জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা: পরমাণু বিদ্যুতের পথে বিশ্বের ৪০ দেশ

বৈশ্বিক পারমাণবিক পুনর্জাগরণ” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির বাজারে অনিশ্চয়তা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতেই দেশগুলো এই দিকে ঝুঁকছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে ৩১টি দেশ তাদের বিদ্যুতের প্রায় ১০ শতাংশ পরমাণু শক্তি থেকে পায়। তবে নতুন করে আরো ৪০টি দেশ এখন নিজস্ব অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জ্বালানি মানচিত্রে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং ইরান সঙ্কটঘিরে তৈরি হওয়া জ্বালানি অস্থিরতা সামাল দিতে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলো দ্রুত পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দিকে ঝুঁকছে এবং এই তালিকায় ইতিমধ্যে অন্তত ৪০টি দেশ নাম লিখিয়েছে।

ইরানের সংবাদ মাধ্যম তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সি এবং মার্কিন সংবাদ মাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি ) বলছে, তেলের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটায় প্রথম ধাক্কা লাগে এশিয়ায়। পরবর্তীতে এর প্রভাব দ্রুত ইউরোপ ও আমেরিকাতেও ছড়িয়ে পড়ে, ফলে জ্বালানি খরচ বেড়ে গিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে, আর এই পরিস্থিতি থেকে দীর্ঘমেয়াদে মুক্তি পেতে রাষ্ট্রগুলো এখন পরমাণু শক্তিকে একটি বিকল্প রক্ষাকবচ হিসেবে দেখছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, যেসব দেশ আগে থেকেই পরমাণু বিদ্যুৎ ব্যবহার করছিল তারা স্বল্পমেয়াদে উৎপাদন বাড়ানোর দিকে জোর দিচ্ছে। পাশাপাশি যেসব দেশে কোনো কর্মসূচি ছিল না তারা ভবিষ্যতের ধাক্কা এড়াতে দ্রুত পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে। তবে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশ্লেষক জোশুয়া কুরলান্টজিক সতর্ক করে বলেছেন, নতুন পরমাণু কর্মসূচি গড়ে তোলা সহজ নয়, এতে কয়েক দশক পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। তবুও বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পথ ছাড়া আর কোনো কার্যকর বিকল্প দেখছে না অনেক দেশই।

যুদ্ধের প্রভাবে দক্ষিণ কোরিয়া তাদের বন্ধ থাকা পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্র মেরামত করে আগামী মে মাসের মধ্যে আবারো চালু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাশাপাশি তাইওয়ান ও জাপানও ফুকুশিমা বিপর্যয়ের পর নেয়া সীমাবদ্ধ নীতি পুনর্বিবেচনা করছে। তাইওয়ান দুইটি পরমাণু চুল্লী পুনরায় চালুর জন্য কঠোর নিরাপত্তা যাচাই প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে। এদিকে, জাপান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের পরমাণু চুল্লীর চুক্তি, ফ্রান্সের সাথে জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ চুক্তি এবং ইন্দোনেশিয়ার সাথে সহযোগিতা বাড়িয়েছে। এমনকি জানুয়ারি মাসে বিশ্বের বৃহত্তম কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র আবারো চালু করেছে।

জার্নাল অব দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টের বিশ্লেষক র‍্যাচেল ব্রুনসন এই পরিবর্তনকে “বৈশ্বিক পারমাণবিক পুনর্জাগরণ” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির বাজারে অনিশ্চয়তা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতেই দেশগুলো এই দিকে ঝুঁকছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে ৩১টি দেশ তাদের বিদ্যুতের প্রায় ১০ শতাংশ পরমাণু শক্তি থেকে পায়। তবে নতুন করে আরো ৪০টি দেশ এখন নিজস্ব অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জ্বালানি মানচিত্রে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তেল আবিবের প্ররোচনায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইহুদিবাদী ইসরাইলের ইরান ওপর হামলা চালানোকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনা কেবল সামরিক সংঘাতেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং তা জ্বালানি সরবরাহ, অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণেও গভীর প্রভাব ফেলছে। দিনকে দিন সে সত্যই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পরমাণু শক্তি তাৎক্ষণিক সমাধান না হলেও ভবিষ্যতে আবারো কোনো সঙ্কটদেখা দিলে অর্থনীতি যেনো অচল হয়ে না পড়ে সে লক্ষ্যে দেশগুলো তাদের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি পোর্টফোলিওতে এই খাতকে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে দুনিয়া এখন ধীরে ধীরে এক নতুন জ্বালানি বাস্তবতার সড়কে হাঁটছে।