মার্কিন অবরোধের মধ্যেই যেভাবে চলছে ইরানের তেল রপ্তানি

নয়া দিগন্ত অনলাইন

মার্কিন নৌবাহিনীর কঠোর নজরদারি আর একের পর এক অবরোধের বেড়াজালকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে ইরান।

সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, গত ১৩ এপ্রিল থেকে ২১ এপ্রিলের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালী পার হয়ে মার্কিন ব্লকেড বা অবরোধের এলাকা থেকে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।

তথ্য বিশ্লেষক সংস্থা ভরটেক্সার দেয়া এই চাঞ্চল্যকর তথ্য বলছে, ইরানের বন্দর কিংবা হরমুজ প্রণালীর একদম ভেতরে নয়, বরং ওমানের পশ্চিম প্রান্ত থেকে পাকিস্তান-ইরান সীমান্ত পর্যন্ত প্রায় ৩০০ মাইল বিস্তৃত এলাকায় মার্কিন নৌবাহিনী যে নমনীয় অবরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, তা ফাঁকি দিয়েই এই বিপুল পরিমাণ তেলের ট্রানজিট সম্পন্ন হয়েছে। এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ যেমন বাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনি বিশ্ববাজারে ইরানের জ্বালানি কূটনীতির এক নতুন ও কৌশলী রূপ সামনে নিয়ে এসেছে। মিডলইস্ট আই-এর বরাত দিয়ে আজকের বিশেষ বিশ্লেষণে ঠিক কীভাবে এই অসম্ভবকে সম্ভব করছে তেহরানের এ তৎপরতাকে খতিয়ে দেখা হবে।

মার্কিন ব্লকেডের আসল হাকিকত যদি দেখা যায়, তবে বোঝা যাবে এটি কোনো নিরেট দেয়াল নয়। ভরটেক্সার মতে, মার্কিন বাহিনী মূলত ইরান এবং ওমান সীমান্তের মাঝামাঝি একটি বিশাল সমুদ্র এলাকায় তাদের টহল সীমাবদ্ধ রেখেছে। আর ঠিক এই নমনীয় ব্যবস্থার সুযোগটাই নিয়েছে ইরান। ১৩ থেকে ২২ এপ্রিলের মধ্যে অন্তত ৩৫টি এমন নৌযান ওই এলাকা পার হয়েছে যেগুলোর সাথে সরাসরি ইরানের যোগসূত্র রয়েছে কিংবা যেগুলো আগে থেকেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় নাম তুলে বসে আছে। এটি কেবল তেলের চালানি নয়, বরং ওয়াশিংটনকে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন বার্তা দেয়া যে, সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ কেবল বড় জাহাজের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। ইরান সম্ভবত এমন সব পথ বা কৌশল ব্যবহার করছে যা রাডারের চোখ এড়িয়ে কিংবা ডার্ক ফ্লিট ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছে।

ইরান ও ইসরাইল উত্তেজনার আবহে এই তেলের সরবরাহ বজায় রাখা তেহরানের জন্য কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং একটি বড় রাজনৈতিক বিজয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির নৌবাহিনী যখন একটি নির্দিষ্ট এলাকা ব্লক করে রাখে, তখন সেখান দিয়ে তেলবাহী জাহাজ পার করাটা রীতিমতো স্নায়ুর লড়াই। এখানে একটা বিষয় মাথায় রাখা দরকার যে, এই তেলের সিংহভাগই কিন্তু যাচ্ছে এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে, যার বড় একটা অংশ কেনে চীন। ফলে আমেরিকার এই অবরোধ কেবল ইরানকে আটকানোর লড়াই নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতির এক জটিল দাবার চাল।

ইরান প্রমাণ করতে চাইছে যে, তাদের অর্থনীতির লাইফলাইন অর্থাৎ এই তেল রপ্তানি বন্ধ করা এতো সহজ কাজ নয়। সাথে সাথে এটিও পরিষ্কার হচ্ছে যে, আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় নজরদারির যে কাঠামো আমেরিকা তৈরি করেছে, তাতে বড় ধরনের গলদ রয়ে গেছে।

সামগ্রিক এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের এই সমুদ্রপথ এখন এক বিশাল লুকোচুরি খেলার ময়দান হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার খড়্গ, অন্যদিকে ইরানের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই। ভরটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, এই ১০ দিনে যে পরিমাণ তেল পার হয়েছে তা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এটি আমেরিকার অবরোধ নীতির কার্যকারিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। ইরান সম্ভবত সামনের দিনগুলোতে তাদের এই ছায়া নৌবহর বা স্যানশনড ভেসেলগুলোর মাধ্যমে আরো বড় ঝুঁকি নিতে পিছপা হবে না। সাগরের নোনা জলে যে তেলের রাজনীতি চলছে, তার রেশ যে কেবল তেহরান বা ওয়াশিংটনে থেমে থাকবে না, তা বলাই বাহুল্য। সামনের দিনগুলোতে মার্কিন নৌবাহিনী তাদের অবরোধের কৌশল আরও কঠোর করে নাকি ইরান নতুন কোনো চোরা গলি খুঁজে বের করে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সূত্র: মিডলইস্ট আই