে তেহরান বিদ্যুৎ উৎপাদনের গ্যাস, দক্ষিণ প্রদেশে সরাসরি বিদ্যুৎ, খাদ্য, নির্মাণসামগ্রী ও প্রস্তুতকৃত পণ্য পাঠায়। অন্যান্য প্রধান রফতানি অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (৭১৬ কোটি ডলার), তুরস্ক (৬১০ কোটি ডলার) এবং আফগানিস্তান (২৩০ কোটি ডলার)। উল্লেখ্য, সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অভিযোগে সংযুক্ত আরব আমিরাত অনির্দিষ্টকালের জন্য বাণিজ্য স্থগিত ঘোষণা করেছে। অবশ্য ক্ষেপাণাস্ত্র ছোড়ার এই অভিযোগ তেহরান অস্বীকার করেছে।

অপরদিকে, ২০২৪ সালে ইরান অন্তত ৮৭টি দেশ ও অঞ্চল থেকে প্রায় ৬,৮৫০ কোটি (৬৮.৫ বিলিয়ন) ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে। ইরানের সবচেয়ে বড় আমদানি উৎসের শীর্ষে ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত (২,১০০ কোটি ডলার), যা দেশটির মোট আমদানির ৩০ শতাংশের বেশি এবং এটি ছিল মূলত পুনর্রফতানিকৃত পশ্চিমা যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক্স ও ভোক্তা পণ্য পাওয়ার মূল মাধ্যম। তবে আমিরাতের সাম্প্রতিক বাণিজ্য স্থগিতের কারণে এই পথটি বন্ধ হয়ে গেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীন (১,৭৮০ কোটি ডলার) ইরানকে যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক্স, যানবাহন ও শিল্প যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে আসছে। অন্যান্য শীর্ষ আমদানি অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে তুরস্ক (১,১১০ কোটি ডলার), ইউরোপীয় ইউনিয়ন (৬১০ কোটি ডলার, মূলত ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী) এবং ভারত (১৬০ কোটি ডলার, প্রধানত চাল, চা ও ওষুধ)।