মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ

বিশ্ববাজারে চড়া জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের অব্যাহত হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে ইরান । এই পাল্টাপাল্টি আক্রমণের সরাসরি প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের অব্যাহত হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে ইরান । এই পাল্টাপাল্টি আক্রমণের সরাসরি প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গ্যাস রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘কাতার এনার্জি’ সোমবার তাদের উৎপাদন কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করেছে।

প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের গ্যাস স্থাপনাগুলোতে ‘সামরিক হামলা’ হওয়ার পর নিরাপত্তার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর পরপরই সোমবার বিশ্ববাজারে প্রাকৃতিক গ্যাসের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দেয়। গত সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালীর কাছে অন্তত তিনটি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে। এর ফলে সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের বেঞ্চমার্ক ‘ব্রেন্ট ক্রুড’-এর দাম ব্যারেল প্রতি সাময়িকভাবে ৮২ ডলার (৬১ পাউন্ড) স্পর্শ করেছে।

ইরান দক্ষিণ উপকূলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল না করার জন্য কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে। উল্লেখ্য যে, বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথটি দিয়েই বিশ্বজুড়ে পরিবাহিত হয়। এই পথটি বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সোমবার লেনদেনের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুটি শেয়ারবাজার সূচক কিছুটা নিম্নমুখী ছিল। তবে দিনের মাঝামাঝি সময়ে নাসডাক (Nasdaq) এবং S&P 500 তাদের প্রাথমিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয় এবং সামান্য লাভে লেনদেন শেষ করে।

লন্ডনের FTSE 100 সূচক ১.২% পতন নিয়ে বন্ধ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া বার্কলেস, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড এবং এইচএসবিসি-র মতো বড় ব্যাংকগুলোর শেয়ারের দামও কমেছে। বিনিয়োগকারীদের শঙ্কা, জ্বালানির দাম বাড়লে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে, ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে পারে।

অন্যদিকে, ফ্রান্সের CAC-40 সূচক ২.২% এবং জার্মানির Dax সূচক ২.৬% পতন নিয়ে দিন শেষ করেছে। তবে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম ছিল চড়া।

কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান থেকে আসা একটি ড্রোন দেশটির রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটির একটি স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। এর পরপরই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘কাতারএনার্জি’ তাদের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) উৎপাদন সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেছে। এছাড়া রাজধানী দোহার দক্ষিণে মেসাইদ এলাকায় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পানির ট্যাংকেও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে।

প্রতিবেশী দেশ সৌদি আরবের উপকূলে অবস্থিত বিখ্যাত রাস তানুরা তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলা হওয়ায় সেটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ‘আরামকো’।

অন্যদিকে, যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালীর প্রবেশপথে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার (UKMTO) জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত দুটি জাহাজে সরাসরি হামলা হয়েছে এবং তৃতীয় একটি জাহাজের খুব কাছে একটি ‘অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল’ বিস্ফোরিত হয়েছে।

এমএসটি মার্কি (MST Marquee)-এর জ্বালানি গবেষণা প্রধান সাউল কাভোনিক বিবিসি-কে বলেন, ‘বাজার এখনই পুরোপুরি আতঙ্কিত নয়। কারণ এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই তেল পরিবহন বা মূল উৎপাদন অবকাঠামোকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু করেনি।’ তিনি আরও যোগ করেন যে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ দেখা গেলেই তেলের দাম আবার কমতে শুরু করবে।

তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, যদি এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তবে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি (দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি) এবং ব্যাংক সুদের হারের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

গত রোববার তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ‘ওপেক প্লাস’ তেলের দামেরে ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিন ২ লাখ ৬ হাজার ব্যারেল অতিরিক্ত তেল উত্তোলনের বিষয়ে একমত হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাজারের অস্থিরতা কমাতে এই সামান্য পরিমাণ উৎপাদন বৃদ্ধি খুব একটা কাজে আসবে না।

যুক্তরাজ্যের অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন (AA)-এর প্রেসিডেন্ট এডমন্ড কিং সতর্ক করেছেন যে, এই ডামাডোল বিশ্বজুড়ে পেট্রোলের দাম বাড়িয়ে দেবে। তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে বোমাবর্ষণ এবং অস্থিরতা বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করবে, যা অনিবার্যভাবে তেলের দাম বাড়াবে।’ সাধারণ মানুষের জন্য পাম্পে তেলের দাম কতটা বাড়বে এবং তা কতদিন স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে যুদ্ধ কতদিন চলবে তার ওপর।

গত রোববার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (IRGC) দাবি করেছে যে, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি তেল ট্যাঙ্কার তাদের ‘ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিধ্বস্ত হয়েছে এবং বর্তমানে সেগুলো জ্বলছে’। তবে এই দাবির বিষয়ে এখন পর্যন্ত যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার (UKMTO) জানিয়েছে যে, আরব উপসাগর এবং ওমান উপসাগরজুড়ে ‘একাধিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা’ রিপোর্ট করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সংস্থাটি ওই অঞ্চলে চলাচলরত জাহাজগুলোকে ‘অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ট্রানজিট’ করার পরামর্শ দিয়েছে।

বিশ্বের বৃহত্তম কন্টেইনার শিপিং গ্রুপ ‘মায়েরস্ক’ (Maersk) রোববার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, তারা আপাতত বাব এল-মান্দেব প্রণালী এবং সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল স্থগিত রাখবে। এর পরিবর্তে তারা তাদের জাহাজগুলোকে আফ্রিকার ‘কেপ অফ গুড হোপ’ (উত্তমাশা অন্তরীপ) দিয়ে ঘুরে যাওয়ার জন্য নতুন রুট নির্ধারণ করেছে। এর ফলে জাহাজগুলোর গন্তব্যে পৌঁছাতে অনেক বেশি সময় এবং খরচ বাড়বে।

সূত্র : বিবিসি , আল জাজিরা।