ইরানের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পানিপথ হরমুজ প্রণালী। এই প্রণালী বরাবরই বিশ্ব অর্থনীতির স্বর্ণসূত্র হিসেবে পরিচিত হলেও বর্তমান সঙ্ঘাত একে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া একতরফা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তেহরান নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পথ বেছে নেয়। তারই অংশ হিসেবে এই কৌশলগত পানিপথ অবরোধের সিদ্ধান্ত নেয় ইরান। তখনো কেউ ভাবেনি এর প্রভাব কেবল জ্বালানি তেলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এই অবরোধের ফলে কার্যত পঙ্গু হয়ে পড়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির প্রাণভোমরা হিসেবে পরিচিত মেমোরি চিপের বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাও।
ইরানের সংবাদ মাধ্যম তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সি এই সঙ্কটের ভয়াবহতা তুলে ধরে জানিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ৭০ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার ফলে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তি খাতগুলো এখন বিপর্যয়ের প্রান্তে পৌঁছে গেছে।
এই ভূ-রাজনৈতিক সঙ্কটের সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিকটি হলো সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ শিল্পের ওপর এর বিধ্বংসী প্রভাব। এই চিপই মূলত বিশ্বের ডিজিটাল রূপান্তর ও সুপার কম্পিউটারের মূল ভিত্তি। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ার দুই মেমোরি জায়ান্ট স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স এবং এসকে হাইনিক্স এই অবরোধের ফলে নজিরবিহীন সঙ্কটের মুখে পড়েছে।
দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে মেমোরি চিপের বাজারে আধিপত্য বিস্তার করা স্যামসাং গত মার্চ মাসে তাদের শেয়ার বাজারে ২৩ শতাংশ দরপতন দেখেছে, যা ২০০৮ সালের পর সবচেয়ে বড় ধাক্কা। অন্যদিকে এআই বিপ্লবের প্রধান কারিগর এসকে হাইনিক্স, যারা বিশ্বের উচ্চ গতির মেমোরি বা এইচবিএম বাজারের ৬২ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের শেয়ারের দামও ১৮ শতাংশ কমে গেছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এক মাসেই এই দুই প্রতিষ্ঠান থেকে ১৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি পুঁজি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। মূলত এই দুই কোরীয় কোম্পানি বিশ্বের মোট এইচবিএম চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ পূরণ করে। এখন এই অবরোধের কারণে কোম্পানি দু’টি মুখ থুবড়ে পড়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশে এইচবিএম বা হাই ব্যান্ডউইথ মেমোরি কেন এত জরুরি, তা বুঝতে হলে এর প্রযুক্তির দিকে তাকাতে হবে। এটি সাধারণ মেমোরির তুলনায় প্রায় ৩৯ গুণ বেশি দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান করতে সক্ষম। এনভিডিয়ার এইচ-১০০ কিংবা বি-২০০ এর মতো শক্তিশালী এআই চিপগুলো পুরোপুরি এই এইচবিএম মেমোরির ওপর নির্ভরশীল।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ থাকায় এবং কাতার থেকে হিলিয়াম গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে চিপ তৈরির লিথোগ্রাফি প্রক্রিয়া প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মাইক্রোসফট, গুগল ও মেটার মতো টেক জায়ান্টদের ওপর। এসব টেক জায়ান্ট জিপিটি-৫ এর মতো উন্নত এআই মডেল প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার পাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই অবরোধ আরো দুই মাস স্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা ৭০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে।
ইরানের এই কঠোর অবস্থান বিশ্বকে এক কঠিন সত্যের মুখোমুখি করেছে যে, আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তিগুলোও শেষ পর্যন্ত প্রাকৃতিক ও কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর কতটা নির্ভরশীল।
সূত্র: তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সি, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি বাজার বিশ্লেষণ প্রতিবেদন



