মধ্যপ্রাচ্যের আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে 'বৈধ লক্ষ্যবস্তু' ঘোষণা তেহরানের

ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ইসলামী রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এক কড়া বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, পশ্চিম এশিয়ায়া অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন এবং ইসরাইলি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন থেকে ইরানের জন্য 'বৈধ লক্ষ্যবস্তু' হিসেবে গণ্য হবে।

সৈয়দ মূসা রেজা
মার্কিন-ইসরাইলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত তেহরান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি
মার্কিন-ইসরাইলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত তেহরান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি |সংগৃহীত

তেহরান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে মার্কিন-ইসরাইলি বাহিনীর সাম্প্রতিক বোমা হামলাকে কেন্দ্র করে মার্কিন পরিচালিত পশ্চিম এশিয়ার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সরাসরি নিশানায় পরিণত করা হবে ঘোষণা করেছে ইরান। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও মার্কিন-ইসরাইল জোটের মধ্যকার যুদ্ধ এখন এক বিপজ্জনক বাঁক নিয়েছে।

ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ইসলামী রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এক কড়া বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, পশ্চিম এশিয়ায়া অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন এবং ইসরাইলি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন থেকে ইরানের জন্য 'বৈধ লক্ষ্যবস্তু' হিসেবে গণ্য হবে।

তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাতে জানা গেছে, তেহরান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে মার্কিন-ইসরাইলি বাহিনীর হঠকারিমূলক সাম্প্রতিক বোমা হামলার পাল্টা জবাব দিতেই আইআরজিসি এই চরম হুঁশিয়ারি । 'অপারেশন ট্রু প্রমিস ৪'-এর আওতায় জারিকৃত ৫০ নম্বর ঘোষণায় ইরান স্পষ্ট করে বলেছে যে, তাদের একটি বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের বিপরীতে তারা ওই অঞ্চলের দুটি বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করবে। তেহরানের স্থানীয় সময় সোমবার (৩০ মার্চ) বেলা ১২টার মধ্যে যদি ওয়াশিংটন এই হামলার আনুষ্ঠানিক নিন্দা না জানায়, তবে প্রতিশোধমূলক হামলা যেকোনো সময় শুরু হতে পারে। আইআরজিসি ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জীবন বাঁচাতে ক্যাম্পাস থেকে অন্তত এক কিলোমিটার দূরে সরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

মার্কিন ও ইহুদিবাদী ইসরাইলের হঠকারিমূলক পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে ইরানের এই নজিরবিহীন হুমকির ফলে পশ্চিম এশিয়ায়া এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত নামি মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরণের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে কাতারে সবচেয়ে বেশি মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা রয়েছে, যার সংখ্যা অন্তত ছয়টি। এর মধ্যে কর্নেল, জর্জটাউন এবং টেক্সাস এঅ্যান্ডএম-এর মতো নামি প্রতিষ্ঠানের শাখা অন্যতম। এর পরেই আছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, যেখানে এনওয়াইইউএডি বা নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি আবুধাবি অত্যন্ত প্রভাবশালী। এছাড়া মিশরে আমেরিকান ইউনিভার্সিটি ইন কায়রো এবং কুয়েত ও ইরাকে একটি করে আমেরিকান ইউনিভার্সিটি রয়েছে। এই তালিকায় লেবাননের আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুত অবশ্যই পড়বে, কারণ এটি মার্কিন সনদে পরিচালিত অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন ও কৌশলগত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আইআরজিসির হুমকি কার্যকর হলে এই প্রতিটি ক্যাম্পাসই এখন সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রগুলোকে যুদ্ধের আওতামুক্ত রাখার একটি অলিখিত প্রথা দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছিল। এমনকি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের বিভীষিকার সময়ও জার্মানি এবং মিত্রশক্তি একে অপরের ঐতিহাসিক বিশ্ববিদ্যালয় শহরগুলোতে বোমা না ফেলার ব্যাপারে এক ধরণের মৌন সমঝোতায় ছিল বলে ঐতিহাসিক বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ আছে। অক্সফোর্ড বা হাইডেলবার্গের মতো প্রাচীন বিদ্যাপীঠগুলো সেই সময় বড় ধরণের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বেঁচে গিয়েছিল এই 'পারস্পরিক সমঝোতা' ও শ্রদ্ধাবোধের কারণে। কিন্তু আমেরিকা ও ইহুদিবাদী ইসরাইল সেই ধরনের শ্রদ্ধাবোধ লঙ্ঘন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি।তাদের তৎপরতা সেই পুরনো যুদ্ধকালীন আন্তর্জাতিক শিষ্টাচারকেও বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তেহরানের পাল্টা অবস্থান মূলত ওয়াশিংটনকে একটি চরম কূটনৈতিক ও সামরিক চাপে ফেলার কৌশল, যা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে নতুন করে নাড়িয়ে দিয়েছে।

সূত্র: তাসনিম নিউজ