ফিলিস্তিনি বন্দীরা যাতে কোনোভাবেই কারাগার থেকে পালাতে না পারে, সেজন্য চারপাশ হিংস্র কুমির দিয়ে ঘিরে রাখার এক ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা করছে ইসরাইল। এই উদ্দেশ্যে নীল নদের কুমিরের ওপর থেকে সব ধরনের আইনি সুরক্ষা তুলে নিয়েছে দেশটির সরকার।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেটের বরাত দিয়ে মিডলইস্ট আই জানিয়েছে, পরিবেশ মন্ত্রী ইদিত সিলমান গত বুধবার একটি বিশেষ ডিক্রি জারি করেছেন। সেখানে নীল নদের কুমিরকে ‘বিশেষ ব্যবস্থাপনার বন্যপ্রাণী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এই নতুন আইনি মারপ্যাঁচে এখন থেকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অজুহাতে যেকোনো বন্দিশালায় কুমির এনে রাখা যাবে।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, নীল নদের কুমির পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম ও হিংস্রতম সরীসৃপ। এই প্রাণী ওত পেতে শিকার করায় অত্যন্ত পটু। এদের চোয়ালের কামড়ানোর শক্তি সাধারণ সিংহের চেয়ে প্রায় সাড়ে তিন গুণ বেশি। মানুষের ওপর আক্রমণ করার দিক থেকেও বন্যপ্রাণী জগতে এরা সবচেয়ে কুখ্যাত।
তবে এই ভয়ঙ্কর শিকারির একটি বড় দুর্বলতা হলো এরা শীতল রক্তের প্রাণী। ফলে শীতকালে তাপমাত্রা কমে গেলে এ কুমিরের শরীরের বিপাকক্রিয়া একদম ধীর হয়ে যায়। তখন এরা চরম অলস ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়।
পরিবেশবাদীদের দাবি, বছরের একটা বড় সময় নিষ্ক্রিয় থাকে বলে পাহারাদারির কাজে এই কুমির ব্যবহার করা সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক ও হাস্যকর।
মূলত কট্টরপন্থী ইসরাইলি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের টানা কয়েক মাসের চাপেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার জলাভূমিতে থাকা বিপজ্জনক কুমির ও সেখানকার অভিবাসী বন্দিশালার কঠোর নির্যাতনকে মানবাধিকার কর্মীরা উপহাস করে ‘অ্যালিগ্যাটর আলকাট্রাজ’ বলে ডাকতেন। মিডলইস্ট আই-এর তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকার সেই কুখ্যাত বন্দী ব্যবস্থার নিষ্ঠুরতা দেখেই উদ্বুদ্ধ হন বেন-গভির। এই নতুন পরিকল্পনার পর তিনি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে কুমিরের গলায় দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে যাওয়ার একটি এআই ছবি পোস্ট করে ফিলিস্তিনিদের উদ্দেশ্যে লিখেছেন, ‘পালাবার কথা ভাবছ? আবারো ভাবো।’
তবে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের আইনি উপদেষ্টা নেটা দ্রোরি এবং বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। ইসরাইলের কারা কর্তৃপক্ষ (আইপিএস) দাবি করেছিল, তাদের হিংস্র আক্রমণকারী কুকুর সামলানোর অভিজ্ঞতা আছে, তাই তারা কুমিরও সামলাতে পারবে। এই খোঁড়া যুক্তি সরাসরি খারিজ করে দ্রোরি জানান, কুমিরের মতো বিপজ্জনক বন্যপ্রাণী লালন-পালনের কোনো অভিজ্ঞতাই কারা কর্তৃপক্ষের নেই।
ইসরাইলের প্রকৃতি ও উদ্যান কর্তৃপক্ষ এবং বেশ কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠন যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, বন্দিশালায় কুমির ব্যবহার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তা ছাড়া শীতকালে শীতনিদ্রার কারণে কুমিরের শরীরের বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। তখন তারা অলস হয়ে পড়ে এবং খাবার খাওয়াও বন্ধ করে দেয়। ফলে পাহারাদারি বা বন্দি ঠেকানোর কাজে এরা পুরোপুরি ব্যর্থ হবে। নিরাপত্তার জন্য বন্যপ্রাণী ব্যবহার না করে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরাইলি গণহত্যা শুরু হওয়ার পর থেকেই ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর অমানবিক নির্যাতন ও অনাহার ও চরম অপমানজনক আচরণ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন বেন-গভির। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইসরাইলের এই বন্দীশালাগুলোকে ইতিমধ্যে ‘নির্যাতন সেল’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। আর এবার সেই বন্দীশালাগুলোকে হিংস্র সরীসৃপ দিয়ে ঘিরে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরো এক ধাপ বাড়াতে চলেছে ইসরায়েল।



