পারমাণবিক দ্বিচারিতা : ইসরাইলের সাত খুন মাফ, আর কাঠগড়ায় ইরান

আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা ও বিশ্বশক্তিগুলোর ভূমিকায় ইসরাইলের পারমাণবিক কর্মসূচিতে নীরবতা থাকলেও ইরানকে কঠোর নজরদারি ও চাপে রাখা হচ্ছে বলে সমালোচনা করা হয়েছে। এই দ্বৈতনীতি মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা বাড়াচ্ছে এবং সমান নীতির দাবি জোরালো হচ্ছে।

সৈয়দ মূসা রেজা
সংগৃহীত

ইরান ও ইসরাইলের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপট চিন্তা করলে কালজয়ী সেই গানটিই মনে পড়ে যায়, ‘কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়, ও ভাইরে ও ভাই/ কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়/ আমি যেই দিকেতে চাই/ দেখে অবাক বনে যাই/ আমি অর্থ কোন খুঁজে নাহি পাই রে...।’ আসলেই তো, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ), জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ কিংবা আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম- সবার ভূমিকাতেই যেন এক অদ্ভুত রঙের খেলা।

পারমাণবিক অস্ত্রের প্রশ্নে বিশ্ব রাজনীতি আজ এক চরম দ্বিচারিতার সাক্ষী। মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে ইরান এবং কৃত্রিম রাষ্ট্র ইহুদিবাদী ইসরাইল- এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টিভঙ্গি যেন একই মুদ্রার দুই পিঠ। একদিকে ইরানের কর্মসূচি নিয়ে দু’দশকের বেশি সময় ধরে চলছে অতি-সক্রিয় নজরদারি, কঠোর নিষেধাজ্ঞা আর কূটনৈতিক টানাপোড়েন। অথচ পাশাপাশি ইসরাইল এক বিশাল পারমাণবিক ভাণ্ডারের ওপর বসে থাকলেও তাদের ওপর নেই কোনো আন্তর্জাতিক চাপ কিংবা স্বচ্ছতার দাবি।

পশ্চিমা বিশ্বের এই রহস্যময় নীরবতা আর তেহরানের ওপর ক্রমাগত খড়গহস্ত হওয়ার এই বৈপরীত্য বিশ্ব রাজনীতিতে এক গভীর ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ বা দ্বৈতনীতির প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।

এই ফিচারের বুনন গড়ে উঠেছে আল জাজিরায় প্রকাশিত উসাইদ সিদ্দিকীর একটি বিশেষ প্রতিবেদন এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক শন রোস্টকারের মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে। পুরো বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন একজন স্বাধীন ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ফিচার লেখক, যার কলম নিয়মিত কাজ করে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ে।

ইসরাইলের ‘ওপেন সিক্রেট’ ও দিমোনার রহস্য

ইসরাইলের পরমাণু সক্ষমতা আজ আর কোনো গোপন বিষয় নয়, বরং এটি একটি ‘ওপেন সিক্রেট’ বা সবার জানা রহস্য। কয়েক দশক ধরে ইসরাইল তাদের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ‘অস্পষ্টতার নীতি’ বজায় রেখে চলেছে। তারা সরাসরি স্বীকারও করে না, আবার অস্বীকারও করে না। ২০১৮ সালে সিএনএনের সাবেক সঞ্চালক ক্রিস কুওমোর এক প্রশ্নের জবাবে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ‘আমরা সবসময় বলেছি যে আমরাই প্রথম এই অস্ত্র পরিচিত করাব না... এর চেয়ে ভালো উত্তর আর হতে পারে না।’

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৫০-এর দশকেই ইসরাইলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নের হাত ধরে ফ্রান্সের সহায়তায় ইসরাইল পরমাণু সক্ষমতা অর্জনের পথে হাঁটা শুরু করে। নেগেভ মরুভূমির দিমোনা পারমাণবিক কেন্দ্রটি বছরের পর বছর ধরে পারমাণবিক বোমার জ্বালানি প্লুটোনিয়াম তৈরি করে আসছে বলে ধারণা করা হয়।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে, ইসরাইলের অস্ত্র ভাণ্ডারে বর্তমানে ৮০ থেকে ২০০টির মতো পারমাণবিক ওয়ারহেড বা বোমা রয়েছে।

মোরদেখাই ভানুনু ও এনপিটি বিতর্ক

ইসরাইলের এই লুকোচুরির নীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছিল ১৯৮৬ সালে। ওই সময় দিমোনা কেন্দ্রের টেকনিশিয়ান মোরদেখাই ভানুনু যুক্তরাজ্যের ‘সানডে টাইম’ পত্রিকার কাছে এই পরমাণু চুল্লির তথ্য ও ছবি ফাঁস করে দেন। এর জেরে ইসরাইলি গোয়েন্দারা তাকে অপহরণ করে নিয়ে যায় এবং রুদ্ধদ্বার বিচারে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেয়।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইসরাইল আজ পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটিতে স্বাক্ষর করেনি। ১৯৭০ সালে কার্যকর হওয়া এই আন্তর্জাতিক চুক্তির বাইরে থাকায় ইসরাইলকে কোনো আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের মুখোমুখি হতে হয় না। অথচ এই এনপিটি চুক্তিতে ১৯১টি দেশ স্বাক্ষর করেছে, যার মধ্যে ইরানও রয়েছে।

কনস্টেলেশন ইনস্টিটিউটের গবেষক শন রোস্টকার আল জাজিরাকে বলেন, ইসরাইলের এই অস্পষ্টতার যুক্তি বেশ পরিষ্কার। তারা পরমাণু হামলার ভয় দেখিয়ে শত্রু দেশকে দূরে রাখতে চায় (ডিটারেন্স), আবার সরাসরি ঘোষণা না দিয়ে আন্তর্জাতিক আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতা থেকেও বাঁচতে চায়। বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে ইসরাইল যে অদূর ভবিষ্যতে এনপিটিতে সই করবে না, তা অনেকটা নিশ্চিত।

ইরানের ওপর খড়গ ও যুদ্ধের অজুহাত

ঠিক এর বিপরীত চিত্রটি দেখা যায় ইরানের ক্ষেত্রে। ইরান এনপিটিতে স্বাক্ষরকারী একটি দেশ। ফলে তারা আন্তর্জাতিক আনবিক শক্তি সংস্থা বা আইএইএর কঠোর নজরদারির মধ্যে থাকতে বাধ্য। গত ১০ মাসে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর দু’টি যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে এই অজুহাতে যে ইরান নাকি পরমাণু অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। যদিও এই দাবির সপক্ষে কোনো অকাট্য প্রমাণ তারা হাজির করতে পারেনি।

গত বছরের জুন মাসের ১২ দিনের সংঘাত এবং চলতি বছরের মাসব্যাপী লড়াইয়ে ২ হাজার ৬০০ জনের বেশি ইরানি প্রাণ হারিয়েছে এবং বিশ্ব এক নজিরবিহীন জ্বালানি সঙ্কটে পড়েছে।

অথচ ইরানের দাবি, তাদের কর্মসূচি নিছক শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে।

শন রোস্টকারের মতে, ইসরাইল তার পারমাণবিক অবস্থান বদলাবে না যতক্ষণ না পুরো মধ্যপ্রাচ্যে একটি ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা গণবিধ্বংসী অস্ত্র মুক্ত অঞ্চল (ডব্লিউএমডি) নিশ্চিত হচ্ছে।

হীরক রাজার যন্তর-মন্তর ও আগামীর প্রত্যাশা

পরিশেষে বলা যায়, দুনিয়ার এই অদ্ভুত রঙ্গশালায় নীতি-নৈতিকতার সংজ্ঞা দেশভেদে বদলে যায়। এই বৈষম্য নিয়ে ইরান এবং বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী প্রচারকর্মীদের মনে আজ তীব্র ক্ষোভ।

সমালোচকদের ভাষায়, এই ভারসাম্যহীনতা কেবল আন্তর্জাতিক আইনের শিথিলতা নয়, বরং তা বিশ্বশক্তির নগ্ন ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যেরই প্রতিফলন। একদিকে ইরানকে পরমাণু সক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে যখন সর্বাত্মক চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই, ঠিক তখন ইসরাইলের বিশাল পারমাণবিক ভাণ্ডারের কথা জেনেও তথাকথিত বিশ্ববিবেক যেন চোখ বুজে নাচের পুতুল সেজে আছে।

পশ্চিমা বিশ্বের এই দ্বৈতনীতি মধ্যপ্রাচ্যে তো শান্তি আনছেই না, উল্টা এক অসম প্রতিযোগিতার আগুনকে আরো উসকে দিচ্ছে। সত্য এটাই যে যতক্ষণ পর্যন্ত পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র বা ডব্লিউএমডি মুক্ত অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট, স্বচ্ছ ও বৈষম্যহীন উদ্যোগ না নেয়া হবে, ততক্ষণ এই পারমাণবিক ছায়াযুদ্ধ ও ‘রঙ্গ’ চলতেই থাকবে- যা কেবল এই অঞ্চলকে নয়, পুরো বিশ্বকেই এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে।

হীরক রাজার দেশের যে গান দিয়ে এই লেখার সূচনা, সেই চলচ্চিত্রে শেষ দৃশ্যটি ছিল প্রবল বিদ্রোহের। দড়ি ধরে মারার টানে সেখানে চূর্ণ হয়েছিল মগজ ধোলাইয়ের সেই যন্তর মন্তর ঘর আর ক্ষমতার দম্ভ। বাঁধভাঙা জনতার সেই জোয়ারে অত্যাচারী খোদ হীরক রাজা ও তার মোসাহেব ‘মন্ত্রীমান্ত্রা’ এবং পারিষদবর্গও শেষমেশ নাচতে নাচতে এসে যোগ দিয়েছিল। চলমান পারমাণবিক দ্বিচারিতার ইতিহাসেও যেন তেমনই কোনো বদল আসে।