মার্কিন হামলা হলে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে আঘাত হানার হুমকি ইরানের

তেহরানের হুঁশিয়ারির পর ট্রাম্পকে সামরিক পথ এড়িয়ে কূটনীতিতে ফেরার আহ্বান জানাচ্ছে রিয়াদ ও প্রতিবেশী দেশগুলো

নয়া দিগন্ত অনলাইন
ইরানের তেহরানে আজাদী চত্বরে মোতায়েন একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা
ইরানের তেহরানে আজাদী চত্বরে মোতায়েন একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা

ইরানের ভূখণ্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে কোনো হামলা চালালে গোটা অঞ্চলজুড়ে অবস্থিত অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোয় মারাত্মক পাল্টা আঘাত হানা হবে বলে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে সরাসরি সতর্ক করে দিয়েছে তেহরান।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) বলছে, ওয়াশিংটনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক মিত্রদের ভয় দেখিয়ে সামরিক অভিযানের ঝুঁকি ও খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়াই ইরানের মূল উদ্দেশ্য বলে পাঁচটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।

গত ২৮ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি নেটওয়ার্ক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় বড় ধরনের হামলার হুমকি দেয়ার পর উচ্চপর্যায়ের ধারাবাহিক কূটনীতির মাধ্যমে এই কঠোর বার্তা পৌঁছে দেয়া হয়।

এই আলোচনার বিষয়ে জানেন এমন দুজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা, দুজন উপসাগরীয় সূত্র এবং একজন জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক কূটনীতিক জানান, স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন তারা। তারা জানান, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সৌদি আরব, তুরস্ক ও কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের পাশাপাশি পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সাথেও এ নিয়ে সরাসরি কথা বলেছেন।

ওই জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক জানান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারস্য উপসাগরীয় মিত্রদের অনুরোধ করেন যেন তারা ট্রাম্পের ওপর নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে নতুন কোনো হামলা চালানো থেকে তাকে বিরত রাখেন। সেই সাথে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ইরানের ওপর যেকোনো আক্রমণ হলে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে থাকা মার্কিন সামরিক সম্পদ ও জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতে তার জোরালো জবাব দেয়া হবে।

কূটনীতিকের ভাষ্যমতে, প্রতিটি আলোচনাতেই আরাকচির মূল বার্তা ছিল একটাই: 'আমরা কঠোর পাল্টা আঘাত হানতে পুরোপুরি প্রস্তুত। তবে পুরো অঞ্চলজুড়ে সংঘাতের ভয়াবহ বিস্তার ও বিপুল ধ্বংসযজ্ঞ এড়ানোর সবচেয়ে ভালো পথ হলো কূটনৈতিক সমাধান খোঁজা।'

ঘটনার বিবরণ দিয়ে এক উপসাগরীয় সূত্র জানায়, 'ইরানের এই হুঁশিয়ারি ছিল একেবারেই স্পষ্ট ও পরিষ্কার—আমেরিকা যদি ইরানের অবকাঠামো নিশানা করে, তবে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা ও অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত হেনে তার জবাব দেবে।'

এই কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ বানচাল করতে পুরো অঞ্চলে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের ভয় দেখানোর কৌশল বেছে নিয়েছে ইরান। ফলে একদিকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি গড়তে দেয়া আর অন্যদিকে জ্বালানি রপ্তানির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল উপসাগরীয় দেশগুলো চরম এক কঠিন কূটনৈতিক মুশকিলে পড়েছে।

জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ও উপসাগরীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই হুমকির পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান দ্রুত ট্রাম্পের সাথে ফোনালাপ করেন। তিনি সামরিক পদক্ষেপ পিছিয়ে দিতে, পুনরায় আলোচনায় ফিরতে, যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে এবং দ্বিপক্ষীয় সমস্যার একটি শান্তিপূর্ণ কূটনৈতিক নিষ্পত্তির পথে হাঁটতে ট্রাম্পকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানান।

আরেকটি উপসাগরীয় সূত্র জানিয়েছে, এই সতর্কবার্তা মূলত উপসাগরীয় সব দেশের জন্যই প্রযোজ্য। তবে বার্তাটি পৌঁছানোর ক্ষেত্রে মূল মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে সৌদি আরব ও কাতার। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাবেক আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবসহ প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে সম্পর্কে ইতিবাচক সংস্কার এনেছে ইরান।

দ্বিতীয় একজন ইরানি কর্মকর্তা জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি হামলা অঞ্চলটিকে 'একটি দাউদাউ জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ডে' পরিণত করতে পারে—ইরানের এমন কঠোর সতর্কতার পর কাতার, ওমান ও সৌদি আরব সকলেই তেহরানের সাথে আবারো আলোচনা শুরু করতে এবং নতুন যুদ্ধ নস্যাৎ করতে ওয়াশিংটনের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে।

পরবর্তীতে গত ২ আগস্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, 'দ্রুত একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর শর্তে' তিনি ইরানের ওপর পরিকল্পিত হামলা বাতিল করতে সম্মত হয়েছেন।

আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা প্রকাশ ইরানি কর্মকর্তার

প্রথম উপসাগরীয় সূত্রটি বলেছে, 'সৌদি আরব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, সংঘাত আরো বাড়ালে কেবল ধ্বংসই নেমে আসবে। আর সে কারণেই রিয়াদ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কূটনীতিকে আরেকটি সুযোগ দেয়ার তাগিদ দিয়েছে।'

তবে ওয়াশিংটনকে কূটনৈতিক পথে হাঁটার তাগিদ দিলেও রিয়াদ পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, নিজেদের ওপর কোনো হুমকি আসলে তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। দ্বিতীয় পারস্য উপসাগরীয় সূত্রটি জানিয়েছে, সৌদি আরব পাল্টা হুঙ্কার দিয়ে সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, তাদের নিজ ভূখণ্ডে কোনো আক্রমণ হলে তার সমুচিত সামরিক জবাব দেয়া হবে।