ইরান যুদ্ধ নতুন করে উত্তপ্ত হতেই এক অভাবনীয় কূটনৈতিক দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বদলে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো এবারে চীনের দিকে তাকাচ্ছে। তাদের একটাই দাবি—ইরানের ওপর নিজেদের চরম অর্থনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে চীন যেন হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগরের বাণিজ্যিক পথ আবার খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার মাধ্যমে যে যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠেছিল, তা কেবল তেল রপ্তানিই বাধাগ্রস্ত করেনি, গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা তছনছ করে দিয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) জানায়, মার্কিন ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা টের পেয়েই (চীনের বাণিজ্য, সামুদ্রিক যোগাযোগ ও এশীয় কূটনৈতিক শক্তির অন্যতম একটি প্রতীকী, চীনের পূর্বাঞ্চলে পীত সাগরের উপকূলে অবস্থিত ঐতিহাসিক বন্দর নগরী) কিঙ্গদাও থেকে রিয়াদ—সবাই এখন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ও বিশেষ দূত ঝাই জুনের দিকে তাকিয়ে। চীন অবশ্য দু'পক্ষের সাথেই যোগাযোগ রাখছে। তবে সমস্যা হলো, চীন একই সাথে পুরো অঞ্চলের জ্বালানির মূল ক্রেতা এবং ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য সহযোগী।
ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই থাকবে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, পরমাণু চুক্তি সম্পর্কিত আলোচনা চলার মাঝেই মার্কিন ও ইসরাইল সরকার তাদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে সব শান্তি প্রচেষ্টা বানচাল করার চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে ইানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি কোনো চাপের কাছে নতিস্বীকার করতে নারাজ।
চীন তার এই অর্থনৈতিক অবস্থানকে রাজনীতিতে বদৌলতে ২০২৩ সালে সৌদি-ইরানের দূরত্ব ঘুচিয়েছিল। এবারও ইসলামাবাদকে সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সহায়তায় নতুন সংলাপের তোড়জোড় চলছে। এমনকি হাউসি বিদ্রোহীদের সাথে সরাসরি আলোচনা করে চীন তাদের নিজস্ব বাণিজ্যিক জাহাজের যাতায়াত সুরক্ষিত করেছে।
কিন্তু এখানেই আসল রহস্য—যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রতিরক্ষা চুক্তি বা সেনাবল প্রয়োগের কোনো ইচ্ছেই চীনের নেই। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মধ্যপ্রাচ্যের জন্য চার দফা শান্তি প্রস্তাব দিলেও, ওয়াশিংটনের সাথে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর ট্রাম্পের বৈঠকের আগে বেজিং কোনো ঝুঁকি নেবে না। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধে নামায় হিসাব বদলে গেছে। তা ছাড়া, তেলের দাম বাড়লে যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাপে পড়ে, তাতে চীনের কৌশলগত লাভ ছাড়া ক্ষতি নেই!
ইরানের রিভল্যুশনারি গার্ড কোর সম্পর্কিত কোনো প্রকাশ্য সামরিক সাহায্যে চীন যায়নি। খামেনির দেশকে তারা সরাসরি অস্ত্র না দিলেও চিপস ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে পাশে ছিল বলে যে গুঞ্জন, তা বেজিং অস্বীকার করেছে। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, সামরিক শক্তিতে হরমুজ মুক্ত করা সম্ভব নয়, পথ কেবল একটাই—কূটনীতি ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনা। এখন দেখার বিষয়, শি জিনপিংয়ের দেশ কি আদতে ইরানের ওপর সেই চূড়ান্ত প্রভাব খাটাবে, নাকি কেবল নিজের স্বার্থটুকু বাঁচিয়েই সরে দাঁড়াবে?



