মার্কিন ঘাঁটি নিশানা করতে মহাকাশে ইরানের ‘চীনা চোখ’, ইরানি সমরকৌশলের গোপন রহস্য

চীনের এই গোপন সহায়তা নিয়ে ওয়াশিংটন বেশ উদ্বিগ্ন। ইরানের সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সি যদিও ইরানের সামরিক সক্ষমতার খবর নিয়মিত প্রচার করে, তবে এই চীনা সংযোগ নিয়ে তারা কোনো মন্তব্য করেনি। এদিকে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে যে, তারা ইরানের ভেতরে মহাকাশ গবেষণার বেশকিছু কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে।

স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটির সামরিক বিমান
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটির সামরিক বিমান |সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত ভূ-রাজনীতিতে এবার এক নতুন খেলোয়াড় যোগ দিয়েছে—মহাকাশের গোয়েন্দা প্রযুক্তি। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন এবং চাঞ্চল্যকর মোড় নিয়েছে ইরানের গোয়েন্দা সক্ষমতা। ব্রিটিশ সংবাদপত্র ফিন্যান্সিয়াল টাইমস বা এফটির এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ইরান গোপনে একটি চীনা স্পাই স্যাটেলাইট বা গোয়েন্দা উপগ্রহের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে। গত মার্চে ইরানের ওপর চাপানো ইহুদিবাদী ইসরাইল ও আমেরিকার যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে নিখুঁতভাবে হামলা চালানোর পেছনে এই কৃত্রিম উপগ্রহটি তেহরানকে বড় ধরনের সহায়তা দিয়েছে বলে জানা গেছে।

এই বিশেষ প্রতিবেদনটি তৈরির পেছনে কাজ করেছে এক নিবিড় এবং আধুনিক অনুসন্ধান পদ্ধতি বা মেথডলজি। এফটির গবেষক দল মার্কিন স্পেস ফোর্সের পাবলিক ট্র্যাকিং ডেটা বা কক্ষপথ সংক্রান্ত তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তারা টিইই-০১বি স্যাটেলাইটের কক্ষপথ যাচাই করে দেখেছেন যে, ফাঁস হওয়া নথিতে যে নির্দিষ্ট সময়, স্থানাঙ্ক বা কোঅর্ডিনেট এবং সেন্সর অ্যাঙ্গেলের কথা বলা হয়েছে, ঠিক সেই সময়েই উপগ্রহটি সংশ্লিষ্ট মার্কিন ঘাঁটিগুলোর একদম ওপরে অবস্থান করছিল।

শুধু তাই নয়, ইউরোপীয় স্পেস অ্যাজেন্সির সেন্টিনেল-১ এবং সেন্টিনেল-২ স্যাটেলাইটের রাডার ও মিডিয়াম রেজোলিউশন ছবি ব্যবহার করে ওইসব এলাকায় হামলার আগে ও পরের দৃশ্য তুলনা করা হয়েছে। অর্থাৎ কেবল নথির ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ ও মহাকাশ গবেষণার মাধ্যমেই এই চাঞ্চল্যকর আঁতাতটি নিশ্চিত করা হয়েছে।

ফাঁস হওয়া ইরানি সামরিক নথি অনুযায়ী, টিইই-০১বি নামের এই স্যাটেলাইটটি ২০২৪ সালের শেষের দিকে চীন থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। এরপরই এর নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি-র অ্যারোস্পেস ফোর্সের হাতে। এই উপগ্রহটি তৈরি করেছে চীনা কোম্পানি ‘আর্থ আই’ । তারা ‘ইন-অরবিট ডেলিভারি’ নামক একটি বিশেষ মডেলে এটি হস্তান্তরের ব্যবস্থা করে।

‘ইন-অরবিট ডেলিভারি’ আসলে মহাকাশের এক গোপন হাতবদল। সাধারণ কেনাকাটায় পণ্য যেমন হাতে হাতে বুঝে নেয়া হয়, এটি তেমন নয়। এখানে চীন প্রথমে নিজের নামে উপগ্রহটি মহাকাশে পাঠায়। এরপর সেটি যখন নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঠিকঠাক ঘুরতে শুরু করে, তখন নিঃশব্দে সেটির ডিজিটাল চাবি বা নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে তুলে দেয়া হয়।

এতে সুবিধা হলো, মাটি থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে এই উপগ্রহটি আসলে কার জন্য পাঠানো হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক মহলের নজর এড়িয়ে ইরান মাঝ-আকাশেই একটি শক্তিশালী গোয়েন্দা চোখের মালিক হয়ে যায়। অনেকটা মাঝপথে উড়ন্ত জাহাজের ক্যাপ্টেন বদলে ফেলার মতো ব্যাপার, যা শত্রুপক্ষের অগোচরেই ঘটে যায়।

এর ফলে মহাকাশে পাঠানোর পর উপগ্রহটির মালিকানা বিদেশের গ্রাহকের কাছে চলে যায়। শুধু তাই নয়, বেইজিং ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘এমপোস্যাট’ ইরানকে তাদের বৈশ্বিক গ্রাউন্ড স্টেশন ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে। এই সুযোগ পাওয়ায় বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে আইআরজিসি এই স্যাটেলাইট পরিচালনা করতে পারছে।

নথি অনুযায়ী, গত মার্চের ১৩, ১৪ এবং ১৫ তারিখে সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটির ছবি তোলে এই স্যাটেলাইটটি। ঠিক তার পরপরই অর্থাৎ ১৪ মার্চ মার্কিন প্রশাসন নিশ্চিত করে যে ওই ঘাঁটিতে হামলা হয়েছে এবং পাঁচটি মার্কিন রিফুয়েলিং বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া জর্ডানের মুওয়াফ্ফাক সালতি বিমান ঘাঁটি, বাহরাইনের মার্কিন ফিফথ ফ্লিট এবং ইরাকের এরবিল বিমানবন্দরে হামলার আগেও এই স্যাটেলাইট দিয়ে গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হয়েছিল। এমনকি কুয়েত, জিবুতি এবং ওমানের গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন স্থাপনাগুলোও ছিল এই চীনা স্যাটেলাইটের চোখে চোখে বা নজরদারিতে।

ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ‘নূর-৩’ স্যাটেলাইটের ছবির মান ছিল বেশ সীমাবদ্ধ। ‘নূর-৩’ দিয়ে কেবল ৫ মিটার পর্যন্ত স্পষ্ট ছবি পাওয়া যেত, যা কোনো বিমান বা ছোট গাড়ি নিখুঁতভাবে শনাক্ত করার জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু এই চীনা স্যাটেলাইট আধা-মিটার বা হাফ-মিটার রেজোলিউশনের ছবি দিতে সক্ষম, যা দিয়ে শত্রুঘাঁটির প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরিবর্তন স্পষ্ট বোঝা যায়।

সহজ কথায় বলা যায়, ৫ মিটার রেজোলিউশনের ছবি মানে হলো অনেকটা ঝাপসা এক দৃশ্য। যেখানে একটি বড় ট্রাক বা ছোট ঘরকে বড়জোর একটি অস্পষ্ট বিন্দুর মতো দেখাবে। সেই ছবি দিয়ে এটা বোঝা সম্ভব নয় যে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা বস্তুটি কি আসলে কোনো তেলের ট্যাঙ্কার নাকি একটা সাঁজোয়া যান। কিন্তু চীনা স্যাটেলাইটের আধা-মিটার রেজোলিউশন যেন চশমা ছাড়া ঝাপসা চোখে হঠাৎ হাই-পাওয়ারের লেন্স লাগিয়ে দেয়া। যেখানে একটি বিন্দুর বদলে মাটির ওপর থাকা ল্যান্ড রোভার গাড়ির জানালা কিংবা যুদ্ধবিমানের ডানার গঠনও একদম স্বচ্ছ কাঁচের মতো পরিষ্কার ফুটে ওঠে।

সিআইএ-র সাবেক বিশ্লেষক জিম ল্যামসন বলছেন, ইরান তার নিজস্ব গ্রাউন্ড স্টেশনগুলোর ওপর হামলা হওয়ার আশঙ্কায় চীনের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে। কারণ অন্য দেশে থাকা চীনা স্টেশনে হামলা করা ইসরায়েল বা আমেরিকার জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক ঝুঁকির ব্যাপার।

চীনের এই গোপন সহায়তা নিয়ে ওয়াশিংটন বেশ উদ্বিগ্ন। ইরানের সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সি যদিও ইরানের সামরিক সক্ষমতার খবর নিয়মিত প্রচার করে, তবে এই চীনা সংযোগ নিয়ে তারা কোনো মন্তব্য করেনি। এদিকে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে যে, তারা ইরানের ভেতরে মহাকাশ গবেষণার বেশকিছু কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পুরো বিষয়টিকে স্রেফ ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। ইরানের সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সি বা তেহরানের অন্যান্য সরকারি সূত্রগুলো বরাবরই তাদের সার্বভৌম ও দেশীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জয়গান গেয়ে আসছে। কিন্তু এই সুদূরপ্রসারী চীনা প্রযুক্তি যে তাদের গোয়েন্দা সক্ষমতাকে রাতারাতি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, তা এখন দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার। চীন ও ইরানের এই মহাকাশ-সখ্য মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাতকে এক নতুন এবং অত্যন্ত জটিল সমীকরণের দিকে ঠেলে দিলো।

তবে এই ঘটনার পর একটি মৌলিক ও জোরালো প্রশ্ন ওঠা এখন সময়ের দাবি। ইরান বা চীনের এই কৌশলগত অংশীদারিত্ব নিয়ে পশ্চিমী দুনিয়ায় যখন প্রবল শোরগোল পড়ছে, তখন ইসরাইলের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দশকের পর দশক ধরে চলা অতি-ঘনিষ্ঠ সামরিক ও গোয়েন্দা ‘পরকীয়া’ নিয়ে কেন এমন প্রমাণসহ বৈশ্বিক তদন্ত হয় না? প্রযুক্তির আদান-প্রদান যদি এক পক্ষের জন্য অপরাধ বা হুমকি হয়, তবে অন্য পক্ষের সেই একই রকমের নিবিড় ও গোপনীয় সম্পর্ককে কেন ‘বৈধ কৌশল’ হিসেবে জায়েজ করা হবে—এই দ্বিচারিতা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠবে। ক্ষমতার ভারসাম্য যখন মহাকাশে গিয়ে ঠেকেছে, তখন শুধু এক পক্ষকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো আর যা-ই হোক, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা বা রাজনীতি হতে পারে না।