জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র–ইরান বৈঠকে ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ দাবি

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় উচ্চপর্যায়ের পারমাণবিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান “উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি” করেছে বলে জানিয়েছেন মধ্যস্থতাকারী ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি। তবে সম্ভাব্য চুক্তি যুদ্ধ এড়াতে পারবে কি না—তা এখনো অনিশ্চিত।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
জেনেভায় ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদির মধ্যস্থতায় ইরান যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষ আলোচনা অংশ নেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাত জ্যারেড কুশনার ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ
জেনেভায় ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদির মধ্যস্থতায় ইরান যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষ আলোচনা অংশ নেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাত জ্যারেড কুশনার ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় উচ্চপর্যায়ের পারমাণবিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান “উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি” করেছে বলে জানিয়েছেন মধ্যস্থতাকারী ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি। তবে সম্ভাব্য চুক্তি যুদ্ধ এড়াতে পারবে কি না—তা এখনো অনিশ্চিত।

বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) আলবুসাইদি জানান, নিজ নিজ রাজধানীতে পরামর্শ শেষে দুই পক্ষ “শিগগিরই” আবার আলোচনায় বসবে এবং আগামী সপ্তাহে ভিয়েনায় কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক হবে।

ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেয়া দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, কিছু বিষয়ে ঐকমত্য হলেও অন্য ইস্যুতে মতভেদ রয়ে গেছে। তিনি “ভালো অগ্রগতি”র কথা উল্লেখ করে জানান, এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে পরবর্তী দফা বৈঠক হবে।

এই অগ্রগতির সম্ভাবনা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার হুমকি বাস্তবায়নের ঝুঁকি কিছুটা কমাতে পারে বলে কূটনৈতিক মহল মনে করছে। ট্রাম্প ২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসনের পর মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক সমাবেশের নির্দেশ দিয়েছেন। অপরদিকে, ইরান যেকোনো হামলার জবাবে পাল্টা শক্তি প্রয়োগের হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল অভিযোগ করে আসছে, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। তেহরান বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে। তবে ইরানই একমাত্র অ-পরমাণু অস্ত্রধারী দেশ, যারা প্রায় অস্ত্রমানের কাছাকাছি মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে।

ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, আলোচনায় তেহরান শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক জ্বালানির অধিকার দাবি করেছে এবং নিজ ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ ও প্রায় ৪০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার মার্কিন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

তবে অপ্রকাশিত কিছু ছাড় দেওয়ার প্রস্তাবও নাকি রাখা হয়েছে। একটি সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য স্থগিত রাখার পর আন্তর্জাতিক নজরদারিতে সীমিত মাত্রায় সমৃদ্ধকরণের অনুমতির কথা আলোচনায় এসেছে বলে জানা গেছে।

চুক্তির বিনিময়ে আরাগচি ইরানি টেলিভিশনকে জানান, দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে তেহরান। বিরোধীরা বলছে, নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে শাসকগোষ্ঠী নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করবে।

জেনেভায় দুই দফায়—সকালে তিন ঘণ্টা ও সন্ধ্যায় সংক্ষিপ্ত সেশন—পরোক্ষ এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ফলাফল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।

আগের মতোই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকপ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার ( আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসিও আলোচনায় যোগ দেন।

গত জুনে ইসরাইলের সঙ্গে সংঘাত চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। তখন ট্রাম্প দাবি করেন, স্থাপনাগুলো “সম্পূর্ণ ধ্বংস” হয়েছে। ইরান জানায়, হামলার পর সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ ছিল, তবে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে আইএইএ পরিদর্শকদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

মার্কিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, আলোচনায় চাপ সৃষ্টি করতে ট্রাম্প ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড বা পারমাণবিক স্থাপনায় প্রাথমিক হামলার কথা বিবেচনা করছিলেন। আলোচনা ব্যর্থ হলে সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনীকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যেও বৃহত্তর অভিযান হতে পারে—এমন আভাসও দেয়া হয়েছে।

তবে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন বলে জানা গেছে, যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন—এটি “সহজেই জেতা যাবে।”

ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, কোনো হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরাইলকে লক্ষ্য করে পাল্টা আঘাত হানা হবে। অঞ্চলটির মার্কিন মিত্র দেশগুলো আশঙ্কা করছে, হামলা হলে বৃহত্তর সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

অন্যদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর (গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইরাকে মিলিশিয়া ও ইয়েমেনে হুথি) বিষয় অন্তর্ভুক্ত না হলে কোনো চুক্তিই গ্রহণযোগ্য হবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ওয়াশিংটন সফরের প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহু ইরানের শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যেই কঠোর অবস্থান নিতে পারেন।

সূত্র : বিবিসি, আল জাজিরা।